বিশ্রামের জন্য সব সময় হাল তার সঙ্গী। গাণিতিক উপগাণিতিক গেমগুলো বেশ মজা দেয় তাকে। দাবা, চেকার্স, পলিওমিনাস গেমগুলো সব সময় খেলে তারা দুজন। হাল যদি নিজের সমস্ত ক্ষমতা দিয়ে খেলে, তাহলে কোনো মানুষের পক্ষে কখনোই জিতে যাওয়া সম্ভব হতো না। তাই এটাকে পঞ্চাশভাগ খেলা জেতার মতো করে প্রোগ্রাম করা হয়েছে। তার মানব সাথীরা এ খবর জানে না।
বোম্যানের শেষ ঘণ্টাগুলো খুচরো কাজেই ব্যয় হয়ে যায়, তারপর 2000 টায় পোলের সাথে ডিনার সেরে শুতে যাওয়া। এরপর একটা ব্যক্তিগত ঘণ্টা। পৃথিবী থেকে খবর নেয়া বা দেয়ার কাজে এটা খরচ করে ওরা।
অন্য সব সঙ্গীর মতো বোম্যানও অবিবাহিত। এত লম্বা অভিযানে বিবাহিত মানুষ পাঠাবার কোন যুক্তি নেই। অনেক সুকন্যাই তাদের ফিরে আসার আশায় দিন গুনবে বলে রেখেছে, কিন্তু কেউ কথাটা বিশ্বাস করেনি। তারা সপ্তাহে একবার পার্সোনাল কল করত, কিন্তু অপর প্রান্তে শোনার মানুষের কোনো অভাব ছিল না। আর এখন, অভিযানের শুরুর দিকেই মেয়েদের সংখ্যা কমতে শুরু করে। এমনই হবার কথা চিরকাল। তারা জানে। এ হল নভোচারীর চিরন্তন ভাগ্য, এমনই ছিল আগের দিনের পালতোলা জাহাজের বীর নাবিকের ললাট।
কথা সত্যি, সামুদ্রিক নাবিকেরা সাথী পেত, পেত ছোট্ট সব অভিযানের দায়িত্ব, সেগুলো বড়জোর বছরখানেকের মতো লম্বা। তাদের আছে অনেক অনেক নতুন নতুন বন্দর; দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, পৃথিবীর অর্বিটে কোনো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় চমৎকার। দ্বীপদেশ নেই। স্পেস মেডিকরা এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে যথাসাধ্য করেছে।
একেবারে শেষ মুহূর্তে বোম্যান তার ফাইনাল রিপোর্ট জমা দেয়, চেক করে নেয় হালের টেপগুলো। তারপর মন চাইলে কয়েক ঘণ্টা বই পড়া বা চলচ্চিত্র দেখা। মাঝরাতে ঘুমাতে গেলে তার সাধারণত ইলেক্ট্রোনারকোসিসের সহায়তার প্রয়োজন পড়ে না।
পোলের কাজটাকে বলা চলে বোম্যানের কাজের প্রতিচ্ছবি। তারা দুজনেই অত্যন্ত বুদ্ধিমান, স্থির চিন্তার অধিকারী এবং নিয়মানুবর্তী। তাদের মধ্যে কাজে গাফলতি বা ঝগড়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। মিশন চলতে থাকে নিজের মতো।
ডিসকভারির ক্রুদের একটাই প্রত্যাশা, আগামী দিনগুলোতেও যেন এই রুটিনের কোনো ব্যত্যয় না হয়।
শুধু সময়ই এর জবাব দিতে পারে।
অধ্যায় ১৮. গ্রহাণুপুঞ্জের ভেতর দিয়ে
