পুরাণে জানা যাচ্ছে, বিষ্ণুর চক্রে সতীর দেহ খণ্ড-বিখণ্ড হলে শোকার্ত শিব ক্ষোভ এবং লজ্জায় প্রস্তরময় লিঙ্গরূপ ধারণ করেন। কিন্তু তা নিছকই প্রতীক, পুরুষ চিহ্ন নয়। বামনপুরাণেই শিবলিঙ্গ নিয়ে অনেক কাহিনি আছে– এর মধ্যে একটি কাহিনি হল– সতীর দেহত্যাগের পর শিব কামদেবের বাণে কামাসক্ত হয়ে উলঙ্গ অবস্থায় দারুবনে যান এবং সেখানকার মহর্ষিদের কাছে অভিলাষিত ভিক্ষা প্রার্থনা করেন। এ সময় অরুন্ধতি ও অনসূয়া ছাড়া ঋষিপত্নীরা শিবকে দেখে কামার্ত হয়ে পড়েন। ক্রুদ্ধ মহর্ষিদের অভিশাপে শিবের লিঙ্গ খসে পড়ে এবং তা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ব্রহ্মা, বিষ্ণু প্রমুখ এসে শিবকে তার লিঙ্গ গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। এ লিঙ্গের পুজো করতে হবে– এই শর্তে রাজি হলেই শিব তা আবার ধারণ করেন।
পুরাণেই উল্লেখিত ভিন্ন একটি গল্প হল– কোনো বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য শিব সুন্দর পুরুষ সেজে বনমালা পরে উলঙ্গ অবস্থায় বালখিল্য ঋষিদের পাড়ায় আসেন ভিক্ষাছলে। তাকে দেখে কামার্ত ঋষিপত্নিরাও উলঙ্গ হতে চান এবং শিবকে নিয়ে টানাটানি করতে থাকেন। শিব জানান, পুরুষহীন কোনো নির্জন স্থানে গেলে তিনি এই উলঙ্গব্রতের কারণ বলবেন। এ সময় বালখিল্যরা এসে স্ত্রীদের পিটাতে থাকেন। এক পর্যায়ে এক ঋষিপত্নীর স্পর্শে খসে পরে শিবের লিঙ্গ এবং বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মা এবং অন্যদের স্তবে তুষ্ট হয়ে শিব জানান, এই লিঙ্গের পুজো করলে জগতের শান্তি হবে। সেই থেকে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে প্রচালিত আছে শিবলিঙ্গের পুজো।
ঋষি মার্কণ্ডেয় সম্পর্কে প্রচলিত জনপ্রিয় উপাখ্যানটির সঙ্গে শিবলিঙ্গের অনুসঙ্গ লক্ষ করা যায় : মৃক ঋষি ও তাঁর পত্নী মরুদবতী পুত্রকামনায় শিবের আরাধনা করেন। তাঁদের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে শিব তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত হন। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তাঁরা কেমন পুত্র চান –দীর্ঘজীবী মূর্খ পুত্র না ক্ষণজীবী জ্ঞানী পুত্র। মৃক ঋষি ক্ষণজীবী জ্ঞানী পুত্ৰই চান। জন্ম হয় মার্কণ্ডেয়ের। মার্কণ্ডেয়ের আয়ু ছিল মাত্র ষোলো বছরের। সে ছিল শিবের ভক্ত। ষোড়শ বছরে পদার্পণ করার পর যখন তার মৃত্যুকাল আসন্ন, তখন সে একটি শিবলিঙ্গ গড়ে পুজোয় বসে। যম তাকে নিয়ে যেতে এলে সে সেই শিবলিঙ্গ ছেড়ে যেতে অস্বীকার করে। যম তাঁর রজ্জু দিয়ে মার্কণ্ডেয়কে