শুধু পুরুষদেরই খতনা করা হয়, তা কিন্তু নয়। কোথাও কোথাও মেয়েদেরও খতনা করা হয়। মেয়েরা যেন যৌনসুখ উপভোগ করতে না পারে বা সতীত্ব রক্ষার নামে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নারীদের যৌনাঙ্গচ্ছেদ বা এফজিএম করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক হিসেব অনুযায়ী, ওই দুই মহাদেশের ২৯টি দেশের প্রায় ১২০ থেকে ১৪০ মিলিয়ন নারী অমানবিক এই ঘটনার শিকার হয়েছেন। ইউনিসেফের মতে, মেয়েদের যৌনাঙ্গচ্ছেদের কারণে তাঁদের শরীরে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি নানান সমস্যা দেখা দেয়। বিশ্বে কমপক্ষে ১৫ কোটি নারী খতনা প্রথার মতো বর্বরতার শিকার। সুপার মডেল ওয়ারিস দিরির মতে, আফ্রিকায় এখনও কুমারী মেয়েদের খতনা দেওয়া হয়। নারীর জৈবিক চাহিদা কমাতে এ প্রথা চালু হয়েছিল। এ ধারাটি শুধু আফ্রিকাতে নয়, ইউরোপ ও আমেরিকার মতো সভ্য সমাজেও প্রচলিত। সুদানের বিতর্কিত লেখিকা কোলা বুফ তার আত্মজীবনীমূলক বই ‘Diary of a Lost Girl’-এ খতনা প্রথার বীভৎসতার চিত্র তুলে ধরেছেন। নারীবাদী এই লেখিকার বিভিন্ন বিষয়ের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যে কারও দ্বিমত থাকতে পারে। কিন্তু খতনা প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভের প্রতি মনুষ্য চেতনাসম্পন্ন যে কেউ সহানুভূতিশীল হতে বাধ্য। সুদানের এই জনপ্রিয় লেখিকাকেও তাঁর কিশোরী বয়সে খতনা প্রথার শিকার হতে হয়েছিল। আফ্রিকা ও আরব দেশগুলোর নারীরাই খতনা প্রথা শিকার।
ধর্মীয় প্রথা শুধু নয়, আধুনিক বিজ্ঞানও পুরুষদের খতনার পক্ষে। কারণ কারোর মতে এটি স্বাস্থ্যসম্মত। যে কারণে ধর্মীয় দিক থেকে যাঁরা খতনা প্রথায় অভ্যস্ত নন, তারাও অনেক সময় স্বাস্থ্যগত কারণে খতনা করান। পুরুষদের খতনা চালুর পিছনে ঐশী নির্দেশের কথা বলা হলেও মেয়েদের খতনা কীভাবে চালু হল তার কোনো প্রামাণিক দলিল নেই। তওরাত, জবুর, ইঞ্জিল, কোরান অর্থাৎ সেমেটিক ধর্মাবলম্বীদের কাছে ধর্মগ্রন্থগুলোতে এ সম্পর্কিত কোনো নির্দেশনা নেই। পুরুষের খতনাকে আধুনিক বিজ্ঞানও স্বাস্থ্যসম্মত মনে করে। নারীর খতনা ঠিক এর বিপরীত। ইসলামে মেয়েদের খতনার নির্দেশনা না থাকলেও ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত আরব সমাজে এ কুপ্রথা ব্যাপকভাবে চালু ছিল। সেন্ট জন ফিলবির লেখা ‘Empty Quarter’ বইয়ে আরব মেয়েদের খতনা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়। এর মাধ্যমে বহির্বিশ্বের মানুষ জানতে পারে এ কুপ্রথা সম্পর্কে। সেন্ট জন ফিলবি ১৯৩০ সালে দীর্ঘদিন অবস্থান করার ফলে তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকজনের সঙ্গে মেশার সুযোগ পান। সৌদি আরবে সউদ পরিবার ক্ষমতায় আসার পর মেয়েদের খতনা নিষিদ্ধ করে। তারপরও বিভিন্ন আরব গোত্রে এ প্রথা দীর্ঘদিন চালু ছিল। এমনকি বেদুইনদের কোনো কোনো গোত্রের মধ্যে এখনও মেয়েদের খতনা চালু রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। “Empty Quarter’ বইয়ে সেন্ট জন ফিলবি সৌদি আরবের মুনাসির বেদুইন গোত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। এ গোত্রের মেয়েরা বিয়ের উপযুক্ত হলে তাদের খতনা করানো হয়। বিয়ের এক বা দুই মাস আগে আয়োজন করা হত তাদের খতনার অনুষ্ঠান। কাহতান, মুররা, বনি হাজির, আজমান ইত্যাদি গোত্রের মেয়েদের খতনা করানো হত জন্মের পরপরই। তাঁবুর মধ্যে খতনা সম্পন্ন করা হত। বিশেষজ্ঞ মহিলা হাজামরা ক্ষুর, কাঁচি এবং সুচ সুতোর সাহায্যে খতনা করত।