‘মিশন কন্ট্রোল, দিস ইজ…’ আপনাদের প্রেস রিলিজটা পাঠালাম।
‘আজ দিনের শুরুতে একটা ছোট টেকনিক্যাল সমস্যা দেখা দেয়। আমাদের হাল ন’ হাজার কম্পিউটার আন্দাজ করে যে এ ই থার্টি ফাইভ ইউনিট কোনো গণ্ডগোল পাকাচ্ছে।
‘কম্যুনিকেশন সিস্টেমের এ এক ক্ষুদ্র অংশ। কিন্তু এর গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের মূল অ্যান্টেনাকে এই জিনিসটাই পৃথিবীর সাথে গেঁথে রাখে। হাজার হাজার ডিগ্রির হিসাবেও এর সূক্ষ্মতা হ্রাস পায় না এক বিন্দু। সাতশো মিলিয়ন মাইল দূর থেকে পৃথিবী একদম নগণ্য এক তারা ছাড়া কিছু নয়। আমাদের পাতলা রেডিও বিম সহজেই গ্রহটাকে মিস করতে পারে।
‘অ্যান্টেনাটা সর্বক্ষণ পৃথিবীর দিকে তাক করা থাকে কারণ এর মোটরগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে মূল কম্পিউটার। কিন্তু সেই মোটরগুলো তাদের খবরাখবর পায় এই থার্টি ফাইভ ইউনিট এর মাধ্যমে। আপনারা একে কোনো শরীরের নার্ভ সেন্টারের সাথে তুলনা করতে পারেন। এই স্নায়ুকেন্দ্রই মস্তিষ্কের আদেশগুলোকে অঙ্গ প্রত্যঙ্গের পেশীর উপযোগী করে অনুবাদ করে দেয়, দেয় পাঠিয়ে। আদেশ বয়ে না আনতে পারলে অঙ্গ একেবার অকেজো হয়ে যাবে। আমাদের ক্ষেত্রে, এ ই থার্টি ফাইভ ইউনিট নষ্ট হলে অ্যান্টেনা যেমন খুশি তেমন ঘোরা শুরু করতে পারে, কিংবা পৃথিবীর দিকে তাক করা থাকলেও তার খবর চলে যেতে পারে হাজার গুণ দূর দিয়ে। গত শতাব্দীর গভীর মহাশূন্য অভিযানের সবচে বড় সমস্যার এও একটি।
‘আমরা এখনো ভুলটা ধরতে পারিনি; কিন্তু পরিস্থিতি মোটেও ঘোলা হয়ে যায়নি। আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। আমাদের হাতে আরো দুটি এ ই থার্টি ফাইভ ইউনিট আছে। প্রত্যেকটি বিশ বছর কাজ করতে পারবে। এমনকি ভুলটা ধরতে পারলে প্রথম ইউনিটও ঠিক করা সম্ভব।
‘ফ্র্যাঙ্ক পোল এ কাজের জন্য বিশেষভাবে স্বীকৃত। তিনি বাইরে গিয়ে নষ্ট ইউনিটটার বদলে নতুনটা বসিয়ে আসবেন। এই সুযোগে তিনি শিপের গা পরীক্ষা করে ই ভি এ ইউনিটের বাকী জিনিসগুলোও দেখে আসতে পারবেন।
‘এই ছোট সমস্যা ছাড়া মিশন তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। আশা রাখি একই ভাবে বাকী সময় চলবে।
‘মিশন কন্ট্রোল, দিস ইজ এক্স-রে…’
অধ্যায় ২২. বেরিয়ে পড়া
ডিসকভারির বাইরের কাজ সারার জন্য যে ক্যাপসুল ব্যবহার করা হয় তার চলতি নাম ‘স্পেস পোড’। এগুলো নফুট ব্যাসের গোলক, ভিতরে বিশাল জানালা। পেছনে অপারেটর বসে। জানালার নাম বে উইন্ডো। মূল রকেট ড্রাইভটা মাধ্যাকর্ষণের পাঁচ ভাগের একভাগ আকর্ষণ তৈরি করে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে ছোট্ট অ্যাটিচ্যুড কন্ট্রোল জেটগুলো স্টিয়ারিংয়ের কাজ করে। জানালার ঠিক নিচে দুটি কৃত্রিম হাত বা ‘ওয়ালডো’ আছে যার একটা ভারি কাজ করে, অন্যটা একেবারে পল্কা কাজেও পটু। আরেকটা বেরিয়ে আসার মতো অঙ্গ আছে এই যানের, সেটায় ক্রু ড্রাইভার আর করাতের মতো অনেক যন্ত্র থরে থরে বসানো থাকে।
