(৬) শূদ্রা ভার্য্যা গ্রহণের পর যদি ব্রাহ্মণের দৈবকর্ম (যেমন– দর্শপূর্ণমাস যজ্ঞ প্রভৃতি এবং দেবতার উদ্দেশ্যে যে ব্রাহ্মণভোজনাদি হয়, তা), পিত্রকর্ম (পিতৃপুরুষের প্রতি করণীয় কর্ম, যথা, শ্রাদ্ধ, উদক-তর্পণ প্রভৃতি) এবং আতিথেয় কর্ম (যেমন– অতিথির পরিচর্যা, অতিথিকে ভোজন দান প্রভৃতি) প্রভৃতিতে শূদ্রা ভার্যার প্রাধান্য থাকে অর্থাৎ ঐ কর্মগুলি যদি শূদ্রা স্ত্রীকর্তৃক বিশেষরূপে সম্পন্ন হয়, তাহলে সেই দ্রব্য পিতৃপুরুষগণ এবং দেবতাগণ ভক্ষণ করেন না এবং সেই গৃহস্থ ঐ সব দেবকর্মাদির ফলে স্বর্গেও যান না (অর্থাৎ সেই সব কর্মানুষ্ঠান নিষ্ফল হয়)।
“দৈবপিত্যাতিথেয়ানি তৎপ্রধানানি যস্য তু।
নান্তি পিতৃদেবাস্তং ন চ স্বর্গং স গচ্ছতি।।” (৩/১৮)
(৭) কোনো হীনজাতীয় পুরুষ যদি কোনও উচ্চবর্ণের কন্যাকে তার ইচ্ছা অনুসারেও সম্ভোগ করতে থাকে, তাহলে সেই পুরুষের বধদণ্ড হবে। কিন্তু নিজের সমানজাতীয় কন্যার সাথে ঐরকম করলে সে ঐ কন্যার পিতাকে শুল্ক দেবে, যদি তার পিতা ঐ শুল্ক নিতে ইচ্ছুক হয়।
“উত্তমাং সেবমানস্তু জঘন্যো বধমহতি।
শুল্কং দদ্যাৎ সেবমানঃ সমামিচ্ছেৎ পিতা যদি।।” (৮/৩৬৩)।
(৮) কোনও দ্বিজাতি-নারী স্বামীর দ্বারা রতি হোক বা না-ই হোক, কোনও শূদ্র যদি তার সাথে মৈথুন ক্রিয়ার দ্বারা উপগত হয়, তাহলে অরক্ষিতা নারীর সাথে সঙ্গমের শাস্তিস্বরূপ তার সর্বস্ব হরণ এবং লিঙ্গচ্ছেদনরূপ দণ্ড হবে; আর যদি স্বামীর দ্বারা অরক্ষিতা নারীর সাথে সম্ভোগ করে তাহলে ঐ শূদ্রের সর্বস্বহরণ এবং মারণদণ্ড হবে।
“শূদ্রো গুপ্তমগুপ্তং বা দ্বৈজাতং বর্ণমাবস।
অগুপ্তমঙ্গসর্বস্বৈগুপ্তং সর্বেণ হীয়তে।।” (৮/৩৭৪)।
(৯) শূদ্র পুরুষ থেকে প্রতিলোমক্রমে জাত অর্থাৎ শূদ্র পুরুষের ঔরসে বৈশ্যা স্ত্রীতে জাত আয়োগব, ক্ষত্রিয়া স্ত্রীতে জাত ক্ষত্তা এবং ব্রাহ্মণী স্ত্রীতে জাত চণ্ডাল–এই তিন জাতি পুত্ৰকাজ করার অযোগ্য। এই জন্য এরা অপসদ অর্থাৎ নরাধম বলে পরিগণিত হয়। এদের মধ্যে চণ্ডাল হলো অস্পৃশ্য।
“আয়োগবশ্চ ক্ষত্তা চ চাণ্ডালশ্চাধমো নৃণাম্।
প্রাতিলোম্যেন জায়ন্তে শূদ্রাদপসদাস্ত্রয়ঃ।।” (১০/১৬)
(১০) চণ্ডাল, শ্বপচ প্রভৃতি জাতির বাসস্থান হবে গ্রামের বাইরে। এইসব জাতিকে ‘অপপাত্র করে দিতে হয়; কুকুর এবং গাধা হবে তাদের ধনস্বরূপ।
“চণ্ডালশ্বপচানাং তু বহির্গামাৎ প্রতিশ্রয়ঃ।
অপপাত্রাশ্চ কর্তব্যা ধনমেষাং শ্বগর্দভম্।।” (১০/৫১)
বলা হয়েছে, নারীর কোনো জাত নেই। ব্রাহ্মণ-ঘরে জন্মালেও সে ব্রাহ্মণ নয়। নারীর উপনয়ন নেই, তাই উপবীতও নেই। নারী কখনোই দ্বিজ নয়। নারীর পৌরহিত্যের অধিকার নেই। নেই কেবল নারী ও শূদ্রদের। যা আছে সব ব্রাহ্মণদের। যে দেশের নাগরিকের বৃহৎ অংশ (নারী এবং শূদ্র) বঞ্চিত, অবহেলিত, অধিকারহীন, ঘৃণিত, ধিকৃত, অশিক্ষিত থাকে –সে দেশ কখনোই অগ্রবর্তী হতে পারে না। হয়ওনি। মনু চেয়েছেন অগ্রবর্তী হোক কতিপয় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় তথা রাজা এবং বৈশ্যদের (যদিও বৈশ্যদের জন্য তেমন কোনো নিদান নেই। কারণ বৈশ্যরা নিজগুণেই প্রতিষ্ঠিত)।
