কৃত্রিম হিজড়ে বা খোঁজাকরণ হিজড়ে : খোঁজাকরণ বা লিঙ্গ কর্তনের মতো ভয়ংকর আইন-বিরুদ্ধ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড হিজড়ে সম্প্রদায়ের সঙ্গী। অনেকেই হিজড়ে কমিউনিটিতে যোগদানকালে নিজের শিশ্ন স্বেচ্ছায় কর্তন করে। কেউ করতে না-চাইলে তাকে জোর করা হয়। এছাড়া সুশ্রী দেখতে বালকদের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে এনে এদের শিশ্ন ও অণ্ডকোশ কেটে এদের খোঁজা করে দেওয়ার অভিযোগ আছে। এরপর হিজড়ে বানিয়ে যৌন-ব্যবসায় নামানো হয়। লিঙ্গ অপসারণ ব্যয়বহুল ও অনৈতিক হওয়ার কারণে হাতুড়ে ডাক্তারের সাহায্যে এই কর্তনকর্ম সম্পন্ন করে লিঙ্গ-কবন্ধ হয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর রক্তপাতও ঘটে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে মারা যায় সবার অলক্ষ্যেই।
বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন খতনা হল ইসলাম ধর্মসম্প্রদায়ের মুসলমানি একটি অনুষ্ঠান। কিন্তু এই অনুষ্ঠান শুধু মুসলিম ধর্মেই নয়, অন্য বেশকিছু প্রধান ধর্মেও করা হয়। সিমেটিক ধর্মসম্প্রদায়গুলির মধ্যে এই প্রথা বিদ্যমান। যেসব সম্প্রদায়ের মানুষরা মনে করেন শুধুমাত্র মুসলমানদেরই লিঙ্গ কাটা বা লিঙ্গের অগ্ৰত্বক কাটা, তাদের বলি শুধু মুসলমান নয়, সমগ্র খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে এটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তবে গুলিয়ে ফেলবেন না, এই লিঙ্গকর্তন কিন্তু খোঁজাকরণ নয় –এটা হল লিঙ্গের অগ্ৰত্বক ছেদন। লিঙ্গের অগ্ৰত্বক কর্তন করে বা সার্জারির মাধ্যমে অপসারণ করাকে খতনা বলা হয়। নানা কারণে ভিতর ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই খতনা করা হয়ে থাকে। আর-একটু গুছিয়ে বললে যা দাঁড়ায় তা হল, পুরুষদের খতনা বলতে পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের ত্বক লিঙ্গমুণ্ড পর্যন্ত কেটে ফেলাকে বোঝায়। এর ফলে লিঙ্গমুণ্ড আজীবন অনাবৃত হয়ে পড়ে। মনে করা হয়, বিশ্বাসীদের আদি পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আমলে খতনা প্রথার শুরু। মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টীয় ধর্মবিশ্বাস মতে, আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-কে খতনা করার নির্দেশ দেন। ওই সময় তার বয়স ছিল ৯৯ বছর। এ বয়সে তিনি ঐশী নির্দেশে নিজের খতনা দেন। প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে খতনা দেওয়া হয় ১৩ বছর বয়সে। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর উত্তর পুরুষ হজরত মুসা (আ.)-এর অনুসারী ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যেও খতনা প্রথার প্রচলন ছিল। হজরত ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন ইহুদি পরিবারে। জন্মের আট দিন পর তারও খতনা করা হয়। এটি একটি ধর্মীয় প্রয়োজনীয়তা হিসাবে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মধ্যে স্বীকৃত বিষয়। অনেক পুরুষের ধারণা খতনা করা হলে লিঙ্গের স্পর্শকাতরতা বেড়ে যায়। এতে করে যৌনমিলনে অধিক আনন্দ লাভ সম্ভব হতে পারে, তবে মাস্টার এবং জনসন মনে করেন খতনা পুরুষের জন্য অধিক যৌন আনন্দ নিশ্চিত করে এই