বলা হয় হিন্দুদের প্রধান ধর্ম গ্রন্থ বেদ। মনুসংহিতাও হিন্দু পৌরাণিক গ্রন্থ। এই গ্রন্থকে হিন্দু আইনের ভিত্তিস্বরূপ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। হিন্দুধর্মের অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ, আচার-আচরণ, ধর্মীয় ও সামাজিক ক্রিয়াকলাপের বিধিবিধান সম্পর্কে এই গ্রন্থে আলাপ করা হয়েছে। মনু কর্তৃক সংকলিত বলে এর নাম মনুসংহিতা। কথিত আছে, এই গ্রন্থটি প্রথম স্বায়ম্ভুব মনু রচনা করেছিলেন। বেদ হিন্দুদের আদি গ্রন্থ এবং এই গ্রন্থের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেই ‘মনুসংহিতা’ বা ‘মনুস্মৃতি’ রচিত হয়েছে একথা বলা যায়। অতএব হিন্দুধর্ম মূলত মনুসংহিতা-নির্ভর। হিন্দু এবং হিন্দুবাদের আগাপাছতলাই মনু এবং মনুসংহিতা। মনুকে যদি আদি মানব বলা হয়, তাহলে হিন্দুদের কাছে ইনি প্রাতঃস্মরণীয় হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি কোনো এক অজানা কারণে। মনুকে আদি মানব বলা হলেও নিশ্চয় অন্য ধর্মের মানে পৃথিবীর অন্য মানুষদের তিনি আদি নন, তিনি শুধু হিন্দুমানবদেরই আদি মানব, তাই নয় কি?
মনুস্মৃতি ও মহাভারত গ্রন্থদুটিতে কতকগুলি শ্লোকের হুবহু মিল পাওয়া যায়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিমার্জন হলেও একইরকম। বস্তুত মনুর গ্রন্থ আমাদের কাছে আদিরূপে পৌঁছোয়নি। বর্তমান মহাভারত বহুদিন যাবৎ বিবর্তনেরই রূপ। সুতরাং মহাভারতের কাছে মনুসংহিতা ঋণী, নাকি মনুসংহিতার কাছে মহাভারত ঋণী– তা বলা প্রায় অসম্ভব। এই দুই গ্রন্থে এমন কিছু শ্লোক আছে যেগুলিতে শব্দগত সাদৃশ্য না-থাকলেও ভাবগত সাদৃশ্য বিদ্যমান।
‘মনুসংহিতা’-য় কী কী আছে? ২৬৯৪ টি শ্লোকে সন্নিবেশিত গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো হল– (ক) পৃথিবীর উৎপত্তি (খ) বিভিন্ন সংস্কারের নিয়ম (গ) ব্রতচারণ (ঘ) বিবাহের নিয়মাবলি (ঙ) অপরাধের শাস্ত্রীয় বিধি (চ) শ্রাদ্ধবিধি (ছ) খাদ্যাখাদ্য বিধি (জ) বিভিন্ন বর্ণের কর্তব্য (ঝ) বর্ণাশ্রম বিধি (ঞ) স্ত্রী পুরুষের পারস্পরিক ধর্ম (ট) সম্পত্তি বন্টনের বিধি (ঠ) সংকর বর্ণের বিবরণ
(ড) জাতিধর্ম (ঢ) কুলধর্ম (ণ) ব্রাহ্মণের অধিকার ও করণীয় এবং (ত) রাজা প্রজার পারস্পরিক কর্তব্য ইত্যাদি।
হিন্দুদের ধর্মভিত্তিক আইন ও সামাজিক রীতি নীতি পরিচালিত হয় আরেকটি গ্রন্থ ‘মনুসংহিতা’ বা ‘মনুস্মৃতি’র উপর ভিত্তি করে। বেদের নির্যাস নিয়েই আরোপিত এই ধর্মটির প্রচারিত সংবিধান হয়ে উঠল মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতা। এর মাধ্যমে যে সমাজ-কাঠামোর নির্মাণ যজ্ঞ চলতে থাকল তার ভিত্তি এক আজব চতুর্বর্ণ প্রথা। যেখানে আদিনিবাসী অনার্যরা হয়ে যায় নিম্নবর্ণের শূদ্র, যারা কেবলই উচ্চতর অন্য তিন বর্ণ ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্যের অনুগত সেবাদাস। কোনো সমাজ-সংগঠনে বা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান যজ্ঞে অংশগ্রহণের অধিকার শূদ্রদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়। আর যারা এই ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে প্রতিবাদী-বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চাইল, এদেরকেই সুকৌশলে করা হল অচ্ছুৎ, দস্যু, অসুর, দৈত্য, সমাজচ্যুত বা অস্পৃশ্য সম্প্রদায়। পৃথিবীতে যতগুলো কথিত ধর্মগ্রন্থ আছে তার মধ্যে মনে হয় অন্যতম বর্বর, নীতিহীন, শঠতা আর অমানবিক প্রতারণায় পরিপূর্ণ গ্রন্থটির নাম হচ্ছে ‘মনুস্মৃতি’ বা ‘মনুসংহিতা’।