বন্ধন করলে, মার্কণ্ডেয় শিবলিঙ্গটিকে আঁকড়ে ধরে এবং শিবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকে। ভক্তবৎসল শিবভক্তের দুর্দশা দেখে শিবলিঙ্গ থেকে আবির্ভূত হন। ক্রুদ্ধ শিব আক্রমণ করেন যমকে। যম পরাভূত হন এবং মার্কণ্ডেয়ের উপর তাঁর দাবি ত্যাগ করে ফিরে যান। শিব যমকে পরাজিত করে মৃত্যুঞ্জয় নামে পরিচিত হন। শিবের বরে মার্কণ্ডেয় অমরত্ব লাভ করেন। মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র মার্কণ্ডেয়ের রচনা মনে করা হয়। তামিলনাড়ুর তিরুক্কদাভুর মন্দিরে শিবের যমবিজয়ের ধাতুচিত্র রয়েছে। নৃসিংহ পুরাণ গ্রন্থেও একই প্রকার একটি কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এই কাহিনি অনুযায়ী, মার্কণ্ডেয় কর্তৃক মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র পাঠের পর বিষ্ণু যমের হাত থেকে মার্কণ্ডেয়কে রক্ষা করেছিলেন।
সনাতন বা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য ৩৬টি পুরাণ রচিত হয়েছে। এর ১৮টি মহাপুরাণ এবং ১৮টি উপপুরাণ। মহাপুরাণগুলি হল যথাক্রমে– (১) মার্কণ্ডেয়, (২) মৎস্য, (৩) ভাগবত, (৪) ভবিষ্য, (৫) ব্রহ্মাণ্ড, (৬) ব্রহ্ম, (৭) ব্রহ্মবৈবর্ত, (৮) বায়ু, (৯) বামন, (১০) বরাহ, (১১) বিষ্ণু, (১২) অগ্নি, (১৩) নারদ, (১৪) পদ্ম, (১৫) লিঙ্গ এবং (১৬) গরুড়। অপরদিকে ১৮টি উপপুরাণ হল –(১) সনৎকুমার, (২নারসিংহ, (৩) শিব, (৪)শিবধর্ম, (৫)আশ্চর্য, (৬)নারদীয়, (৭)কাপিল, (৮) মানব, (৯) ঔশনস, (১০) আদিত্য, (১১) বারুণ, (১২) কালিকা, (১৩) মাহেশ্বর, (১৪) শাম্ব, (১৫) সেরি, (১৬) পরাশর, (১৭) ভাগবত এবং (১৮) বাশিষ্ঠ।
মহাপুরাণের পঞ্চদশ পুরাণটিই হল লিঙ্গপুরাণ। কীভাবে লিঙ্গপুরাণ শুরু হচ্ছে তা সূত ও নৈমিষারণ্যবাসী ঋষিগণের কথোপকথনের মাধ্যমে একবার বাংলা তর্জমায় দেখে নিই– ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও আদিরূপে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়কারী প্রকৃতিপুরুষের নিয়ামক পরমাত্মা শিবকে প্রণাম করি। নারায়ণ, নর, নরোত্তম, দেবী সরস্বতী এবং বেদব্যাসকে নমস্কারপূর্বক জয় অর্থাৎ অষ্টাদশ পুরাণাদি গ্রন্থ উচ্চারণ করবে শৈলেশ, সঙ্গমেশ্বর, স্বর্গস্থিত, হিরণ্যগর্ভ, বারাণসী, মহালয়, রৌদ্র, গোপেক্ষক, শ্রেষ্ঠ পাশুপত, বিঘ্নেশ্বর, কেদার, গোমায়ূকেশ্বর, হিরণ্যগর্ভ, চন্দ্রনাথ, ঈশান্য, ত্রিবিষ্টপ ও শুক্রেশ্বর প্রভৃতি তীর্থ স্থানে যথাবিধি শিবলিঙ্গ পুজো করে মহর্ষি নারদ নৈমিষারণ্যে গমন করলেন। (১-৩) তৎকালে নৈমিষারণ্যবাসী মুনিগণ নারদকে