ভারতীয় দর্শনের ছয়টি আদি মতবাদ ছাড়াও চার্বাকের অবিমিশ্র নিরীশ্বরবাদ, আচার্য রামানুজের দ্বৈতবাদ, আচার্য শংকরের সর্বেশ্বরবাদ, রাজা রামমোহন রায়ের একেশ্বরবাদ এবং বহুদেবত্ববাদও হিন্দুধর্মের অন্তর্ভুক্ত। এভাবে হিন্দুধর্ম হল কতকগুলো পরস্পরবিরোধী ধর্মীয় মতবাদ ও দর্শনের সমষ্টি। হিন্দুবাদ হচ্ছে কঠোর বর্ণাশ্রমভিত্তিক একটি সমাজব্যবস্থা, যাতে মানুষের মর্যাদা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সুবিচারের কোনো স্বীকৃতি নেই। যেখানে শুধু ব্রাহ্মণ্যবাদীরাই থাকবে। অন্য কেউ নয়। হিন্দুবাদের প্রাচীন ভাবধারার প্রভাব এখনও সুদূরপ্রসারী। সমাজের বহিরঙ্গে দৃশ্যমান হিন্দুদের তথাকথিত উদারনৈতিকতা তাঁদের সমাজের সত্যিকার পরিচয় নয়। এই উদারনৈতিকতার অন্তরালে লুকিয়ে আছে আর্যসমাজের সত্যিকার রূপ। অর্থাৎ যোগফল মনুসংহিতা মানেই ব্রাহ্মণ্যবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদ মানেই মনুসংহিতা, মনুসংহিতা মানে হিন্দুবাদ।
লিঙ্গপুরাণ
লিঙ্গ (সংস্কৃতে লিঙ্গ্ + অ, অথবা শিশ্ন = শশ্ + ন) বলতে প্রথমেই যে ছবিটা মানুষের মনে ভেসে ওঠে সেটা হল পুরুষের যৌনাঙ্গ, ইংরেজিতে যেটি PENIS বোঝায়। অপরদিকে লিঙ্গ বলতে GENDER বোঝায়। মানুষ যে শব্দের উপর ব্যক্তিত্ব আরোপ করতে চেয়েছে তার প্রমাণ ভাষায় এই ‘লিঙ্গ’-কল্পনা। পুরুষবাচক শব্দ (কিশোর, পুত্র, দেব ইত্যাদি) পুংলিঙ্গ বলে চিহ্নিত হল, আর স্ত্রীবাচক শব্দ (কিশোরী, পুত্রী, দেবী ইত্যাদি) চিহ্নিত হল স্ত্রীলিঙ্গ হিসাবে। ‘চিহ্নিত’ শব্দটি ব্যবহার করার কারণ ‘লিঙ্গ’ আর ‘চিহ্ন’ সমার্থক। কিন্তু যেসব জিনিস অচেতন, তারা সব যদি ক্লীবলিঙ্গ বলে চিহ্নিত হত, তাহলে তো কথাই ছিল না। কিন্তু এই অচেতন জিনিসগুলোর কিছু চিহ্নিত হল পুংলিঙ্গ হিসাবে, কিছু চিহ্নিত হল স্ত্রীলিঙ্গ হিসাবে।
গর্ভের শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ বে-আইনি হলেও জন্মের পর নবজাতকের লিঙ্গ-নির্ধারণ করতে শিশুর যৌনাঙ্গের দিকেই তাকাতে হয় সকলকে এবং যৌনাঙ্গ পর্যবেক্ষণ করেই বুঝে নিতে হবে সে নারী না, পুরুষ। শুধু নবজাতকের ক্ষেত্রেই নয়, কোনো প্রাণী পুরুষ না মহিলা সেটা বুঝতে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রাণীটির যৌনাঙ্গটিই পর্যবেক্ষণ করতে থাকি।
