বিরাট একটা ক্রোকোডাইল ক্লিপ দিয়ে জিনিসটাকে সে অ্যান্টেনা মাউন্টিং এর সাথে আটকে রাখল।
এতক্ষণে সে ঠাণ্ডা মাথায় এ ই থার্টি ফাইভ ইউনিটের ইলেক্ট্রনিক সার্কিটে চোখ বুলানোর ফুরসত পায়। জিনিসটা দেখতে পাতলা চারকোণা স্ল্যাবের মতো; আকৃতিতে মোটামুটি একটা পোেস্টকার্ডের মতো দেখায়। টেনে তুললেই সমস্ত নিয়ন্ত্রণ উধাও হয়ে যাবে। ফলে তার উপরও অ্যান্টেনাটা এসে পড়তে পারে।
এজন্য প্রথমেই পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ করতে হবে। এবার পোল অ্যান্টেনাটায় ধাক্কা না দিলে এম্নিতে নড়বে না। এই কমিনিটে পৃথিবীকে হারিয়ে ফেলার তেমন সম্ভাবনা নেই।
রেডিওতে সে যোগাযোগ করল কম্পিউটারের সাথে, ‘হাল, এখনি ইউনিটটা সরাব। তুমি অ্যান্টেনা সিস্টেমের সব কনেল পাওয়ার অফ করে দাও।’
‘অ্যান্টেনা কন্ট্রোল পাওয়ার অফ।’
‘শুরু হচ্ছে, তুলে ফেলছি ইউনিট। এখুনি।’
কার্ডটা কোনো ভোগান্তির চেষ্টা না করে উঠে এলো। এর ডজন ডজন স্লাইডিং কন্টাক্টের কোনোটাই বিন্দুমাত্র গোঁড়ামী করল না। এক মিনিটের মধ্যে বাড়তি ইউনিটটা বসে গেল জায়গা মতো।
কিন্তু পোল কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। সে নিজেকে আস্তে করে অ্যান্টেনা মাউন্ট থেকে দূরে ঠেলে দেয়। নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে হালকে কল করে, এবার নতুন ইউনিটের কাজ করার কথা। কন্ট্রোল পাওয়ার ফিরিয়ে দাও।’
‘পাওয়ার অন।’
অ্যান্টেনা একেবারে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল।
‘ভুল পরীক্ষার টেস্টগুলো চালাও।’
এবার অনুবীক্ষণিক তরঙ্গ প্রবাহিত হলো ইউনিটের ভিতরে। সম্ভাব্য সব রকমের ভুল খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রত্যেক যন্ত্রাংশের কাজ আর সহ্যক্ষমতা তলিয়ে দেখা শুরু করেছে হাল। এই কাজ আরো বহুবার করা হয়েছে ইউনিটটাকে ফ্যাক্টরি থেকে বের করার আগে। কিন্তু সেটা দু-বছর আর সত্তর কোটি মাইল দূরত্বের হিসাব।
‘সার্কিট পুরোপুরি অপারেশনাল,’ দশ সেকেন্ড পরেই হাল রিপোর্ট পাঠায়। এটুকু সময়ে সে এত বেশি টেস্ট শেষ করেছে যতটা কাজ করতে পারে ছোটখাট একটা সেনাবাহিনী কোনো সার্চ-অপারেশনের সময়।
‘চমৎকার।’ আনন্দিত গলায় বলে পোল, ‘এবার আমি কভার বসাতে যাচ্ছি।’
যানের বাইরের অপারেশনে এও এক ভয়াবহ কাজ। সাধারণত পুরো কাজটা সতর্কভাবে শেষ করে তারপর ফিরে যাবার মুহূর্তে কোনো ভুল করে বসে অভিযাত্রীরা। কিন্তু সে পৃথিবীর সেরা মহাকাশচারীদের একজন না হলে এ মিশনে স্থান করে নিতে পারত না।
সে সময় নিয়ে ভাবে। এরমধ্যে একটা স্ক্র বেরিয়ে গেল। কয়েক ফুটের মধ্যেই সেটাকে পাকড়াও করে নিল সে।
পনের মিনিট পর পোল ফিরে আসছিল স্পেস পোড গ্যারেজের ভিতর। তার মনে একটা তৃপ্তি কাজ করে, অন্তত একটা কাজ আর করতে হবে না।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, তার ধারণাটা ভুল।
অধ্যায় ২৩. রোগ নির্ণয়
‘তুমি কি বলতে চাও যে,’ অবাক হওয়ার চেয়ে বেশি বিরক্ত হয়েছে পোল, ‘এই এত কাজ আমি করলাম তার সবই ফাও?’
