হাজার মাইল সামনে থেকে গোধূলীর বাঁক তাদের দিকে এগুচ্ছে তড়িঘড়ি করে। অন্যদিকে সূর্যটা বৃহস্পতির মেঘের আড়ালে হারিয়ে যাবার পথে। এর আলো যেন কোনো জ্বলন্ত মহিষের উল্টো করা শিং। একটু পরেই বিনা প্রতিবাদে পাঁচ মাস পর ডিসকভারির আকাশ থেকে বিদায় নিল সৌর জগতের অধিকারী। রাত নেমেছে।
এখনো নিচের বিশাল সাম্রাজ্য পুরোপুরি অন্ধকার হয়নি। নিচে ফসফরাসের আলো উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে। আলোর স্নান নদী প্রান্ত থেকে প্রান্তে বয়ে যাচ্ছে সবেগে। এখানে সেখানে তরল আগুনের মাতামাতি। বৃহস্পতির লুকানো হৃদয় থেকে উৎসরিত আলোময় গ্যাস ভাসিয়ে দিতে চায় চারদিক। পলক না ফেলে দেখার মতো দৃশ্য।
এগুলো খুবই সাধারণ কেমিক্যাল আর ইলেক্ট্রিক্যাল বিক্রিয়ার ফল, নাকি কোনো অপার্থিব প্রাণের পার্শ্ব-উপাদান? এই এক প্রশ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীরা তর্ক চালিয়ে যাবে যে পর্যন্ত কোনো অভিযান দিয়ে এর সমাপ্তি না ঘটে।
তারা বৃহস্পতির রাতের আরো ভিতরে যেতে থাকলে নিচের উজ্জ্বলতা আরো বেড়ে চলে। একবার অরোরার ডিসপ্লের সময় বোম্যান উত্তর কানাডার উপর দিয়ে উড়ে গিয়েছিল। সেই সুন্দর সৌর সৌকর্যময় এলাকায় বরফ থাকাতে আলোর দীপ্তি আরো বেড়ে যায়। কিন্তু তারা এখন যে এলাকায় ভেসে বেড়াচ্ছে সেটা একই রকম উজ্জ্বল হলেও শত ডিগ্রি নিচে হবে তার তাপমাত্রা।
‘পৃথিবীর সিগন্যাল দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে,’ বলল হাল, আমরা প্রবেশ করছি প্রথম ডিফ্রাকশন জোনে।
তারা জানে এমন হবে। তবু, প্রথমবারের মতো সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের একেবারে বিমূঢ় করে দেয় কিছুক্ষণের জন্য। রেডিও ব্ল্যাকআউট মাত্র একঘণ্টা চলবে। এই একটা ঘণ্টা তাদের জীবনের দীর্ঘতম প্রহরের মধ্যে অন্যতম।
অপেক্ষাকৃত কম বয়সের মধ্যেই পোল আর বোম্যান প্রায় এক ডজন মহাকাশ অভিযান সেরে ফেলেছে। কিন্তু আজ হঠাৎ করে তাদের একেবারে নবীসের মতো লাগে। কোনোকালে এই গতিতে কোনো শিপ মহাকাশ ভ্রমণ করেনি। তারা বৃহস্পতির আকর্ষণকে দোলনা হিসেবে ব্যবহার করছে। একচুল এদিক-সেদিক হলে হয় সৌর জগতের বাইরে গিয়ে পড়বে, নয়তো গ্রহরাজের বুকে। দুটোই মৃত্যুর অপর নাম।
ধীর মিনিটগুলো কাটতে চায় না। এখন তাদের উপর বৃহস্পতি যেন ফসফরাস আলোর এক অসীম দেয়াল। এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে দৈত্যাকার গ্রহটা তাদেরকে উপগ্রহ বানিয়ে ফেলেনি।
অবশেষে, অনেক দূরে আলোর একটা ঝলক খেলে গেল। সেই একই মুহূর্তে হাল সগর্বে ঘোষণা করে উঠল, ‘আমি পৃথিবীর সাথে রেডিও যোগাযোগ করতে পেরেছি। একই সাথে আমরা এই জটিল পথপরিক্রমাও শেষ করেছি। শনির পথে আমরা চলব একশো সাতষট্টি দিন, পাঁচ ঘণ্টা, এগারো মিনিট।
