প্রথম চিত্রটা আসে রোবটের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের মুহূর্ত থেকে। শুধু হলুদ একটা ধোঁয়াশা চোখে পড়ে। ধোয়াটা অসীম কোনো অন্ত:সলিলা নদীর ঝর্নার মতো উঠে আসে উপরে। এদিকে রোবট প্রতি ঘণ্টায় কয়েকশ কিলোমিটার বেগে পড়ে যাচ্ছে ভিতরে।
আরো গম্ভীর হয়ে গেল কুয়াশা, এবার বোঝা দায় প্রোবের দৃষ্টিসীমা। সে দশ ইঞ্চি দেখছে নাকি দশ মাইল তা ঠাহর করা অসম্ভব। কারণ কোনো কিছুর দিকে ফোকাস করার উপায় নেই, আদৌ ফোকাস করার মতো কোনো জিনিসই নেই সেখানে। দেখে শুনে মনে হয় মিশনটা বৃথা গেল।
এরপর হঠাৎ করেই কুয়াশা সরে গেল। পোব কোনো এক ভারি মেঘের মধ্য দিয়ে শত শত মাইল পড়ার পর স্পষ্ট কোনো এলাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। সম্ভবত এটা খাঁটি হাইড্রোজেনের কোনো স্তর, ক্রিস্টাল অ্যামোনিয়াও হতে পারে। এখনো ছবিগুলো বোঝা দায়, এটুকু বোঝা যায় যে ক্যামেরার ফোকাস বেশ কয়েক মাইল দূরে।
এবার ছবি এত অপরিচিত যে পার্থিব দৃশ্যে অভ্যস্ত কোনো চোখ একে সয়ে নিতে পারবে না। অনেক অনেক নিচে স্বর্ণালী কোনো এক অবয়ব শুয়ে আছে, তার নেই কোনো সীমা, নেই কোনো শুরু। শুধু দেখা যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঢেউ। যেন দানবীয় সব পর্বতের চূড়া। কিন্তু সেখানে নড়াচড়ার কোনো লক্ষণ নেই। সেই সোনালী এলাকাটা সমুদ্র না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু হতাশ হওয়া ছাড়া আর কী করার আছে, সামনের সেই অপার্থিব ভূমিও কোনো ভূমি নয়। এ হল বৃহস্পতীয় বায়ুমণ্ডল। সেটা মেঘের নতুন স্তর, ব্যস।
এরপর হঠাৎ করেই ক্যামেরা দারুণ অস্পষ্ট হয়ে যায়। কোনো এক অদ্ভুতুড়ের খোঁজ পেয়েছে সে। অনেক মাইল নিচে সেই সোনালী মেঘসমুদ্র আড়াল করে আছে এক চতুষতলকীয় জিনিস। সেটার সাথে কোনো প্রাকৃতিক ব্যাপারের তুলনা করা যাচ্ছে না, যদিও এই স্বর্গীয় বিশালত্বে প্রাকৃতিক’ কথাটার মানেই পাল্টে যেতে বসেছে।
তারপর বায়ুচাপের কারণে প্রোবটা আরেক প্রান্তে চলে যায়। সেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিচে দ্রুত সরতে থাকা সোনালী এলাকাকে হলদেটে পর্দার মতো দেখায়। এবার পরীক্ষাযন্ত্র স্থির হলে ‘সমুদ্র’ আরো এগিয়ে আসে। কিন্তু এমন মহাকাব্যিক ছবি মানবজাতির কোনো সদস্য কোনোদিন দেখেনি। এবার দেখা যাচ্ছে কালো কালো সব গর্ত, সেগুলো দিয়ে নিশ্চয়ই আরো নিচের স্তরের ছবি তোলা সম্ভব।
সেখানে প্রোবের যাবার কথা নয়। প্রতি মাইলে প্রেশার বাড়ছে, বাড়ছে গ্যাসের ঘনত্ব, এগিয়ে আসছে রহস্য-জগতের কঠিন ভূমি।
জিনিসটার পুরো জীবন ক্ষয় করে হয়তো গ্রহপতির লাখো ভাগের এক ভাগও দেখা আর বোঝা সম্ভব হবে না, তাতে কী, এ সামান্য তথ্যও মানুষ তার মহাকাশবিদ্যার পুরো ইতিহাসে সংগ্রহ করতে পারেনি। তারপর আরো গম্ভীর হয় মেঘ, পোল আর বোম্যান নিজেদের চোখ আটকে রাখে টিভি স্ক্রিনের প্রতি।
প্রাচীনেরা নিশ্চয়ই বর্তমানের মানুষদের চেয়ে এ গ্রহ সম্পর্কে বেশি জানত। নাহলে কোনো দুঃখে ঈশ্বর রাজের নামে নাম রাখবে? যদি নিচে প্রাণ থেকেও থাকে তা খুঁজে পেতে কতদিন লাগবে? নাহয় গেল প্রাণী পাওয়া, আর কত শতাব্দীর দরকার এই মেঘমন্দ্র ঈশ্বরভূমিতে পা ফেলতে, কীরকম শিপ তৈরি করতে হবে সে কাজের জন্য?