এ পর্যন্ত পাঠ করে যাঁরা ভাবছেন মনু খুবই নৃশংস ধরনের আইনপ্রণেতা ছিলেন, তাঁদের বলব ভুল ভাবছেন। ১২ টি অধ্যায়ের ২৬৯৪ টি শ্লোক জুড়ে মনু কেবলই নৃশংসতার পরিচয় লিপিবদ্ধ করেননি, অসংখ্য উদার এবং কল্যাণকর মানসিকতার বিধানও সংযোজন করেছেন। দুর্ভাগ্য এই যে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালকগণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেইসব কল্যাণকর বিধানগুলির পথ মাড়াননি এবং অত্যন্ত সচেতনভাবেই এড়িয়ে গেছেন। প্রচুর উদাহরণ দেওয়া যায়, তাতে প্রবন্ধটির কলেবর বৃদ্ধি হোক আমি তা চাই না। দুটি উদাহরণই উল্লেখ করব–
(১) “যদি কোনো ব্যাক্তির স্ত্রী অথবা সন্তান না থাকে তাহলে তার সম্পত্তি তার ভাই-বোনদের মাঝে সমান ভাগে ভাগ করে দেবে। যদি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা তার ভাই-বোনদের মাঝে প্রাপ্য অংশ প্রদান করতে অস্বীকৃত জানায় তাহলে আইন অনুযায়ী সে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য” (৯/২১২)।
(২) “নারীর সুরক্ষা বিধান নিশ্চিত করার জন্য মনু আরও কঠোরতর শাস্তি বিধানের পরামর্শ দিয়েছেন তাদের উপর যারা নারীর সম্পত্তি হনন করার চেষ্টা করবে, এমনকি সে তার নিকট-আত্মীয় হলেও তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে” (৯/২১৩) অথচ নারীকে বহুকাল সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে, আজ তক। নানা কৌশলে নারীকে পিতামাতার সম্পত্তি থেকে দূরে রাখা হয়েছে। নারীর সম্পত্তির অধিকার বিষয়ে আইন আছে বটে, কিন্তু ওই পর্যন্তই। হাজার হাজার বছর ধরে মনুর বিধান যেমন মনুসংহিতায় বন্দি হয়েছিল, আধুনিক আইনও ওইভাবেই প্রায়-অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আছে। দাবি করলে পাওয়া যায় বটে, না দাবি করলে কিছুই নেই।
পরিশেষে বলব– ব্রাহ্মণ্যবাদের আকর গ্রন্থ শ্রুতি বা ‘বেদ’-এর নির্যাসকে ধারণ করে যেসব স্মৃতি বা শাস্ত্রগ্রন্থ রচিত হয়েছে বলে কথিত, তার শীর্ষে অবস্থান করছে মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতা। তাই মনুসংহিতা ও ব্রাহ্মণ্যবাদকে আলাদা করে দেখার উপায় নেই। সাধারণত ব্রাহ্মণ্যবাদীরা নিজেদেরকে হিন্দু বলে পরিচয় দেয়। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ছাড়া কেউই হিন্দু নয়। ব্রাহ্মণ্যবাদে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অদম্য চেষ্টা করে যাচ্ছে একশ্রেণির মূলনিবাসী। হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলগুলিকে অক্সিজেন জোগাচ্ছে। কারণ মুসলিম-বিদ্বেষ। মুসলিমদের ভারত থেকে উৎখাত করাই এঁদের মূল স্বপ্ন। ওরা এটা বুঝতে পারছে না, সত্যিই যদি ভারত থেকে মুসলিমরা উৎখাত হয়ে যায়, তখন ওদেরও উৎখাত শুরু হয়ে যাবে। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের মতাদর্শে শূদ্র ও মুসলিম সমান ঘৃণ্য।
