মনু যেটা ছিলেন না, তা হল শূদ্র– কারণ মনু ছিলেন ব্রাহ্মণ। আর তাই শূদ্র জনজাতির প্রতি মনু এত নির্দয়তা, নিষ্ঠুরতা। এঁরা সংখ্যায় বৃহৎ হলেও, মর্যাদায়-অধিকারে অতি ক্ষুদ্র করে দেওয়া হল, ঘৃণ্য করে দেওয়া হল। এবার দেখি শূদ্র সম্পর্কে মনু কী বলেন —
(১) শূদ্র বা দাসদের নিজস্ব কোনো সম্পত্তি রাখার অধিকার নেই।
(২) দাস ও শূদ্রের ধন ব্রাহ্মণ অবাধে নিজের কাজে প্রয়োগ করবেন।
(৩) শূদ্র অর্থ সঞ্চয় করতে পারবে না। কারণ তাঁর সম্পদ থাকলে সে গর্বভরে ব্রাহ্মণের উপর অত্যাচার করতে পারে।
(৪) প্রভু কর্তৃক পরিত্যক্ত বস্ত্র, ছত্র, পাদুকা ও তোষক প্রভৃতি শূদ্র ব্যবহার করবে।
(৫) প্রভুর উচ্ছিষ্ট তাঁর ভক্ষ্য।
(৬) দাস বৃত্তি থেকে শূদ্রের কোনো মুক্তি নেই।
(৭) যজ্ঞের কোনো দ্রব্য শূদ্র পাবে না।
(৮) ব্রাহ্মণের পরিবাদ বা নিন্দা করলে শূদ্রের জিহ্বাছেদন বিধেয়।
(৯) ব্রাহ্মণ শূদ্রের নিন্দা করলে যৎসামান্য জরিমানা দেয়।
(১০) ব্রাহ্মণ কর্তৃক শূদ্ৰহত্যা সামান্য পাপ। এই রূপে হত্যা পেঁচা, নকুল ও বিড়াল ইত্যাদি হত্যার সমান।
(১১) শূদ্র কর্তৃক ব্রাহ্মণ হত্যার বিচার মৃত্যুদণ্ড।
(১২) শূদ্র সত্য কথা বলছে কি না তাঁর প্রমাণ হিসাবে তাকে দিব্যের আশ্রয় নিতে হবে। এতে তাকে জলন্ত অঙ্গারের উপর দিয়ে হাঁটতে হয় অথবা জলে ডুবিয়ে রাখা হয়। অদগ্ধ অবস্থায় অথবা জলমগ্ন না-হয়ে ফিরলে তাঁর কথা সত্য বলে বিবেচিত হবে।
(১৩) দ্বিজকে (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য) প্রহার করলে শূদ্রের হাত কেটে ফেলা বিধেয়।
(১৪) ব্রাহ্মণের সঙ্গে একাসনে বসলে তাঁর কটিদেশে তপ্তলৌহ দ্বারা চিহ্ন একে তাকে নির্বাসিত করা হবে অথবা তাঁর নিতম্ব এমনভাবে ছেদন করা হবে যাতে তাঁর মৃত্যু হয়।
(১৫) দ্বিজের ন্যায় উপবীত বা অন্যান্য চিহ্ন ধারণ করলে শূদ্রের মৃত্যুদণ্ড বিধেয়।
(১৬) যে পথ দিয়ে উচ্চ বর্ণের লোকেরা যাতায়াত করেন, সেই পথ শূদ্রের মৃতদেহও বহন করা যাবে না।
(১৭) ব্রাহ্মণের গায়ে থুথু দিলে তার ওষ্ঠছেদন হবে। মূত্রপুরীষ নিক্ষেপ করলে যথাক্রমে যৌনাঙ্গ ছেদন করা হবে এবং অধোবায়ু ত্যাগ করলে গুহ্যদেশ ছেদন করা হবে।
(১৮) শূদ্র যদি হিংসার বশবর্তী হয়ে ব্রাহ্মণের চুল, চিবুক, পা, দাড়ি, ঘাড় এবং অণ্ডকোষে হাত দেয় তাহলে নির্বিচারে তাঁর দুটি হাতই কেটে দেওয়া হবে। ভগবানের নির্দেশ বলে কথা!
