উপসংহারের বিষয় ধর্ষণ। লিঙ্গের সবচেয়ে বড়ো অপচয় এবং জঘন্যতম ব্যবহার হল ধর্ষণ। একশ্রেণির মানসিক বিকারগ্রস্ত পুরুষ নারীদের ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যেই এই অপকর্মটি করে থাকে। এইসব যৌন-প্রতিবন্ধী (Sextual Handicapd) পুরুষরা আসলে লিঙ্গ নামক অস্ত্রটিকে ব্যবহার করে নারীদের হত্যা করে। কিছু আগ্রাসী পুরুষও আছে, যাদের মধ্যে জোর করে ভোগ করার প্রবণতা কাজ করে। প্রাচীনকাল থেকে সামাজ্যবাদীরা এলাকা দখল করতে এসে তলোয়ার-বল্লমের পাশাপাশি নিজেদের লিঙ্গটাকে ব্যবহার করতে ভোলেননি। পছন্দ হলে জোর করে মেয়েদের তুলে এনে ফেলে দেওয়া হত হারেমের অন্ধকারে। নারীদের উপর চড়াও হওয়া এবং ধর্ষণ করা ছিল নিত্য আতঙ্ক। সেই আতঙ্ক কি আজও নেই? অন্যভাবে, অন্য রূপে? আজও সীমান্ত এলাকায় সৈনিকদের বন্দুকের নলের নীচে কত নারী ধর্ষিতা হচ্ছে তার হিসাব কে রাখল! শুধু সৈনিক কেন, সৈনিক নয় এমন মানুষও তো বোয়া তুলসীপাতা নয়। এইরূপ পুরুষদের উত্থিত লিঙ্গ কেউ কর্তন করে না কেন? শুধু আইন দিয়ে ধর্ষণ নির্মূল করা যাবে না। ধর্ষণ নির্মূল করতে হলে মেয়েদের সক্রিয়তা বাড়াতে হবে। সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। নারীর সম্ভ্রম, নারীর আত্মরক্ষার জন্য লিঙ্গ-কৰ্তন আদালত নিশ্চয় সহানুভূতির সঙ্গে দেখবেন।
জয়তুঃ ভব।
মোহে-নির্মোহে নগ্নতা
খাজুরাহো থেকে কসমিক সেক্সের রি সেনের নগ্নতা, রি সেন থেকে থ্রিএক্স। নগ্ন-নারীর ছড়াছড়ি। শুধু নারীই কেন নগ্ন হয়? উত্তর খুঁজব। তার একটু গৌরচন্দ্রিকা সেরে নিই। শুরুতেই জানিয়ে রাখি, আমি নগ্ন (Nude) আর উলঙ্গ (Naked)-র মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখছি না। আমার কাছে এই পার্থক্য অর্থহীন। আমার আলোচ্য বিষয় ‘পোশাকহীন শরীর’। Nude আর Naked-এর পার্থক্য খুঁজুন বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা। যাই হোক, নগ্নতা বলতে কোন্ অবস্থাকে বুঝব? নগ্নতা বলতে কোনো পোশাকহীন শারীরিক অবস্থাকে বোঝায়, বিবস্ত্র অবস্থা। নৃতত্ত্ববিদরা মনে করেন, আদিম মানুষ নগ্ন অবস্থায় থাকত। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে সম্ভবত ৭২,০০০ বছর আগেই মানব সমাজে নগ্নতা নিবারণের জন্য পোশাকের ব্যবহার শুরু হয়। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রধানত মানুষ পোশাক পরিধান শুরু করল। পোশাক পরিধান করার প্রয়োজনীয়তা কার্যকরী চাহিদা থেকে উদ্ভূত। যেমন বাহ্যিক উপাদান, ঠান্ডা এবং তাপ থেকে সুরক্ষা, শরীরের চুলের ক্ষতি রোধ, এবং শীতপ্রধান অঞ্চলে বসবাস ইত্যাদি। পোশাক পরিধান সাধারণত উষ্ণতা থেকে সুরক্ষা এবং সামাজিক বিবেচনার উপর নির্ভর করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ন্যূনতম পোশাক বা পোশাকহীন অবস্থা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হতে পারে। সাধারণভাবে শালীনতাবোধ নগ্নতাকে সমর্থন করে না। তবে স্থান ও কাল ভেদে শালীনতাবোধের ধারণা বিভিন্ন। সভ্য সমাজে যা শালীন, আদিম সমাজে তা বিপরীত। কোনো কোনো নির্দিষ্ট সমাজব্যবস্থায় চিত্রে, ভাস্কর্যে ও সাহিত্যে নগ্নতাকে নান্দনিকতার এক বিশেষ উপাদান মনে করা হয়।
