পোডের জেনারেল পারপাস কিট থেকে একটা কন্টেইনার নিয়ে সেখানে বিশেষ একটা তরল ছিটিয়ে দেয় পোল। সাদাটে আঠালো জিনিসটা জ্বালামুখ ঢেকে দিল। প্রথমে একটা বড় বুদবুদ উঠল। পরে সব ঠিক হয়ে যাবার পরও পোল বেশ কয়েক মিনিট তাকিয়ে থাকে সেদিকে। তবু সতর্কতার খাতিরে আরেকবার স্প্রে করে অ্যান্টেনার দিকে মনোযোগ দেয়।
ডিসকভারির লম্বাটে শরীরের চারদিকে ঘুরতে কয়েক মিনিট সময় লাগবে তার, কারণ সে কখনোই মিনিটে কয়েক ফুটের বেশি স্পিড় উঠাতে দেয়নি। শিপের শরীর থেকে বেরুনো কিম্ভুত যন্ত্রগুলোর সব ঠিক আছে কিনা তা দেখে নিয়ে সাবধানে চলতে শুরু করে। কারণ জেটের আগুন লেগেও শিপের ক্ষতি হতে পারে।
অবশেষে লং রেঞ্জ অ্যান্টেনার দিকে সে এগিয়ে যায়। বিশ ফুট ব্যাসের বিশাল ডিশটি যেন সরাসরি সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে। এখন পৃথিবী আর সূর্য এখান থেকে প্রায় একই দিকে দেখা যায়। বিরাট ধাতব চাকতির পেছনে ঢাকা পড়ে গেছে অ্যান্টেনা মাউন্টিং।
পেছন থেকে পোল এগিয়ে যায়। কারণ অগভীর প্যারাবোলিক রিফ্লেক্টরের সামনে চলে গেলে যোগাযোগ কেটে যাবে সাময়িকভাবে। ছায়া সরিয়ে দিতে পোডের স্পট লাইট জ্বালিয়ে দিল পোল।
এই হালকা ধাতব প্লেটের পেছনেই যত অঘটনের নাটের গুরু বসে আছে। চারটা লকনাট আছে, খুলতে হবে। তবু পুরো এ ই পঁয়ত্রিশ ইউনিটটা বদলের সুবিধা রেখে তৈরি করা হয়েছে বলে সে তেমন ভ্যাজাল আশা করে না।
স্বাভাবিকভাবেই পোড়ে বসে কাজ সারা গেল না। একেতো যান্ত্রিকভাবে এ কাজ করে পোষাবে না, তার উপর মূল রেডিও মিররের কাগজ-পাতলা প্রতিফলন তল নষ্ট হয়ে যেতে পারে জেটের ছোঁয়ায়।
এই সব কাজই অপারেশনের আগে ঠিক করা। বোম্যান দুবার করে সব পরীক্ষা করে নিয়েছে। একে রুটিন চেকও বলা যায়। কিন্তু এই রুটিন চেকে একটু ভুল করলে তার কোনো ক্ষমা নেই, কারণ বাইরের অভিযানে কখনো ‘ছোট ভুল’ হয় না। যেটা হয় সেটাই বড়।
সে সময় মতো অ্যান্টেনা সাপোর্ট থেকে বিশ ফুট দূরে পোডটা নামিয়ে রাখল। শিপের গায়ের বাইরের দিকে যে মই লাগানো আছে তার গায়ে পোডের একটা হাত লাগিয়ে নিয়েছে, ভেসে যাবার ভয় নেই।
গায়ের স্যুটটা ভালোমতো পরীক্ষা করে নিয়ে সে পোড ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। বেরুনোর সাথে সাথে স্যুটের গায়ে দেখতে পায় ক্রিস্টাল বরফের পাতলা আবরণ। গায়ের বাতাসে লেগে থাকা পানির সবটুকুই জমে গেল। দূরের নক্ষত্রবীথি যেন আরো দূরে সরে গেছে।
বেরিয়ে যাবার আগে শেষ কাজ হিসেবে বিটির নিয়ন্ত্রণ ম্যানুয়াল থেকে বদলে দিয়ে রিমোট করে নেয়। এখন হালই বিটির নিয়ন্তা। তারপরও অতিরিক্ত সতর্কতা স্বরূপ তুলার চেয়ে একটু মোটা একটা কর্ডে নিজেকে বেঁধে নিয়েছে।
