ছ’ ঘণ্টা পর পোল তার সাথে যোগ দিল। এখন ৭৭৯৪ শত গুণ উজ্জ্বল। এত দ্রুত এগিয়ে আসছে যে তাকে দেখতে কারো অসুবিধা হচ্ছে না। এখন আর কোনো আলোকবিন্দু নয়, এগিয়ে আসছে এক স্পষ্ট চাকতি।
তারা যেন দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর ছোট্ট পাথুরে দ্বীপের দেখা পেয়ে আনন্দে আটখানা হওয়া কোনো বুভুক্ষু নাবিক। সবাই জানে এটা এক প্রাণহীন, বাতাসহীন পাথরের চাঙর, তাতে কী? আরো দু’শ মিলিয়ন মাইলের মধ্যে এই একটা জিনিসই দেখা যাবে। তারপর আছে বৃহস্পতির দুনিয়া।
গ্রহাণুটা বেটপ আকৃতির। একপাশ থেকে আরেকপাশে ঘুরছে, যেন বলছে, আমিও গ্রহ, মেনে চলি গ্রহের নিয়ম। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন অ্যাস্টরয়েডরা আসলে কোনো এক বিশাল গ্রহের ভগ্নাবশেষ। সেই গ্রহেরই কক্ষপথ ধরে অথৈ শূন্যতায় ঘুরে চলেছে আজো।
কখনো এটাকে মনে হয় সমতল কোনো চতুষ্কোণ বস্তু, কখনো বাঁকানো ইট আবার কখনোবা আরো বিকৃত। প্রতি দু-মিনিটের একটু বেশি সময়ে সেখানে একটা পূর্ণ দিন আর রাত পেরিয়ে যায়, অর্থাৎ একটা চক্র সম্পন্ন হয়। কখনো আলো ছায়ায় এক দুর্বোধ্য চিত্র সে, কখনোবা দ্যুতিময়।
তাদের পাশ দিয়ে গ্রাহক সেকেন্ডে ত্রিশ মাইল বেগে হারিয়ে যাচ্ছে। তাই দেখার জন্য তারা মাত্র কয়েকটা মিনিট হাতে পাবে। এর মধ্যেই ডজন ডজন ছবি তোলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ অভিযানের জন্য শব্দের প্রতিধ্বনি নেয়া হয়েছে, আর পূর্ণ পরীক্ষা করার সুযোগ মিলেছে মাত্র একবার।
যে প্রোবটা পাঠানো হয়েছে সেটায় কোনো যন্ত্রপাতি নেই। এমন মহাজাগতিক গতিতে চলার সময় কেউ সংঘর্ষ সয়ে যেতে পারবে না। আসলে প্রোবটা হল এক টুকরো ধাতু, সেটাকে ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে গ্রহাণুর দিকে।
ছুঁড়ে দেয়ার আগে দুজনে উত্তেজনার শেষ সীমায় চলে যায়, শত ফুটের কোনো টার্গেটে ঢিল ছোঁড়া কোনো ব্যাপার না হলেও হাজার হাজার মাইল দূর থেকে ঘণ্টায় আশি হাজার মাইল বেগে চলা লক্ষ্যে এমন কাজ চালানো …
অ্যাস্টেরয়েডের আঁধার অংশে বিশাল আলোর বিস্ফোরণ হয়। অপার্থিব গতিতে সংঘর্ষের কারণে প্রোবের অনেকটা ভর আর সবটুকু গতি পরিণত হয় তাপশক্তিতে। জ্বলন্ত বাস্পে ছেয়ে যায় আশপাশ।
ডিসকভারিতে সাথে সাথে ক্যামেরাগুলো বর্ণালী রেখার ছবি তুলে নেয়। পৃথিবীতে বসে বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে মাতামাতি করবে। এবং জ্বলন্ত পরমাণু ও অনুগুলোর খোঁজ পাওয়ার সাথে সাথে প্রথমবারের মতো গ্রহাণুর গঠন-উপাদানের কথা পৃথিবীর মানুষ প্রমাণসহ জানতে পারবে।
একঘণ্টায় আবার সেটা টিমটিমে তারায় পরিণত হলো, পরের বার বোম্যান খোঁজ করতে এলে সেটার কোনো চিহ্নই দেখাতে পারেনি হাল।
