কিন্তু দুঃখিত হওয়া শুরু হয়েছে আরো অনেক আগে। পৃথিবী থেকে শেষ যে ট্রান্সমিশন হয় তখন থেকেই।
‘এক্স-রে-ডেল্টা-ওয়ান, দিস ইজ মিশন কন্ট্রোল, টু-ওয়ান-ফাইভ-ফাইভে বলছি, আমরা একটু সমস্যায় পড়েছি।
‘আপনারা রিপোর্ট করেছেন যে আলফা-ইকো থ্রি ফাইভ ইউনিটে কোনো সমস্যা নেই, আমাদের পরীক্ষণেও তা প্রমাণিত সত্য। সমস্যাটা সংযুক্ত অ্যান্টেনা সার্কিটে থাকতে পারে। কিন্তু যদি তা হয়ে থাকে তবে তার জন্য নতুনতর পরীক্ষণ প্রয়োজনীয় বলে প্রতীয়মান হয়।
‘তৃতীয় সম্ভাবনাও হিসাবে আনার যোগ্য। এটা আরো গম্ভীর হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট। (এতক্ষণে রিপোর্টার একটু বিরক্ত হয়েই যেন সাধারণ ভাষায় কথা শুরু করল…) তোমাদের কম্পিউটার ভুল করে থাকতে পারে। আমাদের নাইন ট্রিপল জিরোগুলোও একই তথ্য পেয়ে একই সাজেশন করছে। এ নিয়ে ঘাবরাবার কিছু নেই। কারণ, ব্যাক আপ সিস্টেম আছে। কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের সতর্ক করা উচিত। পরে আর কোনো সমস্যা চোখে পড়ে কিনা দেখে নিও। আমরা গত কয়েকদিনে বেশকিছু ছোট ব্যতিক্রম পরীক্ষা করে দেখেছি। তাতে অবশ্য তেমন হেরফের হবে না। এসব থেকে কোনো উপসংহারেও পৌঁছতে পারছি না।
‘আমরা দুই কম্পিউটার নিয়েই পরীক্ষানিরীক্ষা করছি। ফলাফল পাবার সাথে সাথে তোমাদের জানানো হবে। আবারো বলছি, অ্যালার্মের কোনো প্রয়োজন নেই। বড়জোর তোমাদের নাইন ট্রিপল জিরোকে প্রোগ্রাম অ্যানালাইসিসের জন্য বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে। তারপর কন্ট্রোলটা আমাদের অন্য কোনো কম্পিউটারের উপর ছেড়ে দিতে পারি। সময়-পার্থক্যটা সমস্যা করতে পারে, কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় এখনো পৃথিবীর কম্পিউটার দিয়ে শিপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কারণ তোমাদের ঘোঁট কম্পিউটারগুলো সময় পার্থক্য পুষিয়ে নিতে পারবে।
‘এক্স-রে-ডেল্টা-ওয়ান, দিস ইজ মিশন কন্ট্রোল, টু-ওয়ান-ফাইভ-সিক্স, সম্প্রচার সমাপ্ত।
পোল এই খবরটা আসতে দেখে নিরবে পরিস্থিতি যাচাই করা শুরু করল। আগে দেখা উচিত হালের কিছু বলার আছে কিনা, কিন্তু কম্পিউটার এই তথ্যকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো চেষ্টাই করেনি। ভাল; যদি হাল নিজে থেকে ব্যাপারটা না তোলে তো তার এ নিয়ে ঘাটাঘাটির দরকার কী?
আবার পালাবদলের সময় এসেছে, সে বোম্যানের জন্য অপেক্ষা করছে কন্ট্রোল ডেকে বসে থেকে। কিন্তু আজ সে প্রথমবারের মতো নিজের রুটিন ভেঙে বোম্যানের ঘরে গেল।
বোম্যান এরমধ্যে উঠে পড়েছে। ডিস্পেন্সার থেকে একটু কফি ঢেলে নিচ্ছিল এমন সময়ে একটু বিমর্ষ ‘গুড মর্নিং’ জানায় ফ্র্যাঙ্ক পোল। এত লম্বা মহাকাশ যাত্রার পরও তারা চব্বিশ ঘণ্টার দিনের কথা ভুলতে পারেনি যদিও তাদের কাছে রাতের কোনো ভূমিকা নেই।
‘গুড মর্নিং, কেমন চলছে কাজকর্ম?’
