মৎস্যপুরাণ, শিবপুরাণ, বামনপুরাণ, বায়ুপুরাণ, পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ, অগ্নিপুরাণ, ব্রহ্মপুরাণ, কূর্মপুরাণ, বরাহপুরাণ, ভবিষ্যপুরাণ, ভাগবতপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণগুলিতে কার্তিকের জন্মবৃত্তান্ত জানা যায়, তেমনি লিঙ্গপুরাণেও কার্তিকের জন্মবৃত্তান্ত উল্লেখ আছে। মহর্ষি কশ্যপ ও দিতির পুত্র দানব বজ্রাঙ্গ। বজ্রাঙ্গের স্ত্রী বরাঙ্গী। বজ্রাঙ্গ ও বরাঙ্গীর পুত্রের নাম তারক বা তারকাসুর। বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে তারকাসুর দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠে। দেবতাদের পরাজিত করে সে স্বর্গলোক অধিকার করে এবং দেবতাদের ক্রীতদাসে পরিণত করে। তাঁর অত্যাচারে উৎপীড়িত দেবগণ পরিত্রাণের জন্য পিতামহ ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। ব্রহ্মা দেবতাদের অভয় দিয়ে বলেন– শিব ও পার্বতীর যে অপরাজেয় পুত্র জন্মগ্রহণ করবেন, তিনি সুরাসুরের অবধ্য তারকাসুরকে নিধন করবেন এবং স্বর্গরাজ্য পুনরায় দেবতাদের হবে। যথাকালে তপস্যানিরত শিবকে স্বামীরূপে পাওয়ার জন্য কঠোর পঞ্চাগ্নি তপস্যানির পার্বতীর বিবাহ হয় এবং শিবতেজে পার্বতীর পুত্র কার্তিকেয়র জন্ম হয়। জন্মের পর ছয়জন কৃত্তিকা-মাতৃকা তাঁকে লালন-পালন করেন। শিব ও পার্বতীর অমিততেজা এই পুত্র ছয়মুখে ছয়। কৃত্তিকার স্তনদুগ্ধ পান করেছিলেন। ছয় মুখের জন্য তাঁর নাম ‘ষড়ানন বা ‘ষন্মুখ’। ছয়জন কৃত্তিকা-ধাত্রীজননীর স্তন্যপান করে বর্ধিত হন বলে তাঁর নাম হয় ‘কার্তিকেয়’ বা ‘কার্তিক’। জন্মের ষষ্ঠ দিন দেবসেনাপতিরূপে তাঁর অভিষেক হয় এবং ব্রহ্মার মানসকন্যা দেবসেনার সঙ্গে বিবাহ হয়। সপ্তম দিন তিনি তারকাসুরকে বধ পুরাণগুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান স্কন্দপুরাণ প্রত্যক্ষত তাঁরই নাম বহন করছে।
শিবমহাপুরাণে আমরা দুই ধরনের শিবলিঙ্গ দেখতে পাই, একটা শুধু স্তম্ভ আকারে। যেমন অমরনাথ ইত্যাদির শিবলিঙ্গ। আর-একটি যোনির উপর। স্থাপিতরূপে, যেরূপে হিন্দু রমণীগণ জল-দুধ ঢেলে মনোবাঞ্ছা পূরণ করার প্রার্থনা করেন। ব্রহ্মা বলল —
যাবল্লিঙ্গং স্থিরং নৈব জগতাং ত্রিতয়ে শুভ।
জায়তে ন তদা কাপি সত্যমেতদ্বদাম্যহম্।। (২৫)
অর্থাৎ যে পর্যন্ত লিঙ্গ স্থিরভাব অবলম্বন না করছে, সেই পর্যন্ত ত্রিজগতের কোথায়ও শুভ হবে না, এটা সত্য বলছে।
অমরনাথের শিবলিঙ্গ : অমরনাথ গুহা একটি হিন্দু তীর্থক্ষেত্র, যা ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে অবস্থিত। এটি একটি শৈবতীর্থ। এই গুহাটি সমতল থেকে ৩,৮৮৮ মিটার (১২,৭৫৬ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত। জম্মু ও কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর ১৪১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই তীর্থে যেতে পহেলগাঁও শহর অতিক্রম করতে হয়। এই তীর্থক্ষেত্রটি হিন্দুদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যতম পবিত্র স্থান বলে বিবেচিত হয়। গুহাটি পাহাড় ঘেরা আর এই পাহাড়গুলো সাদা তুষারে আবৃত থাকে বছরের অনেক মাস ধরে। এমনকি এই গুহার প্রবেশপথও বরফে ঢাকা থাকে। গ্রীষ্মকালে