এখানেই শেষ নয়। চমকে যাওয়ার মতো নির্দেশ। আরও পড়ুন–
(১) সবর্ণা স্ত্রী বিবাহ না করে শূদ্রা নারীকে প্রথমে বিবাহ করে নিজ শয্যায় গ্রহণ করলে ব্রাহ্মণ অধধাগতি (নরক) প্রাপ্ত হন; আবার সেই স্ত্রীতে সন্তানোৎপাদন করলে তিনি ব্রাহ্মণত্ব থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পড়েন। অর্থাৎ সমান। জাতীয় নারী বিবাহ না করে দৈবাৎ শূদ্রা বিবাহ করলেও তাতে সন্তান উৎপাদন করা ব্রাহ্মণের উচিত নয়।
“শূদ্রাং শয়নমারোপ্য ব্রাহ্মণে যাত্যধোগতিম্।
জনয়িত্বা সুতং তস্যাং ব্রাহ্মণ্যাদেব হীয়তে।।” (৩/১৭)
(২) কোনও দ্বিজাতি-নারী (অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ত্রিয় ও বৈশ্য নারী স্বামীর দ্বারা রক্ষিত হোক বা না-ই হোক, কোনও শূদ্র যদি তার সাথে মৈথুন ক্রিয়ার দ্বারা উপগত হয়, তাহলে অরক্ষিতা নারীর সাথে সঙ্গমের শাস্তিস্বরূপ তার সর্বস্ব হরণ এবং লিঙ্গচ্ছেদনরূপ দণ্ড হবে, আর যদি স্বামীর দ্বারা রক্ষিতা নারীর সাথে সম্ভোগ করে তাহলে ওই শূদ্রের সর্বস্বহরণ এবং মারণদণ্ড হবে।
“শূদ্রো গুপ্তমগুপ্তং বা দ্বৈজাতং বর্ণমাবস।
অগুপ্তমঙ্গসর্বস্বৈগুপ্তং সর্বেণ হীয়তে।।” (৮/৩৭৪)
(৩) ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই দ্বিজাতিরা যদি মোহবশত (ধনলাভজনিত অবিবেকবশতই হোক অথবা কামপ্রেরিত হয়েই হোক) হীনজাতীয় স্ত্রী বিবাহ করেন, তাহলে তাদের সেই স্ত্রীতে সমুৎপন্ন পুত্রপৌত্রাদির সঙ্গে নিজ নিজ বংশ শীঘ্রই শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হয়।
“হীনজাতিস্ত্রিয়ং মোহাদুঘহন্তো দ্বিজাতয়ঃ।
কুলান্যেব নয়ন্ত্যাশু সসন্তানানি শূদ্ৰতাম্।।” (৩/১৫)
(৪) শূদ্রা স্ত্রী বিবাহ করলেই ব্রাহ্মণাদি পতিত হন– এটি অত্রি এবং উতথ্যতনয় গৌতম মুনির মত। শৌনকের মতে, শূদ্রা নারীকে বিবাহ করে তাতে সন্তানোৎপাদন করলে ব্রাহ্মণাদি পতিত হয়। ভৃগু বলেন, শূদ্রা স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানের সন্তান হলে ব্রাহ্মণাদি দ্বিজাতি পতিত হয়। (মেধাতিথি ও গোবিন্দরাজের মতে, কেবলমাত্র ব্রাহ্মণের শূদ্রা স্ত্রীর ক্ষেত্রেই এই পাতিত্য বুঝতে হবে। কুল্লুক ভট্টের মতে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য- এই তিনজাতির শুদ্রা স্ত্রী সম্বন্ধেই এই পাতিত্য হবে)।
“শূদ্রাবেদী পতত্যত্রেরুতথ্যতনয়স্য চ।
শৌনকস্য সুলতাৎপত্তা তদপত্যতয়া ভূগোঃ।।” (৩/১৬)।
(৫) সবর্ণা স্ত্রী বিবাহ না করে শূদ্রা নারীকে প্রথমে বিবাহ করে নিজ শয্যায় গ্রহণ করলে ব্রাহ্মণ অধধাগতি (নরক) প্রাপ্ত হন; আবার সেই স্ত্রীতে সন্তানোৎপাদন করলে তিনি ব্রাহ্মণত্ব থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পড়েন অতএব সমানজাতীয় নারী বিবাহ না করে দৈবাৎ শূদ্রা বিবাহ করলেও তাতে সন্তান উৎপাদন করা ব্রাহ্মণের উচিত নয়]।
“শূদ্রাং শয়নমারোপ্য ব্রাহ্মণণা যাত্যধোগতিম্।
জনয়িত্বা সুতং তস্যাং ব্রাহ্মণ্যাদেব হীয়তে।।” (৩/১৭)
