খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে খ্রিস্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষিত হলে নগ্ন গ্ল্যাডিয়েটর ক্রীড়া ধীরে ধীরে উঠে যায়। এবং প্রাপ্তবয়স্কদের নগ্নতা পাপের পর্যায়ে পর্যবসিত হত। খ্রিস্টধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি প্রথায় পরিণত হয়। যদিও অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত পশ্চিম ইউরোপে খ্রিস্টানরা নগ্ন অবস্থায় ব্যাপ্টাইজড হতেন। ষষ্ঠ শতাব্দীতে সেন্ট বেনেডিক্ট অফ নার্সিয়া তাঁর নিয়মাবলিতে সন্ন্যাসীদের তাঁদের ডরমিটরিতে সম্পূর্ণ পোশাক পরিহিত অবস্থায় ঘুমানোর পরামরুশ দেন। পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপীয় পুরুষেরা মূলত আলখাল্লা জাতীয় পোশাক পরতেন। তারপর কডপিস, টাইটস ও টাইট ট্রাউজার্সের প্রচলন হয়। এই পোশাকগুলি পুরুষাঙ্গকে ঢেকে রাখলেও তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করত।
নগ্নতা শারীরিক শাস্তির অংশও হতে পারে। জমায়েত মানুষর সামনে কারোকে অপমান করার প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রেও অনেকসময়ই এই ধরনেরশাস্তির ব্যবহার করা হয়ে থাকে। নাৎসিরা তাদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দিদের জোর করে নগ্ন করে রাখত। স্টিভেন স্পেলবার্গের ‘Schindler’s List’ নামক মুভিটি যাঁরা দেখেছেন তাঁরা নিশ্চয় মনে করতে পারছেন। এমনকি কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ ডাইনি শিকারের সময় অভিযুক্ত ডাইনিদের সম্পূর্ণ নগ্ন করে তথাকথিত ‘ডাইনি চিহ্ন’গুলি পরীক্ষা করা হত। এইসব চিহ্ন নাকি তাদের বিরুদ্ধে বিচারের প্রমাণ হিসাবে পেশ করা হত এবং শাস্তি প্রদান করা হত। ২০০৩ সালে ইরাকের আবু গারিব কারাগারে কুখ্যাত মার্কিন সেনা-কর্মচারীরা এখানে বন্দিদের নগ্ন করে কখনও বেঁধে ও ভীত-সন্ত্রস্ত করে তাদের ফোটো তুলে রাখত।
নগ্নতা একটি চর্চার নাম। তাই নগ্নতাবাদ একটি আন্দোলনের পরিচয়। নগ্নতাবাদ এক দর্শনের নব্যমার্গ। নগ্নতাবাদ বা প্রকৃতিবাদ হচ্ছে এক ধরনের সামাজিক নগ্নতার ব্যক্তিগত ও জনপ্রকাশ্যরূপ লাভের উদ্দেশ্যে একপ্রকার রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এটি প্রাত্যহিক বা ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা সামাজিক জীবনের ক্ষেত্রে নগ্নতার ব্যবহারকে সংজ্ঞায়িত করতেও ব্যবহৃত হতে পারে। নগ্নতাবাদ ইংরেজি ভাষাতে যেসব পরিভাষায় উচ্চারিত হয়, সেগুলি হল– ‘Social nudity’, ‘Public nudity’, এবং সাম্প্রতিক কালের ‘clothes-free’। কিন্তু কোনোটিই পুরোনো ও সর্বাধিক ব্যবহৃত পরিভাষা ‘Naturism’ (যুক্তরাষ্ট্রে Nudism নামেই বেশি পরিচিত)-এর সমান বিস্তৃতি পায়নি।