পোল নিজে একটা কফি নিয়ে প্রশ্ন করে, ‘মোটামুটি, তুমি কি ঠিকমতো জেগেছ?’
‘ভালই আছি। কেন, আবার কী হল?’
এর মধ্যেই দুজনে খুব সতর্ক হয়ে গেছে। রুটিনে একটু ব্যত্যয় ঘটলেই অন্যজন বুঝে নেয় কোনো সমস্যা আছে।
‘যাই হোক,’ ধীরে ধীরে বলে পোল, ‘মিশন কন্ট্রোল এইমাত্র আমাদের মাথায় একটা ছোটখাট বোমা ফেলেছে।’ সে কণ্ঠস্বর নিচু করে, যেন কোনো ডাক্তার তার রোগীর সামনে রোগ নিয়ে অন্য কারো সাথে কথা বলছে, সম্ভবত আমাদের শিপে হাইপোকন্ড্রিয়ার[৩৯] আলামত দেখা দিচ্ছে।
হয়তো বোম্যানের ঘুম পুরোপুরি কাটেনি। সে বেশ কয়েক সেকেন্ড সময় নেয় ব্যাপারটা বুঝে উঠতে গিয়ে। তারপর হঠাৎ করেই বলে ওঠে, ‘ও-আচ্ছা, আর কী বলল?’
‘বলল যে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কথাটা দুবার বলেছে। সম্ভবত প্রোগ্রাম অ্যানালাইসিস চালাবে।’
তারা দুজনেই জানে যে হাল প্রতিটি শব্দ শুনতে পাচ্ছে, সুতরাং এই ভদ্রোচিত পথ চলা ছাড়া তাদের কোনো উপায় নেই। হাল তাদের সাথী, এ মুহূর্তে সেই সাথী নিয়ে একান্তে আলাপের পরিস্থিতি আসেনি।
তারা মিশন কন্ট্রোল থেকে পরের আদেশের অপেক্ষায় থাকে, হাল নিজেও কথাটা তুলতে পারে। যাই হোক, ডিসকভারির চেহারা পাল্টে গেছে। কোথাও যেন চিড় ধরেছে, বাতাসে স্তব্ধতার গন্ধ।
ডিসকভারি এখন আর কোনো সুখী শিপের নাম নয়।
অধ্যায় ২৪. ভাঙ্গা সার্কিট
আজকাল সবাই বলতে পারে কখন হাল কথা বলবে। প্রয়োজন ছাড়া সে আর টু শব্দটিও করে না। আগের মতো কথার আগে পরে বাড়তি ব্যক্তিত্ব জুড়ে দেয় না কম্পিউটারটা। গত কয়েক সপ্তাহে এই বিশেষ দিকটা আরো প্রকট হয়ে উঠছে। ব্যাপারটা আরো বিরক্তিকর হওয়ার আগেই তারা কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা ভাববে।
পোল ঘুমিয়ে ছিল, বোম্যান কন্ট্রোল ডেকে বসে পড়ার সময় হাল ঘোষণা করে, ‘ইয়ে, ডেভ, তোমার জন্য একটা মেসেজ ছিল।
‘কী?’
‘আমাদের আরো একটা এ ই থার্টি ফাইভ ইউনিট নষ্ট হয়ে গেছে। আমার ফল্ট প্রেডিক্টর ইউনিট রিপোর্ট করেছে যে সেটা চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে অকেজো হয়ে পড়বে।
বোম্যান বইটা নামিয়ে রেখে চিন্তান্বিত চোখে চেয়ে থাকে কম্পিউটার কনসোলের দিকে। সে জানে, ভালমতোই জানে যে ঠিক সেখানে হাল থাকে না, কিন্তু একে কী বলা যায়? কম্পিউটারের ব্যক্তিত্ব কোথায় থাকে? বড়জোর বলা যায় পরস্পর সংযুক্ত মেমোরি ইউনিটের গোলক ধাঁধা আর প্রসেসিং গ্রিডগুলোয় তার বাস। সেসব অংশ করোসেলের কেন্দ্রীয় অক্ষের কাছে অবস্থিত। কিন্তু একটা মানসিক ব্যাপার বলা চলে এই আচরণকে, ‘হাল’ বলতে ডেভ বোম্যান আর পোল তাকায় কম্পিউটার কনসোলের ক্যামেরার দিকে যেটা দিয়ে হাল তাদের দেখতে পায়।