খুব স্বল্প সময়ের জন্য এই দ্বার প্রবেশের উপযোগী হয়। তখন লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী অমরনাথের উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। অমরনাথের গুহাতে চুঁইয়ে পড়া জল জমে শিবলিঙ্গের আকার ধারণ করে। জুন-জুলাই মাসে শ্রাবণী পূর্ণিমা থেকে শুরু হয় অমরনাথ যাত্রা। শেষ হয় জুলাই-আগস্ট মাসে গুরু পূর্ণিমার সময় ছড়ি মিছিলে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অমরনাথ যাত্রায় যোগদান করেন।
গুহার ভিতরে ৪০ মিটার (১৩০ ফুট) ভিতরে গুহার ছাদ থেকে জল ফোঁটায় ফোঁটায় চুঁইয়ে পড়ে। এই চুঁইয়ে পড়া জলের ধারা খাড়াভাবে গুহার মেঝে পড়ার সময় জমে গিয়ে শিবলিঙ্গের আকার ধারণ করে। কখনো-কখনো ৮ ফুট উঁচুও হয় এই শিব লিঙ্গ। তবে গত কয়েকবছর ধরেই সময়ের আগেই বরফলিঙ্গ গলে যাচ্ছে, যা হয়তো উষ্ণায়নের ফল। জুন-জুলাই মাসে শ্রাবণী পূর্ণিমা থেকে শুরু হয় অমরনাথ যাত্রা। শেষ হয় জুলাই-আগস্ট মাসে গুরু পূর্ণিমার সময় ছড়ি মিছিলে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অমরনাথ যাত্রায় যোগদান করেন। তীর্থ যাত্রার প্রধান উদ্দেশ্যই এই শিবলিঙ্গে পুজো দেওয়া। অমরনাথে কবে থেকে তীর্থযাত্রা শুরু হয় তা জানা যায় না। একটি তথ্যসুত্র থেকে জানা যায় কিংবদন্তী রাজা আরজরাজা ( খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সাল) বরফনির্মিত শিবলিঙ্গে পুজো দিতেন। ধারণা করা হয়, রানি সূর্যমতী ১১ শতকে অমরনাথের এই ত্রিশুল, বানলিঙ্গ ও অন্যান্য পবিত্র জিনিস উপহার দেন। এ ছাড়াও প্রাচীন কিছু পুথি থেকে আরও বেশ কিছু ভিন্ন এ সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় মধ্যযুগে অমরনাথের কথা মানুষে ভুলে গিয়েছিল, কিন্তু পঞ্চদশ শতকে আবার নতুন করে আবিষ্কৃত হয়। প্রচলিত আছে, কাশ্মীর একসময় জলে প্লাবিত হয়ে যায় এবং কাশ্যপ মুনি সে জল নদীর মাধ্যমে বের করে দেন। এরপর ভৃগুমুনি অমরনাথ বা শিবের বা শিবলিঙ্গের দেখা পান।
পরিশেষে লিঙ্গকে কেন্দ্র করে একটি ভুল ধারণা ভাঙার চেষ্টা করব। সৌদি আরবে অবস্থিত মক্কা শরিফের হাজরে আসওয়াদ পাথরটি কি শিবলিঙ্গ? হিন্দুদের কেউ কেউ তো এমনই বলেন শুনেছি। সত্যটা কী? মহানবি হজরত মোহম্মদ কর্তৃক মক্কা শরিফে স্থাপিত পবিত্র হাজরে আসওয়াদকে (কালোপাথর) লাখ লাখ মুসলমান পাপ থেকে মুক্তি পেতে চুম্বন করে থাকেন। অথচ এই হাজরে আসওয়াদই নাকি শিবলিঙ্গ? এই ধরনের ভিত্তিহীন যুক্তিহীন বিবৃতি থেকে সকলকেই বিরত থাকা উচিত। এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় না, যা দিয়ে সেটাকে শিবলিঙ্গ বলা যায়। পাথর হলেই যেমন শিবলিঙ্গ নয়, তেমনি শালগ্রাম শিলাও নয়। পবিত্র হাজরে আসওয়াদ মোটেই শিবলিঙ্গের আদলে নয়। যে হজরত মোহাম্মদ পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসীদের যেভাবে সৌদি আরব থেকে উৎখাত করেছিলেন, সেই মোহম্মদ আহ্লাদ করে মক্কায় শিবলিঙ্গ স্থাপন করেছেন, এটা মোটেই মেনে নেওয়া যায় না। ইসলামের ইতিহাস এবং হজরতের জীবনী পড়লেই জানা যায় এটা কোনো মতেই শিবলিঙ্গ নয়। ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করা অপরাধ এবং অনৈতিক।