কিন্তু আজ সেসব নিয়ে ডিসকভারি আর তার কুদের ভাবার অবকাশ নেই। তাদের লক্ষ্য আরো আজব এক গ্রহকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। আরো অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়ে পাঁচ কোটি মাইলের নিরেট শূন্যতা ভেদ করে সেখানে পৌঁছতে হবে।
৪. খাদ
চতুর্থ পর্ব : খাদ
অধ্যায় ২১. জন্মদিনের পার্টি
‘হ্যাপি বার্থডে,’ সেই চিরাচরিত চিৎকার ভেসে আসছে সাতশো মিলিয়ন মাইল : দূর থেকে আলোর গতিতে; ফুটে উঠছে কন্ট্রোল ডেকের ভিশন স্ক্রিনে। পোল পরিবার বেশ স্বার্থপরের মতো একত্র হয়েছে বার্থডে কেকের সামনে। হঠাৎ একদম নীরব হয়ে গেছে তারা সবাই।
তারপর মিস্টার পোল আনন্দের ভঙ্গী করে বললেন, ‘তো, ফ্র্যাঙ্ক, বলার মতো আর কিছু খুঁজে পাচ্ছি না এ মুহূর্তে পারছি শুধু এটুকু বলতে যে আমাদের চিন্তা চেতনা তোর সাথে সাথেই আছে। আর…উই আর উইশিং ইউ দ্য হ্যাপিয়েস্ট অব বার্থডেজ।’
‘নিজের যত্ন নিস, বোকা ছেলে,’ মিসেস পোলের কণ্ঠস্বর কেমন একটু বদলে যায়। তিনি কোনোদিন কান্না চাপতে শেখেননি, ‘খোদা তোর মঙ্গল করবেন।’
এরপর ‘গুড বাই’ এর একটা ঢেউ খেলে যায় পোল পরিবারের বাসায়। ভিশন স্ক্রিন কালো হয়ে গেলে নিজেকে নিজে বলে পোল, কী অবাক কাণ্ড, এসবই হয়েছে এক ঘণ্টারও বেশি সময় আগে। এতক্ষণে এই পুরো পরিবার যার যার মতো ছিটকে পড়েছে আশেপাশের কয়েক মাইল এলাকায়। এই সময়-পার্থক্য থাকার পরও মেসেজটা যেন ছদ্মবেশী কোনো আশীর্বাদ। আর সবার মতো সেও মনে মনে একটা দুঃখই পুষে চলে, যদি একবার সবার সাথে সরাসরি কথা বলা যেত। কিন্তু এই যে দৃশ্য, তা মোটেও বাস্তব নয়, মানসিক প্রভাবটাই প্রকট। সে আবারও দূরত্বের এক অতল গহ্বরে নিজেকে পড়ে যেতে দেখে, আর সব ভাবনা তলিয়ে যায় এর ভিতর।
‘উৎসবে নাক গলানোর জন্য দুঃখিত,’ বলল হাল, ‘কিন্তু আমরা একটা সমস্যায় পড়েছি।’
একসাথে দুজনেই প্রশ্ন করে বসে, ‘কী সমস্যা?’
‘পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারছি না ঠিকমতো। সমস্যাটা এ ই থার্টি ফাইভ ইউনিটে। আমার সমস্যা প্রতিরোধ কেন্দ্র বলছে যে বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে এটা নষ্ট হয়ে যাবে।’
