বোম্যান ঠাণ্ডা মাথায় জবাব দিল, ‘আমরা এর দেখভাল করব। অপটিক্যাল অ্যালাইনমেন্টটা আগে দেখে নিই।’
‘এইতো, এটা, ডেভ। এ মুহূর্তে একদম ঠিকঠাক চলছে।’
ডিসপ্লে স্ক্রিনে একটা নিখুঁত অর্ধচন্দ্র দেখা দিল। তারাহীন আকাশের সামনে জিনিসটা একেবারে উজ্জ্বল দেখায়। তার পেছনে দীপ্তিময় আরেক পূর্ণগোলক। দেখে মনে হয় মেঘে ঢাকা শুক্র গ্রহ।
কিন্তু দ্বিতীয় দৃষ্টিতেই সে সম্ভাবনা নাকচ হয়ে যায়। শুক্রের কোনো উপগ্রহ নেই। দেখেই বোঝা যায় সেই দু-শরীর মা আর সন্তানের। এই ব্যাপারটা অনেক অ্যাস্ট্রোনোমার বিশ্বাস করতেন। পরে প্রমাণ হয় পৃথিবী আর চাঁদ কখনোই এক ছিল না।
আধ মিনিট সময় নিয়ে পোল আর বোম্যান ছবিটা খেয়াল করে দেখে। ইমেজটা লঙ ফোকাস টিভি ক্যামেরা থেকে আসছে। ক্যামেরাটা বড় রেড়িও ডিশে লাগানো, ডিশের রিমে বসানো, কারণ ডিশের মাঝামাঝি কিছু থাকলে খবর আদানপ্রদান সম্ভব হতো না। চিকণ পেনসিল বিমটা তাক করা থাকে পৃথিবীর দিকে, সেটা ডিশের মাঝে একমাত্র বৈধ দখলদার।
‘সমস্যাটা কোথায় তুমি কি জানো?’ প্রশ্ন করে বোম্যান।
‘বোঝা যাচ্ছে না। সম্ভবত ভিতরে। এটুকু বলতে পারি যে প্রব্লেমটা এ ই থার্টি ফাইভ ইউনিটেই।’
‘তুমি কোন্ সমাধান আশা কর?’
‘সবচে ভালো হয় বাড়তি ইউনিট দিয়ে বর্তমানটাকে বদলে দিতে পারলে। ভিতরে এনে আমরা সাথে সাথে চেক করতে পারব।’
‘ও কে, এবার অন্য কপিটা চাই।
তথ্যটা সাথে সাথে ডিসপ্লে স্ক্রিনে ফুটে উঠল। নিচের স্লটে পড়ে গেল একটা কাগজের টুকরো। আগে এই প্রিন্টআউটই ছিল একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু দিন বদলে গেছে।
এক মুহূর্ত ডায়াগ্রামটায় চোখ বুলিয়ে বোম্যান শীষ দিয়ে ওঠে।
‘তুমি হয়তো আমাদের বলছ যে, কথা বলার সময় ও একটু থামে, বাইরে যাওয়া উচিৎ।’
‘আই অ্যাম স্যরি। কিন্তু তোমরা তো জান যে এ ই থার্টি ফাইভ ইউনিট অ্যান্টেনা মাউন্টিংয়ে বসানো।’
‘আমি সম্ভবত জানতাম। বছরখানেক আগের কথা। কিন্তু এই শিপে আট হাজার সাব সিস্টেম আছে। তার কোনোটা কোথায় সেসব মনে রাখা তোমার কম্ম, আমার নয়। বোঝা যাচ্ছে সমাধানটা একদম একরোখা, আমাদের বেরিয়ে গিয়ে নতুন ইউনিট বসাতে হবে, ব্যস।’
‘এ কাজ আমাকেই মানায়।’ বলল পোল। সে বাইরের কাজের জন্য ট্রেনিং নিয়েছে, কাজটা এক লহমায় করে ফেলতে পারি। ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে, আমার কিছুই যায় আসে না।
‘আগে দেখে নিই মিশন কন্ট্রোল রাজি নাকি গররাজি।’ বলল বোম্যান, সে কয়েক মুহূর্তের জন্য ভেবে নিয়ে একটা মেসেজ পড়া শুরু করল নিজে নিজেই, কোনো কাগজ ছাড়া।