লিঙ্গ: লিঙ্গ-নির্ধারণ বোঝাতে শিশ্ন (পুরুষ) অথবা যোনি (মহিলা) দুই-ই বোঝালেও লিঙ্গ আসলে পুরুষের যৌনাঙ্গকেই বোঝায়। পুরুষের যৌনতার জন্য প্রধান অঙ্গ হল তার লিঙ্গ। এটি পুরুষের প্রধান জননাঙ্গ বা যৌনাঙ্গ। এই অঙ্গটি দ্বারা পুরুষ যৌনমিলনে অংশ নেয় এবং মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি লাভ করে। লিঙ্গের দৃঢ়তার উপর নির্ভর করে পুরুষের যৌনমিলনে অংশগ্রহণের ব্যাপারটি। এই লিঙ্গের একই ছিদ্র দিয়ে বীর্য এবং মূত্র নির্গত হয়। লিঙ্গ হল পুরুষের বহিঃযৌনাঙ্গের মধ্যে অন্যতম। লিঙ্গের সামনে একটি আবরণ ত্বক থাকে (মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের এই অংশটি কেটে ফেলা হয়। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত লিখব)। ইংরেজিতে এই ত্বককে বলে ফোর স্কিন। লিঙ্গে অসংখ্য কোশকলা আছে। এগুলোর প্রভাবে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পুরুষের লিঙ্গের ভিতর সবচেয়ে পুরু কৌশিক ঝিল্লির নাম হল করপরা কে ভারনোসা।
অণ্ডথলি : অণ্ডকোশ হল দুটো বলের মতো থলি, যেখানে শুক্র তৈরি হয়। এগুলোর স্বাভাবিক পরিমাপ হল দেড় ইঞ্চি। এগুলো লিঙ্গের নীচে ঝুলে থাকে। পুরুষের যৌন হরমোন এবং বীর্য উৎপাদনই হল অণ্ডকোশ দুটির কাজ।
এপিডিডাইমিস; প্রতিটি অণ্ডকোশের উপরের অংশকে এপিডিডাইমিস বলে। এপিডিডাইমিস হল বীর্যের সংরক্ষণের স্থান। টিউব এবং অন্যান্য নালি বেয়ে। বীর্য এপিডিডাইমিস থেকে অণ্ডকোশে চলে আসে।
ভাস ডিফারেন্স : প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড থেকে দুটো সেমিনাল কোশ সেমিনাল তরলের মিশ্রণ নিয়ে এপিডিডাইমিসে এসে পৌঁছোয়। এই চলাচলের নালি হল ভাস ডিফারেন্স। এটি পুরুষের অভ্যন্তরীণ যৌনাঙ্গ।
প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড : মূত্রথলির উপরে প্রোস্টেট গ্ল্যান্ডের অবস্থান। এই গ্ল্যান্ডের প্রোস্টেট তরল উৎপাদিত হয় শতকরা ৩৮ ভাগ এবং সেমিনাল তরল উৎপাদিত হয় ৬০ ভাগ, বাকি দুই ভাগ বীর্য উৎপাদিত হয়।
লিঙ্গের বেশ কিছু সমার্থক শব্দও আছে, যা পুরুষের যৌনাঙ্গই বোঝায়। যেমন– শিশ্ন, পুংস্তু, উপস্থ, ধোন, বাড়া, বংশদণ্ড ইত্যাদি। অপরদিকে যোনি নারীর যৌনাঙ্গকে বলে।
স্ত্রীযোনির গঠন : স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রাইমেট বর্গের প্রাণীকূলের, স্ত্রীপ্রজনন তন্ত্রের একটি অন্যতম অঙ্গ। জরায়ুর নীচের দিকে ভালভা পর্যন্ত বিস্তৃত নালি। স্বাভাবিক অবস্থায় সামনের দিকে ৬-৬.