মার্কিন ধর্মীয় ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ওয়েনডি ডনিগারের মতে– “For Hindus, the phallus in the background, the archetype (if I may use the word in its Eliadean, indeed Bastianian, and non-Jungian sense) of which their own penises are manifestations, is the phallus (called the lingam) of the god Siva, who inherits much of the mythology of Indra (O’Flaherty, 1973). The lingam appeared, separate from the body of Siva, on several occasions… On each of these occasions, Sivas wrath was appeased when gods and humans promised to worship his lingam forever after, which, in India they still do. Hindus, for instance, will argue that the lingam has nothing whatsoever to do with the male sexual organ, an assertion blatantly contradicted by the material.” যদিও অধ্যাপক ডনিগার পরবর্তীকালে তাঁর “The Hindus : An Alternative History” বইতে তাঁর বক্তব্য পরিষ্কার করে লিখেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো কোনো ধর্মশাস্ত্রে শিবলিঙ্গকে ঈশ্বরের বিমূর্ত প্রতীক বা দিব্য আলোকস্তম্ভ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এইসব বইতে লিঙ্গের কোনো যৌন অনুষঙ্গ নেই। হেলেন ব্রুনারের মতে, লিঙ্গের সামনে যে রেখাঁটি আঁকা হয়, তা পুরুষাঙ্গের গ্ল্যান্স অংশের একটি শৈল্পিক অনুকল্প। এই রেখাঁটি আঁকার পদ্ধতি মধ্যযুগে লেখা মন্দির প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত অনুশাসন এবং আধুনিক ধর্মগ্রন্থেও পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠা-পদ্ধতির কিছু কিছু প্রথার সঙ্গে যৌন মিলনের অনুষঙ্গ লক্ষ করা যায়।
আগামা ধর্মসূত্রের তৃতীয় অধ্যয়ের ১৬-১৭ নং শ্লোকে বলা হয়েছে Lin অর্থ বিলীন হওয়া এবং ga অর্থ উৎপন্ন হওয়া। অর্থাৎ যে মঙ্গলময় সৃষ্টিকর্তা (শিব) থেকে সবকিছু উৎপন্ন হয় এবং প্রলয়কালে সবকিছু যাতে বিলীন হয় তারই প্রতীক এই শিবলিঙ্গ। স্বামী বিবেকানন্দ ১৯০০ সালে প্যরিসে হয়ে যাওয়া ধর্মসমূহের ঐতিহাসিক মূল শীর্ষক সম্মেলনে বিশ্ববাসীর সামনে অথর্ববেদের স্কন্তসুক্তের সাহায্যে তুলে ধরেন যে শিবলিঙ্গ মূলত বিশ্বব্রহ্মান্ডেরই প্রতীক। স্বামী শিবানন্দ বলেন– “এটি শুধু ভুলই নয়, বরং অন্ধ অভিযোগও বটে যে শিবলিঙ্গ পুরুষলিঙ্গের প্রতিনিধিত্বকারী।” তিনি লিঙ্গপুরাণের নিম্নলিখিত শ্লোকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন– “প্রধানাম প্রকৃতির যদাধুর লিঙ্গমুত্তমম গান্ধবর্নরসাহৃনম শব্দ স্পর্শাদি বর্জিতম।”
শিবপুরাণ, মার্কণ্ডেয়পুরাণ ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, একদা দুর্গার সঙ্গে যৌনমিলনকালে শিব এত বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন যে, তাতে দুর্গার প্রাণনাশের উপক্রম হয়। দুর্গা মনে মনে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করতে থাকেন, এমন সময় শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হয়ে নিজ সুদর্শন চক্র দ্বারা আঘাত করল উভয়ের সংযুক্ত যৌনাঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়। ওই সংযুক্ত