“মিশন কন্ট্রোল, দিস ইজ এক্স-রে-ডেল্টা-ওয়ান, অ্যাট টু-জিরো-ফোর-ফাইভ, শিপের নাইন-ট্রিপল জিরো কম্পিউটারের ভুল নির্ধারক সেন্টার দেখিয়েছে যে আলফা-ইকো থ্রি ফাইভ ইউনিট আর বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে নষ্ট হতে পারে। অনুরোধ করা হচ্ছে, আপনারা আপনাদের টেলিমেট্রি মনিটরিং করে শিপ সিস্টেম সিমুলেটরের রিভিউ ইউনিট দেখে নিন। আর ই ভি এ-তে গিয়ে এ ই থার্টি ফাইভ অপসারণের অভিযান অনুমোদন করে পাঠানোর অনুরোধ করা যাচ্ছে। মিশন কন্ট্রোল, দিস ইজ এক্স-রে-ডেল্টা-ওয়ান, অ্যাট টু-জিরো-ফোর-সেভেন, ট্রান্সমিশন কনক্লুডেড।”
বহু বছরের সাধনার পর বোম্যান এই মান্ধাতা আমলের যোগাযোগ প্রক্রিয়া রপ্ত করেছে। এবার অপেক্ষা ছাড়া করার কিছুই নেই। দু-ঘণ্টারও বেশি সময় নেবে খবরটা আসতে।
বোম্যান যখন একটা জ্যামিতিক গেমে হালের কাছে হারতে বসেছে এমন সময় জবাব এলো।
‘এক্স-রে-ডেল্টা-ওয়ান, দিস ইজ মিশন কন্ট্রোল, আপনাদের তথ্য প্রাপ্তি স্বীকার করছি টু-ওয়ান-জিরো-জিরো-থ্রি-তে। আমরা টেলিমেট্রিক ইনফরমেশনে আপনাদের মিশন সিমুলেটর দেখছি। কাজ হলে উপদেশ পাঠানো হবে।
‘রজার[৩৮], ইউর প্ল্যান টু গো ই ভি এ অ্যান্ড রিপ্লেস আলফা-ইকো থ্রি-ফাইভ ইউনিট প্রায়োর টু পসিবল ফেইলুর। আমরা এর উপর টেস্ট চালাচ্ছি, রিপ্লেস করার ব্যাপারে অচিরেই তথ্য পাঠানো হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।’
সবচে বড় সমস্যা এবার কেটে গেল। টিকতে না পেরে কথক বিশাল মেসেজকে আর এই দাঁত ভাঙা ভাষায় না বলে সহজ ইংরেজিতে বলা শুরু করল।
“স্যরি, তোমরা একটু সমস্যায় পড়েছ। এটাকে তোমাদের কষ্টের সাথে যোগ করিয়ে দিতে চাই না। তোমরা যদি ই ভি এ-তে যেতেই চাও তো পাবলিক ইনফরমেশন থেকে একটা অনুরোধ ছিল। সবার কাছে পাঠানোর জন্য একটা ছোট্ট মেসেজ রেকর্ড করতে পারবে? বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একটু কথাবার্তা, সাথে সাথে এ ই থার্টি ফাইভ ইউনিট কী করে তা নিয়ে এক আধটু কথা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বললেই চলবে। বুঝতেই পারছ, যথাসম্ভব আশা দিতে হবে পাবলিকের মনে। ভালো হোক আর খারাপ, খবরটা একটু ভালোর দিকেই রেখ। আমরাও করতে পারি কাজটা, তবে তোমাদের মুখ থেকে না বেরুলে তোপের মুখেও পড়তে পারি। আশা করি এটা তোমাদের সামাজিক জীবনে তেমন নাক গলাবে না। দিস ইজ…”
আবার শেষকালের দাঁতভাঙা কথা।
অনুরোধ শুনে বোম্যান হাসবে না নাচবে তা ভেবে পায় না। এমন মাসের পর মাস কেটেছে যখন পৃথিবী তাদের খোঁজটুকুও নেয়নি। ‘খবরটা একটু ভালোর দিকেই রেখ…’ হাহ্!
ঘুমানোর আগে পোল তার সাথে যোগ দিলে দুজনে সেই মেসেজ লিখে অভিনয় করতে দশ মিনিট খরচ করল। প্রথম প্রথম হাজার হাজার অনুরোধ আসত; ইন্টারভিউ, আলোচনা, ব্যক্তিগত কথা, কত্ত কী! তারা কাশি দিতে চাইলে তাও একটা এক্সক্লসিভ খবর হয়ে যেত। সময় পার্থক্য মিনিট থেকে ঘণ্টার দিকে গড়িয়ে যেতেই আগ্রহ কর্পূরের মতো উবে গেছে। বৃহস্পতির পাশ দিয়ে উড়ে যাবার পর গত এক মাসে তারা মাত্র তিন-চারটা সাধারণ খবর পাঠিয়েছে সংবাদ সংস্থাগুলোর কাছে।