ধারণাটি ভুল। খতনা করা না-হলেও যৌনমিলনে পুরুষ যথেষ্টই অংশ নিতে পারে এবং যৌন আনন্দ লাভ করে। তবে খতনার প্রধান সুবিধাটা হচ্ছে এর ফলে লিঙ্গের অগ্ৰত্বকে যে অবাঞ্ছিত দুর্গন্ধযুক্ত তরল জমে নোংরা অবস্থার সৃষ্টি করে তা থেকে লিঙ্গ রেহাই পেতে পারে। এই অবাঞ্ছিত দুর্গন্ধযুক্ত তরল জমাট বেঁধে লেগমার তৈরি করে। নানা রকম ইনফেকশন হতে পারে। যৌনজীবন বিব্রতকর হতে পারে। ডাক্তারি মতে খতনার ফলে পুরুষের লিঙ্গ পরিচ্ছন্ন থাকে বেশি। যাঁরা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন তাঁদের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই, খতনারও প্রয়োজন হয় না। তবে বর্তমান যুগে যেহেতু ওরাল সেক্স বা শকিং করার প্রবণতা বেড়েছে, সেই কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই যুবক-যুবতীদের মধ্যে যৌনাঙ্গের স্বাস্থ্য ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার প্রবণতা বেড়েছে।
সেকালে খতনা করা হত হাতুড়ে দিয়ে। সময় বদলেছে। হাইজেনিকের প্রশ্নে আর কোনো আপস নয়। শিক্ষিত, অভিজ্ঞ এবং পেশাদার শল্য চিকিৎসকদের দিয়ে খতনা করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রয়োজন হলেই হবে না, খরচ অনেক। ১০-১৫ হাজারের নীচে নয়। গরিবদের পক্ষে এই খরচ করে মুসলমানি অনুষ্ঠান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এই অসুবিধা দূর করার জন্য বহু জায়গায় ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কেউ হাজার হাজার টাকা খরচ করে মুসলমানির অনুষ্ঠান করে, আর কেউ বয়স পেরিয়ে গেলেও টাকার জন্যে খতনা করাতে পারে না। অতএব এইসব ফাউন্ডেশনগুলি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খতনা করিয়ে থাকে। খতনার পর প্রত্যেককে ১টি করে লুঙ্গি, গামছা এবং ক্ষত শুকানোর জন্যে ফুল কোর্স অ্যান্টিবায়োটিক, পেইনকিলার ও ভিটামিন-সি ট্যাবলেট দেওয়া হয়।
মূলত খতনা প্রথার উদ্ভব হয় ইহুদি সমাজে। ইহুদিরা এটিকে অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসাবেই মনে করে। খ্রিস্টীয় বিধানে বাধ্যবাধকতা তেমন না থাকলেও এ ধর্মের সূতিকাগার প্যালেস্টাইন ও আরব খ্রিস্টানদের মধ্যে খতনা প্রথার প্রচলন আছে। মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে খতনাকে অবশ্য কর্তব্য বলে ধরা হয়। সাধারণের ভাষায় যা ‘মুসলমানি’ হিসাবে পরিচিত। অনেকেরই ধারণা খতনা না-দিলে মুসলমানিত্ব প্রাপ্ত হয় না। খতনার সঙ্গে মুসলমানিত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে অবশ্য পালনীয় কর্তব্যগুলোকে ‘ফরজ’ বলে অভিহিত করা হয়। সে অর্থে খতনা ‘ফরজ’ নয়। অর্থাৎ এটি পালন না-করলে ধর্মচ্যুতি বা গুণাহর কোনো আশঙ্কা নেই। খতনা মুসলমানদের জন্য একটি অনুসরণীয় স্বাস্থ্যবিধি। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, মহানবি হজরত মোহাম্মদ নিজে খতনা করেছেন। অন্যদেরও খতনা করতে উৎসাহিত করেছেন। যে কারণে মুসলিম সমাজে পুরুষদের ত্বকচ্ছেদকে সুন্নতে খতনা হিসাবে অভিহিত করা হয়। মহানবি যেসব অনুশাসন বা নিয়ম পালন করতেন সেগুলোকেই বলা হয়। সুন্নত। ইসলামের দৃষ্টিতে সুন্নত পালন করা উত্তম। এর মাধ্যমে মহানবির জীবনাদর্শকে অনুসরণ করা হয়। সে হিসাবে এটি একটি পুণ্যের কাজ।