বাইবেলে বর্ণিত আদম ও ইভের কাহিনি অনুসারে, ঈশ্বর প্রথম নর ও নারীকে নগ্ন অবস্থায় সৃষ্টি করেছিলেন। এই নগ্নতার জন্য তাঁদের মনে কোনো লজ্জা ছিল না। পরে শয়তান কর্তৃক প্ররোচিত হয়ে ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন করে তাঁরা, যখন জ্ঞানবৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে, তখন তাঁদের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয় এবং নিজেদের নগ্ন দেখে তাঁরা লজ্জিত হয়ে পড়েন। লজ্জিত হয়ে পড়লে কী হবে। তখন পোশাক কোথায় নগ্নতা ঢাকার জন্য? অতএব গাছের বড়ো বড়ো পাতা, ছাল-বাকলই ছিল শরীর ঢাকার উপাদান। শুরুতে শুধুই নিন্মাঙ্গ ঢাকা হত, তার অনেক পরে ঊর্ধ্বাঙ্গ (মেয়েরা) ঢাকা হতে থাকল।
যাই হোক, কোনো কোনো প্রাচীন সভ্যতায় নগ্নতাকে অপমানকর বলে মনে করা হত। আদি বাইবেলে ফ্যারাও-শাসনাধীন মিশর ও ইহুদিদের একটি বর্ণনা থেকে এই চিত্র পাওয়া যায়: “আসিরিয়ার সম্রাট এই দুই দে (মিশর ও সুদান) থেকে বন্দিদের বিবস্ত্র অবস্থায় নিয়ে যাবে। যুবা-বৃদ্ধ সকলকেই নগ্ন পদে বিবস্ত্র অবস্থায় পথ চলতে হবে, তাদের অনাবৃত নিতম্ব মিশরের লজ্জার কারণ হবে।” এখানেই শেষ নয়। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায় খেলাধুলা ও সংস্কৃতির জগতে পূর্ণবয়স্ক ও কিশোরদের নগ্নতার সৌন্দর্যের দিকটি বিশেষভাবে প্রশংসিত হত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বালক, নারী ও বালিকাদের নগ্নতাও প্রশংসা পেত। গ্রিকদের সৌন্দর্য চেতনায় প্রকৃতি, দর্শন ও শিল্পের পাশাপাশি মানবদেহেরও বিশেষ স্থান ছিল।
গ্রিক শব্দ ‘জিমন্যাসিয়াম’ কথাটির অর্থ ছিল “যেখানে নগ্ন অবস্থায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়”। সেসময় পুরুষগণ খেলোয়াড়রা নগ্ন অবস্থায় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন। কিন্তু সে যুগে অধিকাংশ নগর-রাষ্ট্রেই নারীদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ, এমনকি দর্শকাসনে উপস্থিত থাকার অনুমতিও ছিল না। তবে স্পার্টা ছিল এর এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম, অবশ্যই। রোমানরা গ্রিক সংস্কৃতির অনেক রীতিনীতি গ্রহণ করলেও, নগ্নতা সম্পর্কে তাদের মানসিকতা পৃথক ছিল। সাধারণ স্নানাগার বা সাধারণ শৌচাগার ছাড়া অন্যত্র নগ্নতাকে অনুচিত আখ্যা দেওয়া হত।
