অপরদিকে আম্বেদকর অস্পৃশ্যদের পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর কথা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধি অস্পৃশ্যদের জন্য গঠিত পৃথক নির্বাচকমন্ডলীর প্রচণ্ডভাবে বিরোধিতা করেন, যদিও তিনি অন্য সকল সংখ্যালঘুদের যেমন মুসলমানদের ও শিখদের পৃথক নির্বাচকমন্ডলী (Separate Electorate) বিনা দ্বিধায় মেনে নেন এই বলে যে, তিনি অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের গঠনকৃত নির্বাচকমন্ডলী হিন্দুসমাজকে ভবিষ্যতে বিভক্ত এবং উচ্চশ্রেণীর ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ১৯৩২ সালে যখন ব্রিটিশরা আম্বেদকরের সাথে একমত হন এবং পৃথক নির্বাচকমন্ডলীদের ঘোষণা করেন, তখন মহাত্মা গান্ধী পূনের এরোদা কেন্দ্রীয় কারাগারে (Yerwada central jail) শুধুমাত্র অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের পৃথক নির্বাচকমন্ডলীর প্রতি উপবাস শুরু করেন। গান্ধীর এই উপবাস (fast) ভারতজুড়ে বেসামরিকদের মাঝে প্রবল বিক্ষোভের উদ্দীপনা জোগায় এবং ধর্মীয় গোঁড়াবাদী নেতারা (Orthodox Politicians), কংগ্রেস নেতারা কর্মীদের মধ্যে মদনমোহন মালোভি ও পালঙ্কর বালো ও তাঁর সমর্থকরা আম্বেদকরের সঙ্গে এরাভাদে (Yeravada) যৌথ বৈঠক করেন। গান্ধিবাদীদের প্রবল চাপের মুখে (Massive coercion) 422 sypoginta sfocate (Communal reprisal) ও অস্পৃশ্য সম্প্রদায়কে নির্মূলীকরণের আশঙ্কায় আম্বেদকর পৃথক নির্বাচকমন্ডলী বাতিল করতে সম্মত হন। এই চুক্তির পরে গান্ধি উপবাস পরিত্যাগ করেন, ইতিহাসে এটি “পুনে চুক্তি” নামে পরিচিত। চুক্তির ফলশ্রুতিতে আম্বেদকর পৃথক নির্বাচকমন্ডলী গঠনের দাবি ছেড়ে দেন যা আম্বেদকর গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের আগে ব্রিটিশ সাম্প্রদায়িক কর্তৃক শর্তসাপেক্ষে মঞ্জুর করে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হন। একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন অস্পৃশ্যদের জন্য সংরক্ষিত হয়। এই চুক্তিতে যাকে বলা হয় অস্পৃশ্য সম্প্রদায় (Depressed Class)। আম্বেদকর হিন্দুবাদকে কর্কশ ভাষায় সমালোচনা করেন তাঁর “দ্য আটাচেব্যলস : এ থিসিস অন দ্য অরিজিনস অব আটাচেব্যলিটি” রচনায়–The Hindu Civilisation…. is a diabolical contrivance to suppress and enslave humanity. Its proper name would be infamy. What else can be said of a civilisation which has produced a mass of people…. who are treated as an entity beyond human intercourse and whose mere touch is enough to cause pollution? (হিন্দু সভ্যতা… হচ্ছে মানবতাকে দমন এবং পরাভূত করতে একটি পৈশাচিক কৌশল। এর প্রকৃত নাম হবে সামাজিক কুখ্যাতি। কাকে সভ্যতা বলে ডাকা যায়, যার একগাদা মানুষ…., যাদের সত্ত্বা মানব সম্পর্কের নিচে গণ্য হয় ও শুধু যাদের ছোঁয়া দূষণের জন্য যথেষ্ট?)।
ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন-শোষণে নিপীড়িত নিম্নশ্রেণির মানুষের সামনে ভীমরাও রামজি আম্বেদকর আলোর মশাল নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন। জাতপাত থেকে দলিত সম্প্রদায়কে চিরতরে মুক্তি দিতে তিনি বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। নৃতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে আম্বেদকর আবিষ্কার করেন মহরেরা আসলে প্রাচীন ভারতীয় বৌদ্ধ। আম্বেদকর তাঁর সারাজীবনে বৌদ্ধ ধর্ম অধ্যয়ন করেন, ১৯৫০ এর সময়ে তিনি এই ধর্মে তাঁর সম্পূর্ণ মনোযোগ দেন এবং শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ করেন (তারপর শিলং) বৌদ্ধ পণ্ডিতদের ও ভিক্ষুদের একটি সম্মেলনে যোগ দিতে। যখন তিনি পুনের কাছাকাছি একটি নতুন বৌদ্ধমন্দির অর্পণ করেন, তখন আম্বেদকর ঘোষণা দেন যে, তিনি বৌদ্ধধর্মের উপর একটি বই লিখেছেন, যত শীঘ্রই তিনি বইটি শেষ করবেন, তিনি সাদামাটাভাবে এই ধর্মে গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ যন্ত্রণার দীর্ঘ ৫৯ বছর বাবাসাহেব হিন্দুধর্মে যাপন করলেও, বাকি শেষ ৬ বছর তিনি বৌদ্ধধর্মেই ছিলেন। আম্বেদকর তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী সভিতা আম্বেদকর (বিবাহ পূর্ব নামঃ সাদা কবির), তাঁর স্বামীর সঙ্গে তিনিও বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং ২০০২ সালে বৌদ্ধাবলম্বী হিসাবেই মারা যান।
বর্তমানে মনুস্মৃতি প্রথম থেকেই এরূপ ছিল না। আদি সংহিতায় এক লক্ষ শ্লোক ছিল, কিন্তু এখন মাত্র ২৬৯৪ টা শ্লোক পাওয়া যায়। প্রথম অধ্যায়ের ৫৮ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে, ব্রহ্মা এই শাস্ত্র প্রস্তুত করে মনুকে শিখিয়েছিলেন। মনু, মরীচি প্রভৃতি মুনিগণকে শিখিয়েছিলেন। প্রথম অধ্যায়ের ৫৯ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে, ভৃগু এই শাস্ত্র মুনিগণকে শোনাবেন। এর থেকে বোঝা যায়, অন্তত তিনটি স্তরের মধ্য দিয়ে এই গ্রন্থ বর্তমান আকার ধারণ করেছে। এই গ্রন্থের রচনাকাল নির্ণয় করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। পণ্ডিতপ্রবরগণ কেউ কেউ বলেন, আনুমানিক ২০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তীকালে রচিত হয়েছে। স্যর উইলিয়াম জোনসের মতে খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতক, শ্লেগেলের মতে খ্রিস্টপূর্ব দশম শতক, এলফিনস্টোনের মতে খ্রিস্টপূর্ব নবম শতক, বুহলারের মতে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে মনুসংহিতা রচিত হয়েছিল। অদ্যাপি মনুর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তাঁর স্মৃতির দোহাই দিয়ে পণ্ডিত সমাজ পদে পদেই দেওয়া হয়। স্মৃতিনিবন্ধগুলোতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মনুর বচনের বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। মনুর প্রভাব ভারতের চতুঃসীমাতেই আবদ্ধ নয়– ব্রহ্মদেশ বা মায়ানমার, সিংহল বা শ্রীলঙ্কা, পারস্য বা ইরান, চিন, জাপান এবং সুদূর প্রাচ্যের কিছু দেশে তাঁর প্রভাব ব্যাপক এবং সুগভীর। মায়ানমারের কিছু আইনের গ্রন্থে মনুর ঋণ স্পষ্টই স্বীকৃত হয়েছে। শ্রীলঙ্কার ‘চুলবংশ’ নামক গ্রন্থে মনুর রাজধর্মের উল্লেখ বারবার করা হয়েছে। চিনে প্রাপ্ত একটি পুথিতে মনুর আইনকানুনের উল্লেখ পাওয়া যায়। জাপানে উপনিবেশ স্থাপনকারী কিছু আর্য সেই দেশে মনুর ধর্মশাস্ত্র প্রবর্তিত করেছিলেন বলে মনে হয়। প্রাচীন পারস্য ইরানের দেবগোষ্ঠীর মধ্যে আছেন বৈবস্বত মনু।