যৌনাঙ্গের মিলিত সংস্করণের নাম বাণলিঙ্গ বা শিবলিঙ্গ, যা হিন্দুসমাজের একটি প্রধান পূজ্য বস্তু এবং ওই শিবলিঙ্গের পুজোর জন্য বহু বড়ো বড়ো শিবমন্দির গড়ে উঠেছে। মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়ে কাসর ঘণ্টা বাজিয়ে হিন্দুসমাজ মহাসমারোহে ওই শিবলিঙ্গ পুজো করে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণশ্বরে শিবের সঙ্গমের অবস্থান প্রদর্শনের জন্য পরপর বারোটি মন্দির রয়েছে। ওই মন্দিরগুলিতে যৌনমিলনকালীন সময়ের বারো প্রকারের প্রমত্তাবস্থা প্রদর্শন করা হয়েছে। এতে প্রতিদিন হাজার হাজার মহিলা দর্শনার্থীর সমাগম হয়।
এক শাস্ত্রীয় কাহিনিতে পাচ্ছি, দেবতারা সব একত্রে মিলিত হয়েছেন, উদ্দেশ্য রাসমেলার পরিদর্শন। কৈলাস থেকে আগত মহাদেব রাসমেলার পরিদর্শনে ইচ্ছা প্রকাশ করলে শ্রীকৃষ্ণ কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যেহেতু সর্বাধিক বুদ্ধিমান শ্রীকৃষ্ণ সকল বিষয়েই অবগত। নিরাশ না-হয়ে মহাদেব ছদ্মবেশ ধারণ করে রাসমেলার উদ্দ্যেশে রওনা দিলে নৃত্যরত স্বল্পবসনা এক সুন্দরীকে দেখতে পান। সুন্দরী দেখে মহাদেবের পুরুষদণ্ড বিকটাকার ধারণ করল। চতুঃপার্শ্বে ত্রাহি রব– হায়! এ যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস হবার শঙ্কা! অবশেষে শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে দেবদেবীদের সম্মিলিত প্রার্থনায় মহামায়া প্রকট হলেন। মহামায়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ড-জোড়া মহাযোনি সৃষ্টি করলেন। মহাদেবের নিয়ন্ত্রণহীন বিকটাকার পুরুষদণ্ডকে ধারণ করে নিবৃত্ত করলেন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডও অহেতুক বিনাশ থেকে রক্ষা পেল। সেই থেকে প্রচলন হল যোনিতে প্রোথিত মহাদেবের লিঙ্গপুজো। উল্লেখ্য যে, শিবরাত্রির বিশেষ ক্ষণে শিবলিঙ্গকে স্নান করানো পূর্বক অবিবাহিত তনয়ারা উত্তম পুরুষাঙ্গ-ধারী বীর্যবান স্বামী প্রাপ্তির আশীর্বাদ লাভ করেন।”
‘লিঙ্গ’ শব্দটি কোল বা অস্ট্রিক ভাষার। ঋগ্বেদে ‘লিঙ্গ’-এর প্রতিশব্দ ‘শিশ্ন’। ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলের একুশ সুক্ত থেকে জানা যায়– এক শ্রেণির মানুষ শিশ্নোপাসনা করতেন। এরা অভিহিত শিশ্নদেবাঃ নামে। বলা হয়েছে, এই সম্প্রদায়গণ বেদ বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন। তাই তাদের অনার্য রাক্ষসদের সমপর্যায়ের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেছেন বৈদিক ঋষিরা। অনেকের মতে, লিঙ্গপুজো প্রচলিত ছিল মহেনজোদারো এবং হরপ্পায়। শিব অনার্য দেবতা, লিঙ্গ বা শিশ্নও। তাই লিঙ্গ বা শিশ্নই যে শিবলিঙ্গটা, তা সবার কাছে গৃহীত। সেকালের ঋষিরাও শিবলিঙ্গের পুজোর নিন্দা করেছেন। কিন্তু পরে বৈদিক আর্যদের বংশধররা এ পুজোকে মেনে নিয়েছিলেন। এ হচ্ছে আর্যসমাজে অনার্যসমাজের প্রভাবের প্রতিফলন। যুগের ক্রমধারায় এই শিব তো বটেই– শিবলিঙ্গ ও প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী দেবতা হিসাবে অভিষিক্ত হন। শিবলিঙ্গ দুই ধরনের। প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম। মতান্তরে চল আর অচল। মন্দিরে স্থাপিত লিঙ্গ ‘অচল’ আর যেগুলো স্থানন্তরিত হয় সেগুলোকে বলা হয় ‘চল’।