মানুষের সবচে আধুনিক যান নয় এই স্পেস পোড, তাতে কী, শূন্যে নির্মাণ বা বাহ্যিক কাজে এর জুড়ি মেলা ভার। সাধারণত তাদের মেয়েলি নাম থাকে, কারণ সম্ভবত এই যে তাদের কাজ বাহ্যিক দৃষ্টিতে হাল্কা হলেও অপ্রতিরোধ্য, তাদের ছাড়া চলেও না। ডিসকভারির ত্রয়ীর নাম যথাক্রমে অ্যানা, বিটি আর ক্লারা।
একবার নিজের ব্যক্তিগত প্রেশার স্যুট গায়ে চাপিয়ে নিয়েই পোল পোডের ভিতর ঢুকে দশ মিনিট ধরে সেটার কন্ট্রোল দেখে নেয়। সব দেখে নিয়ে অক্সিজেন আর পাওয়ার রিজার্ভ পরীক্ষা করে। পুরোপুরি তুষ্ট হবার পর রেডিও সার্কিটে হালের সাথে যোগাযোগ করে। কন্ট্রোল প্যানেলে বোম্যান বসে থাকলেও কোনো বড়সড় ভুল না হলে তার নাক গলানোর নিয়ম নেই।
‘দিস ইজ বিটি। পাম্পিং শুরু কর।’
‘পাম্প করা শুরু হয়েছে।’
সাথে সাথে পাম্পের মৃদু আঁকি অনুভব করে পোল। যানটার গা একদম পাতলা। পাঁচ মিনিট পর হাল আবার খবর দেয়, ‘পাম্প করা সমাপ্ত।’
শেষবারের মতো পোল তার ছোট্ট ইন্সট্রুমেন্ট প্যানেল দেখে নেয়। সবই চলছে ঠিকমতো।
‘বাইরের দরজা খোল।’ সে আদেশ করে।
হাল কাজ শুরু করে দিয়েছে। যে কোনো কাজের যে কোনো পর্যায়ে পোল ‘হোল্ড’ শব্দটা বলা মাত্র সে কাজটা বন্ধ রাখবে।
পোডের সামনের দেয়াল চিরে যাচ্ছে। বাতাসের শেষবিন্দু মহাকাশে হারিয়ে গেলে পোল বুঝতে পারে ছোট্ট পোডটা একটু একটু কাঁপছে। দূরে ছোট্ট শনি দেখা যায়। এখনো চারশো মিলিয়ন মাইল যেতে হবে।
‘পোড বের কর।’
যে রেলের উপর পোড ঝুলছিল সেটা ধীরে বাইরের দিকে এগিয়ে যায়। ডিসকভারির বাইরে ছোট্ট স্পেসপোড বিটি ঝুলছে।
মূল জেটটা আধ সেকেন্ডের জন্য চালানোর সাথে সাথে রেল থেকে বেরিয়ে আসে বিটি। সে সূর্যের চারপাশে একান্ত নিজস্ব কক্ষপথে ঘুরছে। এখন ডিসকভারির সাথে তার কোনো যোগাযোগ নেই, এমনকি নেই কোনো সেফটি লাইন-যেটা ধরে তাকে টেনে ভিতরে আনা সম্ভব। মাঝেমধ্যেই এই মরার পোডগুলো ঝামেলা পাকায়। অবশ্য তেমন কিছু হলে বোম্যান সাথে সাথে চলে আসবে।
বাইরের দিকে শ’ খানেক ফুট দূরে সেটাকে ভাসিয়ে নিয়ে পোল পরীক্ষা করে, সব ঠিকমতো চলছে। একবার পাশে, আর একবার পেছনে ঘুরিয়ে নিয়ে সন্তুষ্টচিত্তে কাজে মন দেয়।
প্রথম টার্গেট হল শিপের গায়ে আধ ইঞ্চি জুড়ে একটা নষ্ট এলাকা। পিনের মাথার চেয়েও ছোট্ট একটা ধূলিকণা তার অসীম বেগ নিয়ে এখানটায় আছড়ে পড়ার সাথে সাথে বাস্প হয়ে গেছে। কিন্তু রেখে যাওয়া ক্ষতচিহ্নটা কম কথা নয়। দেখে মনে হয় ভিতর থেকে কোনো বিস্ফোরণের জন্যে জিনিসটার এ হাল হয়েছে, আসলে গতিবেগের এ পর্যায়ে সাধারণ বিচারবুদ্ধি খুব একটা কাজে দেয় না।
