এর বেশিরভাগই খুচরো শব্দ, আবার কোনো কোনোটা পৃথিবীর ভ্যান এ্যালেন *বিশেষ টিকা দ্রষ্টব্য বেল্টের মতো কিন্তু তার চেয়ে অনেক অনেক বড় আর ক্ষমতাবান বৃহস্পতীয় বেল্টের তর্জন-গর্জন।
মাঝে মাঝে ভালো না লাগলে বোম্যান একা একা এসব শব্দে ঘর ভরে তোলে। এ যেন লক্ষ আতঙ্কিত পাখির চিৎকার। যেন কোনো নির্জন সমুদ্রতীরে উন্মাতাল ঢেউ ভাঙছে আর ভাঙছে, যেন কোন সে দূরের পথে একের পর এক বজ্রপাতের শব্দে ভরে উঠছে আশপাশ।
অসহায়ের মতো সে শোনে। তার করার কিছুই নেই।
ঘণ্টায় লক্ষ মাইলেরও বেশি গতিতে চলতে থাকা ডিসকভারি পুরো বৃহস্পতি জগৎ পেরুতে সময় নেবে দু হপ্তারও বেশি। সূর্যের অনুগত গ্রহের চেয়ে বৃহস্পতির অনুগত উপগ্রহের সংখ্যা বেশি। চান্দ্র অবজার্ভেটরি প্রতি বছরই একটা করে নতুন স্যাটেলাইট আবিষ্কার করত, ভাগ্য ভালো, এক সময় আবিষ্কার করাটা বন্ধ হয়েছে। হিসাবটা ঠেকেছে ছত্রিশ পর্যন্ত এগিয়ে। সবশেষ উপগ্রহের নাম বৃহস্পতি-পঁচিশ। সেটা এক কোটি নব্বই লক্ষ মাইলের অস্থিতিশীল কক্ষপথে তার সাময়িক দেবতার কাছে আত্মসমর্পণ করে।
এ হল সূর্য আর বৃহস্পতির চিরকালীন দ্বন্দ্ব। সাধারণত বৃহস্পতিই বেশি এগিয়ে থাকে, তবে কয়েক মিলিয়ন বছরের মধ্যে অন্তত একবার বৃহস্পতির কোনো না কোনো উপগ্রহ হারিয়ে যায় গ্রহাণুপুঞ্জের মেলায়। শুধু বাইরের দিকের উপগ্রহগুলোই তার নিজের সম্পদ।
এবার অকল্পনীয় অভিকর্ষজ ক্ষেত্রের সাথে দুর্দান্ত একটা খেলা চলবে। ডিসকভারি এখন এগিয়ে যাচ্ছে একটা জটিল পথ ধরে। এ অর্বিট কয়েক মাস আগে পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা আবিষ্কারের পর হাল পরীক্ষা করে দেখেছে ভালোমতো। তাদের ট্রাজেক্টরির সাথে মানিয়ে নিতে প্রতি মিনিটেই কন্ট্রোল জেটকে চালাতে হবে।
পৃথিবীর সাথে সারাক্ষণ যোগাযোগ চলছে। তারা আজ পৃথিবী থেকে এত দূরে যে আলোর গতিতে সিগন্যাল আসতেও পঞ্চান্ন মিনিট সময় নিবে। তাই পুরো পৃথিবী তাদের দিকে নিষ্পলক চেয়ে থাকলেও তারা যে খবরটা পাচ্ছে, যে দৃশ্যটা দেখছে তা একদম এক ঘণ্টার পুরনো।
প্রতিটা দৈত্যাকার ইনার স্যাটেলাইটের পাশ কেটে যাবার সময় টেলিস্কোপ মহাব্যস্ত হয়ে পড়ে। লাখো ছবি তুলে নিতে দ্বিধা করে না হাল। সেসব উপগ্রহের প্রত্যেকটা আকৃতিতে চাঁদের চেয়ে বড়। রহস্যে একেবারে আবৃত। ট্রানজিটের তিন ঘণ্টা আগে বৃহস্পতির আরেক উপগ্রহ ইউরোপার মাত্র বিশ হাজার মাইল দূর দিয়ে এগিয়ে যায় স্পেসশিপটি। সূর্যের দিকে হারিয়ে যাবার আগে সেটা ছিল পূর্ণ এক গোলক, তারো আগে চিকণ চাঁদের মতো দেখা দিয়েছিল। তার দিকে সব যন্ত্রপাতি চেয়ে ছিল বুভুক্ষের মতো। একদৃষ্টে। সেটার বুকে এককোটি চল্লিশ লাখ বর্গ মাইল এলাকা আছে। যে তথ্যগুলো টুকে নেয়া হচ্ছে প্রতি মিনিটে সেগুলো বিস্তারিত ভেঙে দেখতে হলে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে।
দূর থেকে ইউরোপা দেখতে যেন এক দৈত্যাকার তুষারের বল। দারুণভাবে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে যাচ্ছে সব সময়। কাছ থেকে দেখে বোঝা গেল যে ইউরোপা আসলে চাঁদের মতো ধূলিধূসর নয়, বরং বিরাট বিরাট হিমবাহের কল্যাণে তুষার শুভ্র। সেখানে অ্যামোনিয়া আর পানির কোনো অভাব নেই। বৃহস্পতির মাধ্যাকর্ষণ বল কীভাবে এগুলোকে একত্র করেছে কে জানে!