ডিসকভারি অবশেষে বৃহস্পতির সদা চলনশীল গ্র্যাভিটিশনাল ফিল্ড থেকে মুক্তি পেল। এক ফোঁটা ফুয়েল না পুড়িয়ে সে বাড়িয়ে নিয়েছে প্রতি ঘণ্টায় কয়েক হাজার মাইল গতি।
কিন্তু এখানেও প্রকৃতির সাথে কোনো জুয়া খেলা সম্ভব নয়। প্রকৃতি ডিসকভারিকে যতটুকু বাড়তি মোমেন্টাম দিয়েছে ঠিক ততটুকু কেড়ে নিয়েছে বৃহস্পতি থেকে। গ্রহটির ভরবেগ একটু হ্রাস পেলেও এর আকার ডিসকভারির তুলনায় কয়েক সেক্সটিলিয়ন গুণ বেশি হওয়াতে অর্বিটের স্থানচ্যুতি অসম্ভব কম। আজো সে সময় আসেনি যেদিন মানুষ তার কাজের ছাপ ফেলবে পুরো সৌর সাম্রাজ্যে।
আলো ফিরে আসতে আসতে পোল আর বোম্যান মহানন্দে পরস্পরের হাত ঝাঁকানো শুরু করে।
কিন্তু এখন আর তাদের বিশ্বাস হতে মন চায় না যে মিশনের প্রথম অংশটা মাত্র শেষ হল।
পুরোটাই পড়ে আছে সামনে।
অধ্যায় ২০. ঈশ্বরদের ভুবন
কিন্তু বৃহস্পতির সাথে তাদের লেনদেন শেষ হয়নি। অনেক পেছনে ফেলে আসা পোবদুটো ডিসকভারির সাথে লালচে দানবটার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।
একটা কোনো জবাবই পাঠায়নি। সম্ভবত ঢোকার পথেই জ্বলে গেছে। অন্য পোবটা একটু বেশি সাফল্য দেখানো শুরু করে। বৃহস্পতীয় আবহমণ্ডলের প্রথম স্তর ভেদ করে ভিতরে গিয়ে আবার ফিরে এসেছে বাইরে। পরিকল্পনামতো জিনিসটা এত বেশি গতি হারিয়েছে যে একটা বাঁকা পথ ধরে একে আবার বাইরে ফিরে আসতে হয়। দু-ঘণ্টা পর পোব গ্রহরাজের দিনের অংশে প্রবেশ করে ঘণ্টায় সতুর হাজার মাইল বেগে। সে এখন এক উপগ্রহ।
একটু পরই গ্যাসের একটা পাকচক্রে পড়ে গিয়ে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। ব্যগ্রভাবে অনেক মিনিট কাটানোর পর শিপের দর্শকরা নিশ্চিত হতে পারল না এ জিনিস আর কাজে লাগবে কিনা। সিরামিকের শিল্ডটা আবার যোগাযোগের আগেই পুড়ে গেলে সব আশা ভরসা ফুরিয়ে যাবে। কারণ ভিতরের যন্ত্রপাতির বাষ্পে পরিণত হতে দু-সেকেন্ড নাও লাগতে পারে।
কিন্তু শিল্ডটা কাজে লেগেছে। রোবট অ্যান্টেনা বেরিয়ে এসে উঁকি দিচ্ছে চারপাশে। প্রথম খবর পৌঁছতে পৌঁছতে ডিসকভারি চলে গেছে আড়াই লাখ মাইল দূরে।
প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার পালসের বর্ষণ হচ্ছে বৃহস্পতির আবহ থেকে। ঘোষণা হচ্ছে বায়ুমণ্ডলীয় সংযুক্তি, চাপ, তাপমাত্রা, চৌম্বকক্ষেত্র, তেজস্ক্রিয়তা সহ আরো শত শত জটিল অবস্থা যা শুধু পৃথিবীর বুকে বসে থাকা এক্সপার্টের দল বুঝতে পারবে। একটা রিপোর্ট সাথে সাথে বোঝা যায়, কারণ তা আসছে টিভি মনিটরে, পুরোপুরি রঙিন চিত্রে।
