(৩) ঈশ্বরের বিধান অনুসারে রাজপদ উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করা যায়। রাজার মৃত্যু হলে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজা হবেন।
(৪) রাজা যেহেতু ঈশ্বরের প্রতিনিধি সেইহেতু তিনি কখনোই অন্যায় করতে পারেন না। ঈশ্বর ছাড়া তিনি আর কারও কাছে তাঁর কাজের জন্য জবাব দিতে বাধ্য নন।
(৫) ঈশ্বরের প্রতিনিধি এই রাজার বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ করা যায় না।
এই ধারণা বা তত্ত্ব শুধু ভারতবর্ষের হিন্দুধর্মেই নয়– এই তত্ত্ব মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি ইত্যাদি সব ধর্মেই প্রচার করা হয়েছে। যেহেতু আমি এই রচনায় শুধুমাত্র মনু এবং মনুসংহিতা নিয়ে আলোচনা করব, সেইহেতু অন্য ধর্মের আলোচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক।
মনুর বলছেন রাজা কে? রাজশূন্য এই জগতকে রক্ষার জন্য ইন্দ্র, বায়ু, যম, সূর্য, অগ্নি, বরুণ, চন্দ্র এবং কুবের– এই দেবতার সারভূত অংশ নিয়ে পরমেশ্বর রাজাকে সৃষ্টি করেছেন। যেহেতু এই শ্রেষ্ঠ দেবগণের অংশ থেকে রাজার সৃষ্টি হয়েছিল সেইজন্য তিনি সকল জীবকে তেজে অভিভূত করেন।
“অরাজকে হি লোকেহস্মিন্ সর্বতো বিদ্রুতে ভয়াৎ।
রক্ষার্থমস্য সর্বস্য রাজানমসৃজৎ প্রভুঃ।।
ইন্দ্রানিলমার্কাণামগ্নেশ্চ বরুণস্য চ।
চন্দ্রবিত্তেশয়োশ্চৈব মাত্রা নিত্য শাশ্বতীঃ।।
যম্মাদেং সুরেন্দ্রাণাং মাত্রাভ্যো নির্মিত নৃপঃ।
তস্মাদভিভবত্যেষ সর্বভূতানি তেজসা”। (মনুসংহিতা, ৭: ৩-৪-৫)
রাজা কী? মনু বলছেন–
(১) তিনি সূর্যের মতো চোখ ও মন সন্তপ্ত করেন। পৃথিবীতে কেউ তাঁকে মুখোমুখি অবলোকন করতে পারে না।
(২) বালক হলেও রাজাকে মানুষ মনে করে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। ইনি মানুষের রূপে মহান দেবতা।
(৩) অতি নিকটে গেলে আগুন একমাত্র সেটাই দগ্ধ করে, কিন্তু রাজারূপ আগুন বংশ-পশু-সম্পত্তি সহ দগ্ধ করে।
(৪) রাজার অনুগ্রহে বিশাল সম্পত্তি লাভ হয়, যাঁর বীরত্বে জয়লাভ হয়, যাঁর ক্রোধে মৃত্যু বাস করে, তিনি প্রকৃতই সর্বতেজোময়। ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজার নিষ্কন্টক সিংহাসনও পাক্কা। কারণ মনু শাসক তথা রাজাও ছিলেন। তদুপরি নিজেই যেহেতু ব্রাহ্মণ, তাই ব্রাহ্মণদের প্রতি রাজাদের কী করণীয় কর্তব্য সেটা উল্লেখ করতে তিনি ভোলেননি। বিশেষ করে দানকর্ম। যেমন– (i) অব্রাহ্মণকে দান সমফল, ব্রাহ্মণব্রুবকে (যিনি ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেও ব্রাহ্মণের আচার-আচরণ পালন করেন না এবং নিজেকে ব্রাহ্মণ বলে শ্লাঘা করেন, তিনিই ব্রাহ্মণব্রুব) দানে দ্বিগুণ ফল, যে বেদাধ্যয়ন শুরু করেছে তাকে দানের ফল লক্ষগুণ, বেদে পারদর্শী ব্রাহ্মণকে দানের ফল অনন্ত। (ii) যুদ্ধে পরাজুখ না। হওয়া, প্রজাপালন ও ব্রাহ্মণ শুশ্রূষা রাজাদের যারপরনাই শ্রেষ্ঠ কাজ।