দেখামাত্র আনন্দিত মনে পুজো করে যথাযোগ্য। আসন প্রদান করলেন। তিনিও মুনিবরকর্তৃক পূজিত হয়ে হৃষ্টমনে তাঁদের প্রদত্ত উত্তমাসনে সুখে উপবেশন করে শিবলিঙ্গ মহাত্মা বিষয়কে মনোহর ভাবশালী উপাখ্যান বলতে লাগলেন। ইত্যবসরে সেখানে সর্বপুরাণবেত্তা বুদ্ধিমান সূত স্বয়ং মুনিগণকে প্রণাম করতে উপস্থিত হলে, নৈমিষারণ্যবাসী মুনিগণ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন শিষ্যের অভ্যর্থনার জন্য যথাযযাগ্য সবিনয় সম্ভাষণ ও পুজো বিধান করলেন। (৪-৭) এরপর তাঁদের পুরাণশ্রবণে ইচ্ছা হলে তপস্বী সমস্ত অতি বিশ্বস্ত বিদ্বান রোমহর্ষণ সূতকে শিবলিঙ্গ-মহাত্ম্যপূর্ণ পবিত্র পুরাণ-শাস্ত্র জিজ্ঞাসা করলেন। (৮-৯) হে মহামতে সূত! আপনি পুরাণের জন্য মহর্ষি বেদব্যাসকে উপাসনা করে তাঁর কাছে পুরাণশাস্ত্র অবগত হয়েছেন। হে পৌরাণিকাগ্রগণ্য! সেই জন্য লিঙ্গ-মাহাত্ম্যপূর্ণ স্বর্গীয় পুরাণসংহিতা আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি। ব্রহ্মার পুত্র শ্রীমান মুনিবর নারদ দেবাদিদেব পরমাত্মা মহেশ্বরের সমস্ত তীর্থস্থান পরিভ্রমণ করে লিঙ্গপুজো করে এই স্থানে উপস্থিত আছেন। আপনি, আমরা ও মহর্ষি নারদ সবাই-ই শিবভক্ত; অতএব আপনি মহর্ষি নারদের কাছে (?)। এমন আপনি যা জেনেছেন, তা সবই সফল হতে পারবে। পৌরাণিকাগ্রগণ্য পূণ্যাত্মা সূতকে এমন বললে, তিনি অর্থে ব্রহ্মার পুত্র নারদকে অনম্বর, নৈমিষবাসী মুনিগণকে অভিবাদন করে পুরাণ বলতে আরম্ভ করিলেন। (১০-১৬) আমি লিঙ্গপুরাণ বলার জন্য মহাদেবকে নমস্কার করে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মুনিবর বেদব্যাসকে স্মরণ করছি। শব্দ-ব্ৰহ্ম যার শরীর, যিনি সাক্ষাৎ শব্দ-ব্রহ্মের প্রকাশক, বর্ণমালা যাহার অঙ্গ, তিনি অনেক রূপে স্থিতি করলেও অব্যক্ত স্বরূপ, যিনি অকাব, উকাব ও মকাব স্বরূপ এবং যিনি সূক্ষ্ম, স্থূল, পরাৎপর, ওঙ্কারস্বরূপ, ঋগ যার মুখ, সামগান যার জিহ্বা, যজুৰ্বেদ যার সুদীর্ঘ গ্রীবাদেশ, অথৰ্ব্ববেদ যার হৃদয়, যিনি প্রকৃতিপুরুষের অতীত, জন্ম-মৃত্যুবর্জিত হইলেও তমোগুণযোগে কাল, রুদ্র, রজোগুণযোগে ব্ৰহ্ম, সত্ত্বগুণযোগে সর্বময় বিষ্ণু নামে বিখ্যাত, যিনি নির্গুণ অবস্থায় পরম ব্রহ্ম মহেশ্বর, যিনি প্রকৃতি, পুরুষ, (?), অহংকার, মন, দর্শেন্দ্রিয়, পঞ্চতন্মাত্র ও পঞ্চভূতরূপে বিরাজমান হলেও স্বয়ং এদের অতীত ষড়বিংশ স্বরূপ, সেই মায়ার কারণ সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়-লীলার জন্য লিঙ্গরূপধারী সর্বময় মহেশ্বরকে প্রণাম করে মঙ্গলময় লিঙ্গপুরাণ বলতে আরম্ভ করছি। (১৭-২৩)।