সপ্তাহের পর সপ্তাহ একটা পথচলতি গাড়ির মতো ডিসকভারি নিজের অতি পরিচিত পথ আর অর্বিট ধরে এগিয়ে চলে। কিছুদিন আগে সে পেরিয়ে এসেছে মঙ্গলের কক্ষপথ, এগিয়ে যাচ্ছে বৃহস্পতির দিকে। পৃথিবীর সাগর আর আকাশে চলা অন্য লাখো শিপের সাথে তার এক বিরাট তফাৎ আছে। সে তাদের মতো প্রতি মুহূর্তে শক্তি ব্যয় করে চলে না। কাজে লাগায় গ্রহগুলোর গ্র্যাভিটিশনাল ফোর্সকে, মেনে চলে মহাকর্ষের অমোঘ কানুন। কোনো ডুবো চর বা পর্বত চূড়ায় ধাক্কা খাবার সম্ভাবনা নেই, নেই অন্য কোনো বাহনের সাথে সংঘর্ষের আশঙ্কা। কারণ মঙ্গলের পর থেকে অসীমে মিলিয়ে যাওয়া তারার দলের মধ্যে কোথাও মানুষের তৈরি কোনো যান চলছে না।
কিন্তু সামনে একটা নো ম্যান্স ল্যান্ড পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে। দশ লাখেরও বেশি গ্রহাণু এ পথ ধরে বিচরণ করে। এদের মধ্যে বড়জোর দশ হাজার খণ্ডকে পৃথিবীর মহাকাশ বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি চিনতে পেরেছে, জানতে পেরেছে তাদের গতিপথ। তাদের মধ্যে মাত্র চারটির ব্যাস একশো মাইলের চেয়ে বেশি। পরিমাণে সবচে বেশি যারা আছে তারা হল মাঝারি আকারের পাথর-চাকতি। এরা এলোমেলোভাবে ভেসে বেড়ায় স্পেসের বুকে।
একদম ছোট্ট একটা গ্রহাণুও শিপটাকে একেবারে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু এদের নিয়ে কিছু করার নেই। সাধারণত হাজার মাইলের মধ্যে একটা অ্যাস্টেরয়েড খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই দুর্ঘটনার সম্ভাবনা খুবই কম। কোনো এলাকার দশ লাখ মাইলের মধ্যে গড়ে মাত্র একটা গ্রহাণু পাওয়া যেতে পারে।
ছিয়াশিতম দিনে তারা পরিচিত কোনো অ্যাস্টেরয়েডের সবচে কাছ দিয়ে যাবে। এর নাম নেই, সাধারণ একটা নাম্বার আছে-৭৭৯৪। পঞ্চাশ গজ ব্যাসের জিনিসটা সাতানব্বইতে চান্দ্র অবজার্ভেটরির চোখে প্রথম ধরা পড়ে। আবিষ্কারের পরপরই ব্যাপারটাকে ভুলে যাওয়া হয়, শুধু রেকর্ড থেকে যায় মাইনর প্ল্যানেট ব্যুরোতে।
কাছাকাছি আসার সাথে সাথে হাল বোম্যানকে মনে করিয়ে দেয় গ্রহাণুটার কথা। কিন্তু পুরো ভয়েজে এই একটা বাহ্যিক কাজই তার করার কথা, এটা কি ভোলা সম্ভব? অ্যাস্টেরয়েডটার গতিপথ, এর সবচে কাছে আসার মুহূর্ত, এর ছবি তোলার সম্ভাবনা-সবই ডিসপ্লে স্ক্রিনে উঠে পড়েছে। ৭৭৯৪ যখন তাদের মাত্র ন’শো কিলোমিটার দূর দিয়ে যাবে তখন তারা একেবারে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। দুজনের আপেক্ষিক গতি হবে ঘণ্টায় আশি হাজার মাইল।
বোম্যান হালকে টেলিস্কোপিক ডিসপ্লে দিতে বললে একটা নক্ষত্র-মানচিত্র ভেসে উঠল চোখের সামনে। এর মধ্যে কোনোটাকেই গ্রহাণুর মতো দেখায় না। টেলিস্কোপের সর্বশক্তি নিয়োগের পরও একেবারে মাত্রাহীন আলোর বিন্দু ছাড়া আর কিসসু চোখে পড়ে না।
‘টার্গেটের দিকে তাক কর।’
সাথে সাথে চারটি ক্ষীণ রেখা উঠে আসে। এরপর কিছু না দেখে যখন সে হাল ভুল করেছে ভেবে বসছে তখনি দূরের একটা আলোকবিন্দুকে নড়তে দেখা গেল। তারার জগত থেকে এক নক্ষত্র যেন এগিয়ে আসছে একটু একটু করে। এটা এখনো হয়তো আধ মিলিয়ন মাইল দূরে।