পোডের দরজা খুলে যাবার পর সে ধীরলয়ে বেরিয়ে পরে মুক্ত আকাশে। যানের বাইরে কাজ করার সময় কিছু নীতি মানতে হয়। সবকিছু সহজভাবে নাও-কখনো দ্রুত নড়ে না-থামো আর চিন্তা কর।
বিটির বাহ্যিক হ্যান্ডহোল্ড ধরে সে ক্যাঙ্গারুর বাচ্চার মতো আটকে থাকা এ ই থার্টি ফাইভ ইউনিট বের করে আনে। পোল পোডের কোনো খুচরো যন্ত্র ব্যবহার করবে না। এগুলো মানুষের হাতের উপযোগী নয়। বরং তার সব পছন্দের জিনিসই এখন কোমরে শোভা পাচ্ছে।
নিজেকে একটু ধাক্কা দিয়ে বিগ ডিশের পেছনে চলে গেলে তার দুটো ছায়া পড়ে, একটা সূর্যের আলোয়, অন্যটা বিটির স্পটলাইটের কল্যাণে। কিন্তু তার অবাক হতে বাকী ছিল। বিরাট আয়নার পেছনটাও ঝলমল করছে আলোতে। অতি ক্ষুদ্র আলোর রেখাও প্রতিসৃত হচ্ছে দারুণভাবে।
একটা মুহূর্ত স্তব্ধ থাকার পর ব্যাপারটা ধরা পড়ে। এই লম্বা ভ্রমণে কম মহাজাগতিক ধূলিকণার সাথে সংঘর্ষ হয়নি এই অ্যান্টেনার, সেগুলো অকল্পনীয় সূক্ষ্ম ছিদ্র তৈরি করেছে, সেখান দিয়েই আলো আসে। এরা সবাই এত ছোট যে সপ্রচার-কাজের কোনো ক্ষতিই হয় না।
ধীরে নড়তে নড়তে অ্যান্টেনা মাউন্টিংয়ের বাইরের দিকের হ্যান্ডহোন্ড ধরে নেয় সে। এরপর সবচে কাছের জায়গায় নিজের সেফটি বেল্ট লাগিয়ে নিয়ে রিপোর্ট করে বোম্যানের কাছে।
এই ছায়ায় ইউনিটটাকে দেখা যাচ্ছে না। তাই হালকে সেকেন্ডারি স্পটলাইট জ্বালাতে বলার সাথে সাথে ডিশের পেছনটা আলোয় ভরে গেল।
ধাতব শিটের উপর চোখ রেখে ঠাণ্ডা মাথায় ছোট্ট হ্যাঁচটার কথা ভাবতে ভাবতে আপন মনে বিড়বিড় করে ফ্র্যাঙ্ক পোল, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে ইহা খুলিবার উপক্রম হইয়াছে, ফলে ইহার গ্যারান্টি নষ্ট হইবার পর্যায় উপস্থিত। জিরো টর্ক ক্রু ড্রাইভার দিয়ে সে প্রমাণ সাইজের গুলো তুলে আনে। এই বিশেষ যন্ত্রটার ভিতরের স্প্রিং সেই স্ক্রর বাইরের দিকের বল শুষে নেবে। তাই সেগুলোর উঠে গিয়েই ভেসে বেড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
ক্রুগুলোকে তুলে নিয়ে পোল রেখে দিল কাজের পাউচে। এক সময় বলা হতো যে পৃথিবীর চারদিকে শনির মতো একটা বেল্ট তৈরি হবে। সেটায় থাকবে মহাকাশ নির্মাণের সময় ছিটকে পড়া বিভিন্ন বন্টু, খুচরো যন্ত্রাংশ, ধাতব টুকরো, অসাবধানে ফেলে দেয়া খাবারের ক্যান ইত্যাদি ইত্যাদি।
ধাতব ঢাকনাটা মহা গোঁয়ারগোবিন্দ। পোল একবার সন্দেহ করে বসে, সেটা হয়তো জাহাজের গায়ে পাকাপাকি বসিয়ে দেয়া হয়েছে। বেশ কয়েকবার জোরাজুরির পর ঢাকনা আলগা হয়ে আসা শুরু করে।