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান সহ উপমহাদেশের কোথাও মেয়েদের খতনা প্রথা চালু নেই। এসব দেশে অপরিচিত হলেও দুনিয়ার বহু দেশে বিশেষত আফ্রিকা ও আরব দেশগুলোতে মেয়েদের খতনা প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এ প্রথাটি ইতোমধ্যে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও নারী অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য একটি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন মেয়েদের সেই খতনা? জানা থাকলে ভালো, না-জানলে জেনে নিন। আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চল এবং কোনো কোনো আরব দেশে মেয়েদের যে খতনা প্রথা চালু আছে তাতে ভগাঙ্কুরের বর্ধিত অংশটুকু কেটে ফেলা হয়। পুরুষ ও নারীর খতনার মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। পুরুষদের পুরুষাঙ্গের ত্বকের যে অংশটি কেটে ফেলা হয় তা তেমন স্পর্শকাতর নয়। বরং এটি অনেক সময় স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হয়েও দেখা দেয়। মেয়েদের ভগাঙ্কুর শরীরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্থান নারী তাঁর চরম যৌনানন্দ লাভ করে এই অঙ্গের মধ্য দিয়েই। এটি কেটে ফেললে নারীর যৌনানন্দ চিরকালের মতো শেষ, শুধু সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়ে যাবে। ভগাঙ্কুর কেটে ফেললে রক্ত বন্ধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তীব্র যন্ত্রণাদায়ক তো বটেই। বিশ্বে প্রতি বছর কোটি কোটি পুরুষের খতনা হলেও জীবনহানির ঘটনা প্রায় শূন্য। ভোগান্তির পরিমাণও একেবারে কম। পক্ষান্তরে মেয়েদের খতনার জন্য জীবনহানির ঘটনা অহরহ ঘটছে। ভগাঙ্কুরে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে দীর্ঘস্থায়ী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকারও হয় হাজার হাজার নারী, নারীশিশু। স্পষ্টভাবে বলা যায়, মেয়েদের খতনা একটি বর্বর প্রথা। নারীবাদিরা কি ঘুমিয়ে আছেন? বন্ধ করুন নারীখতনা!
কুসংস্কারের বশে খতনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন সব পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়। তা একদিকে যেমন যন্ত্রণাদায়ক, অন্যদিকে স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিও বটে। গত শতাব্দীর শেষ দিকে আফ্রিকার সিয়েরা লিয়নে এমন ধরনের এক গণখতনার ঘটনা ঘটে। ঘটা করে একটা গোত্রের সব কুমারী মেয়ের ভগাঙ্কুরের অংশবিশেষ কেটে ফেলা হয়। যার সংখ্যা ছিল ৬০০। খতনায় যৌনাঙ্গে ক্ষত সৃষ্টি হওয়ায় তাদের অন্তত ১০ জনের জীবন হুমকির সম্মুখীন হয়। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এ প্রথার বিরুদ্ধে শত নিন্দা জানালেও অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। ভাবুন, সিয়েরা লিয়নে মেয়েদের খতনা রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ। আবার কৃষ্ণ আফ্রিকা অর্থাৎ এ মহাদেশের যে অংশটি মাত্র দু-এক শতাব্দী আগেও সভ্য বিশ্ব থেকে দূরে ছিল তাদের মধ্যে এ কুসংস্কার টিকে থাকার বিষয়টি হয়তো ক্ষমা করা যায়। কিন্তু যে দেশটি বিশ্ব সভ্যতার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত আফ্রিকার সেই মিশরেও মেয়েদের খতনা বর্বরতার যুগকে এখনও লালন করে আসছে। যদিও মিশরে আইনগতভাবে এ প্রথা নিষিদ্ধ। এটিকে নিরুৎসাহিত করতে প্রচার-প্রচারণারও অভাব নেই। তা সত্ত্বেও মিশরীয় সমাজে প্রতিবছর হাজার হাজার মেয়েকে খতনা দেওয়া হয়। মেয়েদের খতনার জন্য পুরুষশাসিত সমাজের কুৎসিত ধারণাই সম্ভবত বেশি দায়ী। মনে করা হয়, খতনা দেওয়া হলে মেয়েদের স্পর্শকাতরতা হ্রাস পাবে। এক্ষেত্রে পুরুষদের আধিপত্য বজায় থাকবে। অন্ততপক্ষে যৌনতার কারণে কোনো পুরুষের সঙ্গে যৌনমিলন ঘটাবে না। ফলে একটা যৌনবিশুদ্ধ নারী কোনো এক পুরুষের মালিকানাধীন থাকবে। এই মানসিকতার জন্যই যুগ যুগ ধরে কুপ্রথাটি টিকে আছে। যদিও ফ্রান্সে মেয়েদের খতনা মারাত্মক অপরাধ হিসাবে বিবেচিত। এ জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু তারপরও সে দেশের সরকার আফ্রিকীয় প্রবাসীদের খতনা প্রথা নিরুৎসাহিত করতে পারেনি।