নগ্নতাবাদ কেমন দর্শন? পণ্ডিতরা বলেন, নগ্নতাবাদীদের দর্শন বিভিন্ন সূত্র থেকে আমদানি হয়েছে। এহেন দর্শনের অনেকগুলি এসেছে স্বাস্থ্য ও শারীরিক সামর্থ্য সংক্রান্ত, যা এসেছে বিশ শতকের জার্মানি থেকে। এর পিছনে আছে। প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার ধারণা। এছাড়া সাম্যতার সৃষ্টিও এর পিছনে একটি স্পৃহা হিসাবে কাজ করে। অবশ্য পরে জার্মানি থেকে পরবর্তীতে এই ধারণা ইংল্যান্ড, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। জার্মান নগ্নতাবাদীদের সংগঠন জার্মানিতে পারিবারিক ক্ষেত্রে ও বিনোদনমূলক খেলাধুলায় নগ্নতার প্রসারে কাজ করছে। এই কাজের একটি প্রয়াস হিসাবে তারা জার্মান অলিম্পিক স্পোর্টস ফেডারেশনের সদস্যপদ লাভ করেছে। ফরাসিরা নগ্নতাবাদের প্রসারে দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে নগ্নতা উপভোগের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট স্থানে বড়ো কমপ্লেক্স নির্মাণ করেছে। এই ধারণা পরবর্তীতে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রেও প্রসারিত হয়েছে। এছাড়া নগ্নতাবাদী পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র বা রিসর্ট তৈরি হয়েছে। এই ধারণাটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ক্যারিবীয় অঞ্চলে। নগ্নতাবাদের চর্চা নানাভাবে করা হয়। মার্ক অ্যালাইন ডেসকাম্পস নগ্নতাবাদকে বিভিন্ন প্রকারে ভাগ করেছেন। যেমন –(১) ব্যক্তিগত নগ্নতাবাদ, (২) পারিবারিক নগ্নতাবাদ, (৩) বুনো পরিবেশে নগ্নতাবাদ, (৪) সামাজিক নগ্নতাবাদ। এছাড়াও (৫) সামরিক নগ্নতাবাদ, (৬) ক্যাম্পেইনিং ইত্যাদি।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নগ্নতাবাদ : ঘরে ও বাগানে প্রায় সময়ই নগ্নতাবাদের চর্চা করা হয়। এটি হতে পারে একাকী বা পরিবারের সদস্য সহকারে। কানাডীয় এক সমীক্ষায় যে চিত্রটি নজরে আসে, তা চমকে যাওয়ার মতো। শতকরা ৩৯ ভাগ কানাডিয়ান ঘরে নগ্ন অবস্থায় হাঁটাচলা করেন এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় এই হার শতকরা ৫১ ভাগ। ব্যক্তিগত নগ্নতার মধ্যে আছে নগ্ন অবস্থায় ঘুমোনো। যদিও কিছু ক্ষেত্রে এটি স্বাস্থ্যগত উপকারের জন্যও করা হয়। কারণ দেখা গেছে নগ্ন অবস্থায় ঘুম আসতে সুবিধা হয় এবং অনেক্ষণ। ঘুমোনো সম্ভব। অবশ্য সেই সঙ্গে এটি আরামের কারণেও হতে পারে। তবে অনেকে মনে করেন, কাপড়চোপড় পরে ঘুমোনোর চাইতে না-পরে ঘুমোনোর উপকার বেশি। দাম্পত্য-জীবনে স্বামী-স্ত্রীর নগ্ন হয়ে ঘুমোনো নাকি ভালো। ইউএসএ কটন ২০১৪ সালে এক জরিপ চালিয়ে দেখেছে, জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে যাঁরা নগ্ন হয়ে ঘুমোতে অভ্যস্ত তাঁদের মধ্যে শতকরা ৫৭ ভাগই মনে করেন যে তাঁরা সুখী। পাজামা পরে যাঁরা ঘুমোন তাঁদের মধ্যে সুখী দম্পতি ছিল ৪৮ ভাগ। নিউরোলজিস্ট রাচেল সালাস ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে ২ বছর আগে বলেছিলেন, গুহামানবের মতো আধুনিক ফ্যাশন সচেতন মানুষের গায়ে সুতো না-রেখে ঘুমোনো ভালো। তিনি বলেন– “আমাদের পূর্বসূরীরা