৫ সেন্টিমিটার এবং ভিতরে দিকে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮-১০ সেন্টিমিটার। তবে যৌন উত্তেজনা, সন্তান প্রসবের সময় এর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ প্রয়োজন অনুসারে বৃদ্ধি পায়। অসম্ভব একটি নমনীয় গুণের কারণে যৌনমিলনের সময় এবং সন্তান প্রসবের সময় প্রচুর পরিমাণে সম্প্রসারিত হতে পারে। দাঁড়ানো অবস্থায় যোনির শেষপ্রান্ত সামনে-পেছনে জরায়ুর সঙ্গে ৪৫ ডিগ্রির বেশি কোণ উৎপন্ন করে। যোনির ব্যাপ্তির বিচারে একে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এই ভাগ দুটি হল —
অন্তস্থিত যোনি: এই অংশ বাইরে থেকে দেখা যায় না। এমনকি সজোরে প্রসারিত করলেও বাইরে থেকে এই রন্ধ্রটি স্পষ্ট দেখা যায় না। এর নমনীয় মাংশপেশি গায়ে গায়ে লেগে থাকে বলে বাইরে থেকে অবরুদ্ধ পথ মনে হয়। এর উপরে অংশ জরায়ু-মুখের সঙ্গে যুক্ত থাকে। অবস্থানের বিচারে যোনি মূত্রনালির পিছনে এবং মলদ্বারের সামনে অবস্থিত। যোনির উপরের এক-চতুর্থাংশ রেকটোউটেরিন পাউচ দ্বারা মলাধার থেকে পৃথক থাকে। যোনিদ্বারের ভিতরের অংশের রং হালকা গোলাপি। এর ভিতরের পুরোটাই মিউকাস ঝিল্লি দ্বারা গঠিত। যোনির অভ্যন্তরের তিন-চতুর্থাংশ অঞ্চল উঁচুনীচু ভাঁজে পরিপূর্ণ, এই ভাঁজকে রুগি (rugae) বলে। যোনির পিচ্ছিলতা বার্থোলিনের গ্রন্থি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই গ্রন্থি যোনির প্রবেশ মুখে এবং জরায়ু-মুখের কাছে অবস্থিত। যৌনমিলনের সময় প্রয়োজনীয় পিচ্ছিলকারক তরল ক্ষরিত করার মাধ্যমে এটি লিঙ্গের প্রবেশ জনিত ঘর্ষণ হ্রাসে ভূমিকা রাখে। এবং একই সঙ্গে যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে। প্রতি মাসে ডিম্বক্ষরণের সময় জরায়ু-মুখের মিউকাস গ্রন্থিগুলো বিভিন্ন রকম মিউকাস ক্ষরণ করে। এর ফলে যোনির নালিতে ক্ষারধর্মী অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয় এবং এটি যৌনমিলনের মাধ্যমে প্রবিষ্ট পুরুষের শুক্রাণুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। যোনিমুখ জন্মগতভাবে যোজক কলার একটি পাতলা পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকে। এই পর্দাকে বলা হয় যোনিচ্ছদ বা সতীচ্ছদ। একসময় ধারণা ছিল পুরুষের সঙ্গে সঙ্গম ছাড়া বা কোনো অপদ্রব্য প্রবেশ ছাড়া এই পর্দা ছিঁড়ে যায় না। এই পর্দা অক্ষুণ্ণ থাকাটা সতীনারীর লক্ষণ হিসাবে বিবেচনা করা হত (আজও কোনো কোনো দেশে সতীচ্ছদ পরীক্ষা করে অক্ষত হলে অক্ষতযযানির সার্টিফিকেট দেওয়া হয়)। কিন্তু বাস্তবে নানা কারণে এই পর্দা ছিন্ন হতে পারে। ঘোড়ায় চড়া, সাইকেল চালনা, ব্যায়াম চর্চা, দৌড়ঝাঁপ ইত্যাদির কারণে এই পর্দা ছিঁড়ে যেতে পারে।