তাহলে এবার হাতে রইল নারী এবং শূদ্র। পৃথিবীর সব সুখ নিজেরাই যাতে ভোগ করতে পারেন তার জন্য যা যা করা উচিত সবই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ক্ষত্রিয় এবং ব্রাহ্মণ যেমন পালকের ভূমিকায়, তেমনিই নারী এবং শূদ্র শোষিতের ভূমিকায়। যাতে নারী এবং শূদ্রেরা মাথা-চোখ তুলে দাঁড়াতে না পারে, বিদ্রোহ করতে না পারে সেইসব ব্যবস্থাই বহাল রেখেছিলেন। অল্পকিছু নমুনা আমরা দেখে নিতে পারি। প্রথমেই নারীকে দেখে নেব মনুর চোখে। মনুর চোখে নারীগণ মানুষ পদবাচ্য নন। নারী সম্পর্কেও মনুর বিধান কঠোর ও বৈষম্যমূলক। যেমন– (ক) স্ত্রীলোক পতিসেবা করবে। তাঁর স্বাধীন কোনো সত্তা নেই। (খ) নারীকে কুমারী অবস্থায় পিতা, যৌবনে স্বামী, ও বার্ধক্যে পুত্র রক্ষা করবে। (গ) স্ত্রীলোকের পৃথক কোনো যজ্ঞ, ব্রত বা উপবাস বিধান নেই। (ঘ) স্ত্রীলোকের সাক্ষী হওয়ার বা স্বাধীনভাবে ঋণ করার অধিকার নেই। (ঙ) বিধবা সাধ্বী নারী ব্রহ্মচর্য পালন করবে। পড়ুন–
(১) স্ত্রী, পুত্র, ভৃত্য, শিষ্য এবং কনিষ্ঠ সহোদর ভ্রাতা অপরাধ করলে সূক্ষ্ম দড়ির দ্বারা কিংবা বেতের দ্বারা শাসনের জন্য প্রহার করবে।
“ভার্যা পুত্ৰশ্চ দাসশ্চ প্রেষ্যো ভ্রাতা চ সোদরঃ।
প্রাপ্তাপরাধাস্তাড্যাঃ স্যূ রজ্জ্বা বেণুদলেন বা।।” (৮/২৯৯)।
(২) পুত্র ও দাস– এরা তিনজনই ধনহীন; এরা তিনজনেই যা কিছু অর্থ উপার্জন করবে তা তাদের যে মালিক তারই হয়।
“ভার্যা পুত্ৰশ্চ দাসশ্চ ত্রয় এবাধনাঃ স্মৃতাঃ।
যৎ তে সমধিগচ্ছন্তি যস্য তে তস্য তদ্ধনম্।।” (৮/৪১৬)
(৩) বেশি নিদ্রা যাওয়া, কেবল বসে থাকার ইচ্ছা, শরীরকে অলংকৃত করা, কাম অর্থাৎ পুরুষকে ভোগ করার আকাঙ্ক্ষা, অন্যের প্রতি বিদ্বেষ, নীচ হৃদয়তা, অন্যের বিরুদ্ধাচরণ করা এবং কুচৰ্মা অর্থাৎ নীচ পুরুষকে ভজনা করা– স্ত্রীলোকদের এই সব স্বভাব মনু এদের সৃষ্টিকালেই করে গিয়েছে।
“শয্যাসনমলঙ্কারং কামং ক্রোধমনার্জ।
দ্রোহভাবং কুচৰ্য্যাঞ্চ স্ত্রীভ্যো মনুরকল্পয়ৎ।।” (৯/১৭)।
(৪) টাকাকড়ি ঠিকমতো হিসাব করে জমা রাখা এবং খরচ করা, গৃহ ও গৃহস্থালী শুদ্ধ রাখা, ধর্ম-কর্ম সমূহের আয়োজন করা, অন্নপাক করা এবং শয্যাসনাদির তত্ত্বাবধান করা- এই সব কাজে স্ত্রীলোকদের নিযুক্ত করে অন্যমনস্ক রাখবে।
“অর্থস্য সংগ্রেহে চৈনাং ব্যয়ে চৈব নিযোজয়েৎ।
শৌচে ধর্মেংন্নপ্যাঞ্চ পারিণাহ্যস্য বেক্ষণে।।” (৯/১১)।
এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। দিলে রচনাটি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হয়ে যাবে। যাঁরা আরও বেশি জানতে কৌতূহলী তাদের মনুসংহিতার নবম অধ্যায়টি মন দিয়ে পড়তে অনুরোধ করব। একই সঙ্গে এটাও উল্লেখ চাই, মনু তাঁর গ্রন্থে নারীদের বিষয়ে যেটুকু ভালো ভালো আপাত মঙ্গলদায়ক নির্দেশ দিয়েছেন, সেগুলি কোনোটাই নারীদের কথা ভেবে নয়, পুরুষদের কথা ভেবে। কারণ মনু পুরুষ ছিলেন। পক্ষপাতিত্বের শিরোমণি।