একসময় নগ্নই ঘুমোতেন। মাংসাশী প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাঁরা মূলত গুহায় ঘুমোতেন এবং নগ্ন হয়েই। তাই নগ্ন হয়ে ঘুমোলে আজও আমরা কিছুটা নিরাপদ বোধ করি। অর্থাৎ, ঘরের তাপমাত্রা বেশি হলে নগ্ন হয়ে ঘুমোনো খুবই ভালো। শরীরের ভারী পোশাক ঘুমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। ঘুম বিশেষজ্ঞরা বলেন, শরীরের তাপমাত্রা ঘুমের গভীরতায় প্রভাব ফেলে। ফলে নগ্ন হয়ে ঘুমোলে শরীর অতিরিক্ত তাপ থেকে মুক্ত থাকতে পারে। স্পর্শ অক্সিটোসিন নামক হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়। নিঃসন্দেহে নগ্ন হয়ে ঘুমালে আপনার শরীর তুলনামূলভাবে বেশি স্পর্শ পাবে। এতে শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যাবে। যৌন কামনা, বন্ধন দৃঢ় করার জন্য অক্সিটোসিন হরমোন বিশেষভাবে পরিচিত। এছাড়া এই হরমোন মানসিক চাপ কমান, বিশ্বাস-আস্থা বৃদ্ধি করে, হৃদযন্ত্রের চাপ স্বাভাবিক রাখা ও যৌন-প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখার কাজ করে। নগ্ন হয়ে ঘুমোলে শরীর থেকে বুড়িয়ে যাওয়া প্রতিরোধক মেলাটোনিনের নিঃসরণ সহজ হয়। ফলে এইভাবে ঘুমোনো তারুণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে। ভালো ও গভীরভাবে ঘুমোতে সাহায্য করে নগ্ন ঘুম। ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখে ও শরীরের অতিরিক্ত চর্বি পুড়িয়ে ফেলতে সাহায্য করে। ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, পর্যাপ্ত ঘুম না-হলে শরীরে ঘার্লিন হরমোনের প্রবাহ বেড়ে যায়, যা ক্ষুধা বাড়ায় ও ইনসুলিনের প্রবাহকে বৃদ্ধি করে। ফলে বহুমূত্র ও হৃদরোগ সৃষ্টি হতে পারে। গলা ও কোমরবন্ধ পোশাক শরীরের নিন্মাঙ্গে স্বাভাবিক রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এতে নানান রোগ সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। কিন্তু নগ্নভাবে ঘুমে শরীরের রক্ত চলাচলকে স্বাভাবিক থাকে। যা শরীরের পেশি ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অঙ্গকে সতেজ ও স্বাস্থ্যবান রাখতে সাহায্য করে। নগ্ন ঘুম দম্পতিদের সম্পর্কের মধ্যকার বাধা দূর করে। সম্পর্কে আরও নিবিড় করে তোলে। নগ্ন ঘুম সঙ্গীর প্রতি যৌন সম্পর্কের জন্য উন্মুক্ত আহ্বান। চাইলেও কোনো দম্পতি একে অন্যকে পাশ কাটিয়ে ঘুমোতে পারেন না। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে, নগ্ন ঘুম নিজের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। যৌনসঙ্গীর সামনে নগ্নতা সামাজিকভাবে অনুমোদিত– তবে সবক্ষেত্রে নয়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ কেউ কেবলমাত্র যৌনসংগমের সময়ই আলোতে বা অন্ধকারে নগ্নতাকে অনুমোদন করেন। এছাড়া সঙ্গীর সঙ্গে স্নানের সময় বা স্নানের পরে, চাদর বা কম্বলের আবরণের অন্তরালে, অথবা ঘুমোনোর সময় সঙ্গীর সামনে নগ্নতা অনুমোদিত।