শুধু দুই মেরুতেই কোনো বরফ নেই। সেখানে নগ্ন পাথর বেরিয়ে আছে তাদের কালো মুখ ব্যাদান করে। কয়েকটা মৃত অগ্নিগিরিমুখ দেখা গেলেও আগ্নেয়গিরির কোনো লক্ষণ পাওয়া গেল না; ইউরোপার কোনোকালেই কোনো অভ্যন্তরীণ উষ্ণতা উৎস ছিল না।
সেখানে বায়ুমণ্ডলের সূক্ষ্ম একটা লক্ষণ ধরা পড়ে। কোথাও কোথাও মেঘের ছোঁয়া। এ্যামোনিয়ার ধোয়া হতে পারে, মিথেন-বাতাসে এর জন্ম হওয়া বিচিত্র কিছু নয়।
বৃহস্পতি এখন মাত্র দু-ঘন্টার পথ। হাল বারবার জাহাজের পথ দেখে নেয়। এখনো বিন্দুমাত্র সংশোধনের প্রয়োজন নেই। একটাই ভাবনা, বৃহস্পতি না টেনে নেয় তার অতল গর্ভে।
এবার অ্যাটমোস্ফিয়ারিক ভোব পাঠানোর পালা। আশা করা হয় এগুলো বেশ কিছুকাল টিকে থাকবে এবং খবরাখবর পাঠাবে পৃথিবী কিংবা ডিসকভারির বুকে।
দুটি বোমার আকৃতির বেঁটেখাট পোব ভদ্র মানুষের মতো ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ডিসকভারির অর্বিটে। সেগুলো কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত ডিসকভারির পেছন পেছন যাবে, আগুন যাতে না ধরে যায় তাই তার সাথে আছে হিট শিল্ড।
হাল নজরদারী করছে তাদের উপর। এবার শিপ যাবে বৃহস্পতির একেবারে নিকটতম অর্বিটে। এই কক্ষপথের ঠিক নিচেই বৃহস্পতীয় বায়ুমণ্ডলের শুরু। মাত্র কয়েক লাখ মাইলের ব্যবধানে এ কাজ সারা একেবারে ভয়াল বলা চলে, কারণ গ্রহটার ব্যাসই নব্বই হাজার মাইল। কিন্তু এ দূরত্বকে যথেষ্ট বলা যায়।
এবার পুরো আকাশ জুড়ে বসেছে গ্রহরাজ বৃহস্পতি। এর বিশাল আকার চোখও ধারণ করতে পারছে না, পারছে না মনও। চলছে মোহনীয় আলোর খেলা। লাল, হলুদ, গোলাপি, আর স্যামন রঙের হোলি না থাকলে বোম্যানের মনে পড়ে যেত পৃথিবীর আকাশের কথা।
আর, পুরো অভিযানে প্রথমবারের মতো তারা সূর্যকে আড়াল করতে যাচ্ছে। এখন সে অনেক ম্লান, অথচ সেই পৃথিবী থেকেই বিশ্বস্ত সফরসঙ্গী হিসেবে পথ দেখিয়েছে আলো দিয়ে। কিন্তু এবার অর্বিট ডিসকভারিকে টেনে নিয়ে যাবে বৃহস্পতির আড়ালে। এগিয়ে আসছে সেই রাত।