মনুসংহিতার ছত্রে ছত্রে এঁদেরই সমৃদ্ধর কথা ভেবেছেন। মনুর এই মনুসংহিতার অনুশাসনই পরবর্তীতে হিন্দু বা হিন্দুত্ববাদ রূপে প্রকাশিত হয়েছে। হিন্দুধর্মের জাতপাত এর একটা বড়ো সমস্যা। এই সমস্যা এখনও গর্বের সঙ্গে হিন্দুরা অনুসরণ করে থাকে। আধুনিক এবং স্বাধীন ভারতবর্ষে রাষ্ট্রীয় আইন বা সংবিধান থাকলেও বহুকাল ধরে বিনা প্রতিবাদে চালু থাকায় রাষ্ট্রের আইনের চেয়ে ‘মনুর বিধান অনেক বেশি শক্ত ও দৃঢ়মূল হয়ে আছে। স্বাধীন ভারতের সংবিধান প্রণেতা ড. বি আম্বেদকরও খুব বেশি মনুবাদকে নড়াতে পারেননি। হরিজনদের উপরে উঠিয়ে প্রয়াসে তাদের সংরক্ষণ করা ছাড়া বিশেষ কিছু করেছেন বলে জানা নেই। সেই সংরক্ষণও এমনভাবে প্রয়োগ হয়, যেখানে হরিজনেরা যেই তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই আছে, এগিয়ে আছে এগিয়ে থাকারাই। মনুর এই ধরনের মানসিক বৈশিষ্ট্য মনুষ্যচিত, ভগবানোচিত নয়। মানুষই ভোগলিপ্সায় এইসব বিভাজন, বৈষম্য, নিষ্ঠুরতা নির্মাণ করে থাকবে, দেবতা বা ভগবান নয়। দেবতা বা ভগবান পরম করুণাময়, ক্ষতিকর হতে পারে না। অতএব মনু ভগবান নয়, মানুষ– দোষেগুণে তমোগুণসম্পন্ন মানুষ, মাননীয় শাসকমাত্র।
ড. আম্বেদকর ভারতের গরিব ‘মহর’ পরিবারে (তখন অস্পৃশ্য জাতি হিসাবে গণ্য হত) জন্মগ্রহণ করেন। সেই কারণেই হয়তো তফসিলি জাতি এবং উপজাতিদের সংরক্ষণ করেছিলেন। উনি হয়তো চেয়েছিলেন আরও পরিবর্তন, কিন্তু ভারতবর্ষের অস্পৃশ্য (Untouchables or Untouchables community) প্রথার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেলেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরিত হন এবং হাজারো শত (Hundreds of Thousands) অস্পৃশ্যদের থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম (Theravada Buddhism) স্ফুলিঙ্গের মতো রূপান্তরিত করে সম্মানিত হয়েছিলেন।
১৯২৭ সালে আম্বেদকর অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি গণ-আন্দোলন শুরু করেন এবং সুপেয় জলের উৎসদানে সংগ্রাম চালিয়ে যান (উল্লেখ্য, সে সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরে নিন্মবর্ণের প্রবেশের অধিকার ছিল না)। মহদে সত্যগ্রহ নামের অস্পৃশ্যদের (অন্ত্যজ জাতির) জন্য সংগ্রাম করে সুপেয় জল পানের অধিকার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তাঁকে ১৯২৫ সালে বোম্বে প্রেসিডেন্সি কমিটিতে নিয়োগ করা হয়েছিল, যাতে করে তিনি সমস্ত ইউরোপীয় সিমন কমিশনের সঙ্গে কাজ করতে পারেন। সমগ্র ভারতজুড়ে স্ফুলিঙ্গের আকারে ব্যাপক আন্দোলন ছড়িয়ে পরে এবং যখন এই তালিকাটি অধিকাংশ ভারতীয় কর্তৃক ত্যাগ করা হয়েছিল, আম্বেদকর নিজে ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক সুপারিশের জন্য একটি পৃথক সুপারিশ নামা লিখিত দেন।