তারা আবার একা। তিনমাস পর আসছে গ্রহরাজ বৃহস্পতি।
অধ্যায় ১৯. বৃহস্পতির পথে
দু’কোটি মাইল দূর থেকেও বৃহস্পতিকে আকাশের সবচে উজ্জ্বল জিনিস বলে মনে হয়। এখনি গ্রহরাজকে স্নানভাবে আলো ছড়ানো স্যামন মাছের পেটের মতো দেখাচ্ছে। পৃথিবী থেকে চাঁদকে যেমন লাগে তার অর্ধেক আকৃতি পেয়ে বসেছে সে। বৃহস্পতির বাইরের জগতে রাজত্ব করছে চার উপগ্রহ আইও, ইউরোপা, গ্যানিমিড, ক্যালিস্টো। এ চারটা যদি বাইরে থাকত তবে নির্দ্বিধায় গ্রহ হিসেবে পরিগণিত হতো। কিন্তু দৈত্যাকার ম্রাট বৃহস্পতির কাছে এরা মামুলি প্রজা।
টেলিস্কোপে বৃহস্পতি এক বহুরঙা আকাশজোড়া গোলক হিসেবে ধরা দেয়। বারবার বোম্যান নিজেকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে এর ব্যাস পৃথিবীর চেয়ে এগার গুণ বড় আর এখন এ বিশালত্ব বুঝে ওঠার সাধ্য নেই তার।
নিজেকে হালের টেপ থেকে শিক্ষা দিতে দিতে হঠাৎ কিম্ভুত একটা ব্যাপার নজরে পড়ে যায়। অদ্ভুত একটা আকৃতি, এই বৃহস্পতির বুকেও পৃথিবীর বুকে ভারতের মতো বড় হয়ে দেখা দিয়েছে সেটা।
ঠিকমতো টেলিস্কোপে বড় করে তুলে ধরার পর দেখা গেল জিনিসটাকে। বৃহস্পতির মহাঘূর্ণনের সাথে সাথে বিশাল মেঘমালা যেন ঘুরছে। কিছু ফিতার মতো এলাকাও চোখে পড়ে, সেগুলো গ্যাসের ঘূর্ণনে প্যাঁচ খেয়ে যায় মাঝে মাঝে। বাস্পের বিশাল দল উঠে আসে। এগুলোর কোনো কোনোটা আবার সিঁড়ির মতো একটা আরেকটার সাথে যুক্ত। সেসব সিঁড়িও অস্থায়ী। সেই মেঘমালার নিচে আর কী লুকিয়ে আছে? ভাবে সে, ভেবে নিজের ভিতরই হোঁচট খায়, আর কী লুকিয়ে থাকতে পারে?
এই চিরঘূর্ণায়মান বিশাল মেঘের ছাদের নিচে চিরদিনের জন্য আসল উপরিতলটা ঢেকে রাখে মহামতি বৃহস্পতি। তার রাজকীয়তার সাথে রাজকীয় গোপনীয়তাও স্পষ্ট। সেই মেঘের দেশে আবার কালো আকৃতি চোখে পড়ে, ভিতরের দিকের ছোট উপগ্রহগুলো কোনো কোনোটা ছায়া ফেলে মেঘরাজ্যের উপর।
সেখান থেকে বোম্যান বৃহস্পতির অন্যান্য উপগ্রহও দেখতে পায়। কিন্তু সেগুলো সামান্য উড়ন্ত পাহাড় ছাড়া কিছু নয়, মাত্র কয়েক হাজার কিলোমিটার তাদের ব্যাস। এবার শিপ তাদের কোনো একটার পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাবে। প্রতি মিনিটে রাডার তার শক্তি সঞ্চয় করে নীরব বজ্রাঘাত করবে সেসব উপগ্রহের গায়ে। শূণ্যতার মাঝ দিয়ে বেরিয়ে যায় তরঙ্গ, যেটুকু ফিরে আসে তা দিয়ে কোনো নতুন উপগ্রহের সন্ধান মেলে না।
বরং ফিরে আসে বৃহস্পতির গর্জনশীল রেডিও ভয়েস। উনিশশো পঞ্চান্ন সালকে বলা হয় মহাকাশবিদ্যার নবজন্মের কাল। তখন অ্যাস্ট্রোনোমাররা দেখতে পায় যে স্বয়ং বৃহস্পতি আকাশে লক্ষ লক্ষ হর্স পাওয়ারের দশ মিটার ব্যান্ড তরঙ্গ আকাশে ছুঁড়ে দিচ্ছে। অবিরত।
