হিন্দুদের ক্ষেত্রে ফাইমোসিসের কারণেও লিঙ্গের অগ্ৰত্বক ছেদন করতে হয় কখনো-কখনো। ফাইমোসিস (Phimosis) : পুরুষাঙ্গের সম্মুখে ঝুলতে থাকা বাড়তি চামড়াটুকু (Prepuceal skin) অনেক সময় লিঙ্গের শীর্ষদেশের (Glans penis) সঙ্গে আটকে গিয়ে যে সমস্যা করে তার নামই ফাইমোসিস। বিশেষ করে ছোট্ট ছেলেদের বাবা-মা অনেক সময়ই এই নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় ভোগেন। প্রচলিত ভাষায় একে বলা হয় লিঙ্গ না ফোঁটা। মনে রাখতে হবে শিশুর ৬ বছর বয়স পর্যন্ত পুরুষাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্কদের মতো না-ও ফুটে উঠতে পারে। তাই এ নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই, তবে প্রস্রাব করার সময় যদি ওই বাড়তি চামড়া সহ লিঙ্গের শীর্ষ ফুলে উঠে বা চামড়া ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয় কিংবা শিশুর মূত্রত্যাগে কষ্ট হয়। তবে ধরে নিতে হবে সেটা স্বাভাবিক নয়। বড়োদের ও ফাইমোসিস হয়ে থাকে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ব্যালানাইটিস (Balanitis) রোগের কারণে হয়ে থাকে। বড়োদের এমনটি হলে লিঙ্গ নিয়মিত পরিষ্কার করা সম্ভব হয়না এবং তা থেকে অনেক সময় পুরুষাঙ্গের ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদের যৌনজীবনও বরবাদ হয়ে যেতে পারে। ছোটো অথবা বড়ো যারই ফাইমোসিস হোক-না-কেন, এর একমাত্র চিকিৎসা হল পুরুষাঙ্গের বাড়তি চামড়াটুকু ফেলে দেওয়া। আন্তর্জাতিক এইডস সম্মেলনে ফরাসি গবেষক কেভিন জাঁ বলেন, “(খতনা করার ফলে এইডসের ঝুঁকি হ্রাসের মাত্রা বেশ কম মনে হলেও শুরু হিসাবে এটা কিন্তু কম নয়।” বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস বা (এইচআইভি)-র সংক্রমণ কমানোর লক্ষ্যে পুরুষদের খতনাকে উৎসাহিত করে আসছে। ইসলাম এবং ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এমনিতেই খতনার চল রয়েছে। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মাঝেও পুরুষদের খতনার হার বাড়ছে। এইডস সম্মেলনে প্রকাশ করা নিবন্ধ অনুযায়ী খতনা করলে পুরুষের এইচআইভি সংক্রমণের আশঙ্কা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ কমে। অন্যদিকে নারীর কমে শতকরা ১৫ ভাগ।
কয়েক মাস আগে জার্মানে একটি চার বছরের ছেলের খতনা করানো নিয়ে এই বিতর্কের শুরু। খতনার সময় চিকিৎসকের ভুলে ওই বাচ্চার পুরুষাঙ্গ থেকে অতিরিক্ত রক্তপাত হলে, তা কোলন শহরের আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আর আদালত রায় দেয়, বাচ্চার ধর্মীয় অধিকার রয়েছে, কিন্তু সেটা তার নিজের শরীরের অধিকারের চেয়ে বেশি নয়। অর্থাৎ বাবা-মার ইচ্ছায় এখন থেকে খতনা করা বন্ধ। আর যদি করাতেই হয়, তাহলে ছেলে বড়ো হলে তার মতামত নিয়ে সেটা করতে হবে। তারপর থেকে এই নিয়ে বিতর্ক চলছে, থামছে না। কারণ কেবল মুসলমান নয়, ইহুদিদের ধর্মীয় আচারের একটি অংশ হচ্ছে এই খতনা। এই রায় নিয়ে পরবর্তীতে শুরু হয় বিতর্ক। কেন-না জার্মানে প্রায় চল্লিশ লক্ষ মুসলমানের বাস। এ ছাড়া রয়েছে প্রায় এক লক্ষ কুড়ি হাজার নিবন্ধনকৃত ইহুদি। মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদিদের মধ্যেও খতনা বিষয়টি প্রচলিত।
এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন ধর্মীয় নেতা, রাজনীতিক এমনিক গবেষকরা পর্যন্ত। কেউ আদালতের রায়কে বাচ্চার অধিকারের সংরক্ষণ হিসাবে দেখছেন, অনেকে আবার এটিকে ধর্মে আদালতের অহেতুক হস্তক্ষেপ হিসাবে মূল্যায়ন করছেন। এই যেমন ইহুদি নেতা পিনশাস গোল্ডস্মিথ। ইউরোপের রাব্বিদের এই নেতা কোলনের আদালতের রায়ের তীব্র সমালোচনা করে বললেন, “যদি এই রায়কে সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করে এবং এটিকে আইন হিসাবে গ্রহণ করা হয় তাহলে তার অর্থ হচ্ছে জার্মান সমাজের একটি বড় অংশের কোনো ভবিষ্যত এই দেশে নেই” জার্মানির ধর্মনিরপেক্ষ সমাজে রাষ্ট্রীয় কোনো কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় প্রভাব গ্রহণ করা হয় না। অন্যদিকে ব্যক্তিগত আচার-অনুষ্ঠানেও রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। তাই খতনার মতো ধর্মীয় আচারকে কেবল ধর্মীয় বিষয় নয়, বাচ্চার শারীরিক অধিকার হিসাবেও অনেকে দেখতে চান। যেমন জার্মান সংসদের নিম্নকক্ষ বুন্ডেসটাগে সবুজ দলের নেত্রী রেনাটে কুনাস্ট বললেন, “আমি চাই জার্মানিতে ইহুদি ও মুসলমানরা যাতে তাদের ধর্মকানুন মেনে চলতে পারে। আবার অন্যদিকে নিজের শরীরের উপর শিশুর যে অধিকার আছে, সেটার প্রতিও আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। এটা কোনো সহজ বিষয় নয়। এবং এই নিয়ে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও যাবে না।”
তবে আর-এক রাজনীতিক ফোল্কা বেক কিন্তু ভিন্নমত জানালেন। ধর্মীয় সব বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে মত জানিয়ে তাঁর বক্তব্য, “একটি উদার সমাজে রাষ্ট্র কখনো ধর্মীয় সংস্কারের দায়িত্ব তুলে নিতে পারে না, বরং ধর্মীয় সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য এমন একটি উপায় খুঁজে বের করতে পারে।”
কোলনের আদালতের এই রায় নিয়ে গত জুলাই মাসে জার্মানের সংসদ সদস্যরা একটি খসড়া প্রস্তাব সংসদে তোলেন। এতে খতনার ধর্মীয় অধিকার বহাল রাখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। তবে অনেকেই আছেন যারা আদালতের রায়কে শ্রদ্ধা করছেন এবং তা মেনে নিয়েছেন। তাদের একজন মেহমেত কিলিশ। জার্মান সংসদের এই মুসলিম সদস্য আদালতের রায় অনুসারে ছেলের খতনা করানো থেকে বিরত থাকছেন। তাঁর কথায়, “এই রায় এলে হয়তো এই গ্রীষ্মেই আমি আমার ১ এবং ৮ বছরের দুই ছেলের খতনা করিয়ে ফেলতাম। এই রায়ের পর আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। এবং এরপর আমরা খতনা না-করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটা আমরা আমাদের সন্তানের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দিয়েছি। আমরা মনে করি, এটা বাচ্চাদের মতামত নিয়ে করাই ভালো হবে।”