‘অনেকটা তেমনই,’ পোলের ক্ষেপে যাওয়াটা কিঞ্চিৎ উপভোগ করছে বোম্যান, ‘পুরনো ইউনিটটা পুরোপুরি পাশ করে গেছে। এমনকি দু’শ পার্সেন্ট কাজ করানোর সময়ও কোনো সমস্যা করেনি।’
দু নভোযাত্রী তাদের ওয়ার্কশপ-কাম-ল্যাবে কাজ করছে। ল্যাবটা কয়রাসেলের ভিতর। পরীক্ষা আর পর্যবেক্ষণের জন্য এ জায়গাটা স্পেস পোড বের চেয়ে বেশি কাজে লাগে। এখানে কোনো জিনিসের হারিয়ে যাবার ভয় নেই, সূর্যকে ঘিরে পাক খাবার ভয় নেই, নভোচারীদের ভেসে যাবার ভয়ও নেই।
সেই পাতলা এ ই থার্টি ফাইভ ইউনিটটা এক ম্যাগনিফাইং লেন্সের নিচে জবুথবু হয়ে পড়ে আছে। জিনিসটা এক ধাতব ফ্রেমে বসানো, ফ্রেম থেকে রঙ-বেরঙের তার বেরিয়ে গিয়ে টেস্টিং ইউনিটে জড়ো হয়েছে। অটোম্যাটিক টেস্ট সেটটা আকারে ডেস্কটপ কম্পিউটার থেকে মোটেও বড় নয়। কোনো ইউনিটকে পরীক্ষা করে দেখতে হলে শুধু ট্রাবলশুটিং’ লাইব্রেরি থেকে সঠিক কর্ডটা বেছে নিয়ে লাগিয়ে দাও, একটা বাটন টিপে বসে থাক, ব্যস। নষ্ট জায়গাটা ঠিক ঠিক দেখিয়ে দেবে ছোট্ট ডিসপ্লে মনিটর। এমনকি সমাধানও দেখিয়ে দেবে।
‘নিজে আরেকবার করে দেখ।’ একটু বিভ্রান্ত স্বরে বলল বোম্যান।
পোল ওভারলোড সিলেক্ট সুইচ অন করল। এক্স-টু দিয়ে টেস্ট বাটনে চাপ দিতেই স্ক্রিনে জল জুল করে উঠল, ইউনিট ওকে।
‘আমার মনে হয় আমরা এর উপর কাজের বোঝা চাপিয়ে যেতে পারি জ্বলে না যাওয়া পর্যন্ত, সে অনেকটা হতাশ কণ্ঠে বলল, তাতে কাজের কাজ কিসসু হবে কি?’
‘হালের ইন্টার্নাল ফল্ট প্রেডিকটর হয়তো কোনো ভুল করেছে।’
‘যাক, এসব বলে আর লাভ নেই। বরং খুঁতখুত করার চেয়ে বদলে দেয়া বহুৎ আচ্ছা। এ কাজে আমরা নিশ্চয়ই কোনো “কিন্তু” রাখতে চাই না?’
বোম্যান জবাব না দিয়ে জিনিসটাকে আলোয় তুলে ধরল। ছোট্ট একটা টুকরো। এর গায়ে অণুবীক্ষণিক সব জাল। দেখে শুনে একদম উচ্চস্তরের আর্ট বলে মনে হয়।
অনেকক্ষণ পর জবাব এল, “আমরা আসলেই কোনো কিন্তু রাখতে চাই না। হাজার হলেও এ জিনিসই আমাদেরকে পৃথিবীর সাথে গেঁথে রেখেছে। আমি এটাকে এন জি তে ফাইলবদ্ধ করে নষ্ট জিনিসের স্টোরে রেখে দিব। আমরা বাড়ি ফেরার পর কেউ না কেউ দামি জিনিসটা নিয়ে দুঃখ করতে পারে। আমাদের এসব মানায় না। আমাদের দরকার কিন্তুহীন মিশন।”
