সে যাই-ই হোক, প্রভূত স্ববিরোধিতা থাকলেও বলা যায় মনুই হলেন (সম্ভবত) ভারতবর্ষের প্রথম সুশৃঙ্খল এবং বিচক্ষণ প্রজাপালক বা শাসক, যিনি সুসংগঠিত রাষ্ট্রতন্ত্রের স্রষ্টা বা জনকও। রাষ্ট্রপরিচালনার লক্ষ্যে প্রাচীন ভারতবর্ষের প্রথম সংবিধানটি ইনিই প্রণয়ন করেছেন, যা মনুসংহিতা’ নামে পরিচিত। মনুসংহিতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে মনুবাবু খুব উঁচুতে রেখেছেন ক্ষত্রিয় বা শাসক বা রাজাকে এবং ব্রাহ্মণদের। সবচেয়ে নীচে রেখেছেন শূদ্র এবং নারীদের। ক্ষত্রিয় বা শাসক বা রাজাকে এবং ব্রাহ্মণদের উঁচুতে রাখার কারণ তিনি একাধারে ব্রাহ্মণ ও রাজা। শূদ্র এবং নারীদের নীচে রাখার রাখার কারণ শূদ্ররা ভারতবর্ষের বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী এবং নারীদের শক্তি উনি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। উনি বুঝতে পেরেছিলেন নারী অপ্রতিরোধ্য, দুর্দমনীয়, বিধ্বংসী। শূদ্র ও নারীদের মধ্যে অনুশাসনের ভীতি সঞ্চার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করাই ছিল শাসক তথা আইন-প্রণেতার উদ্দেশ্য। সেটাই স্বাভাবিক। প্রজাদের মনে ভীতি সঞ্চার করে রাষ্ট্র পরিচালনা করাই রাষ্ট্রপ্রধান মনুর কৌশল। সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকগণ দেশের আইন মানতে বাধ্য, ঠিক তেমনই মনুর যুগেও মনুসংহিতা নামক অনুশাসন বা আইন মানা বাধ্যতামূলক ছিল। অমান্য করলে হাত কেটে নেওয়া, পা কেটে নেওয়া, চোখ উপড়ে নেওয়া, শূলে চড়িয়ে হত্যা করা, হিংস্র পশুকে দিয়ে খাইয়ে দেওয়া ইত্যাদি পুরস্কার জুটত কপালে। বিদ্রোহ? এখনও হয়, তখনও হত। বিদ্রোহ দমনও হত অকথ্য পীড়ন দ্বারা। কেমন ছিল মনুর সংবিধান? এই সংবিধান যাতে সকলে অক্ষরে অক্ষরে মান্য করেন সেজন্য অনুশাসন যাঁরা প্রয়োগ করবেন তাঁরা কে সে বিষয়ে মনু নিপুণ হস্তে বর্ণনা করেছেন। প্রথমে আসি ব্রাহ্মণদের কথায়। কারণ মনু প্রথমে ব্রাহ্মণ, পরে রাজা। ব্রাহ্মণ কে সে বিষয়ে মনু কী জানিয়েছেন আমরা দেখব। মনুসংহিতার কাঠামো দ্বারা তিনি ব্রাহ্মণকে প্রকৃতপক্ষে দেবতার আসনে বসিয়ে একটি স্থায়ী বৈষম্যপূর্ণ ধর্ম প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছেন। প্রতিটি বিধানের কেন্দ্রবিন্দুতে ব্রাহ্মণ। তাঁর স্বার্থকে রক্ষা, সংহত করার নিরঙ্কুশ করাই হচ্ছে মনুর একমাত্র উদ্দেশ্য। এর জন্য যত ধরনের নিষ্ঠুরতা দরকার মনু তা অনায়সেই করেছেন। শুরু করেছেন চারবর্ণের অলৌকিক ও অবিশ্বাস্য জন্ম কাহিনি দিয়ে। মনু বলছেন–
(১) “উত্তমাঙ্গোদ্ভবাজ্জৈষ্ঠ্যাদব্ৰহ্মণশ্চৈব ধারণাৎ।
সর্বস্যৈবাস্য সর্গস্য ধর্মততা ব্রাহ্মণঃ প্রভুঃ”(১/৯৩)।
অর্থাৎ, ব্রহ্মার উত্তমাঙ্গ বা মুখ থেকে উৎপন্ন বলে বর্ণচতুষ্টয়ের মধ্যে বলে এবং বেদ ধারণের কারণে ধৰ্মত ব্রাহ্মণ এই সমগ্র সৃষ্টির প্রভু।
(২) “ভূতানাং প্রাণিনঃ শ্ৰেষ্ঠাঃ প্রাণিনাং বুদ্ধিজীবিনঃ।
বুদ্ধিমৎসু নরাঃ শ্ৰেষ্ঠা নরেষু ব্রাহ্মণাঃ স্মৃতাঃ”।। (১/৯৬)
অর্থাৎ, সৃষ্ট (স্থাবর জঙ্গমাদির মধ্যে) প্রাণী শ্রেষ্ঠ, প্রাণীদের মধ্যে বুদ্ধিজীবীরা শ্রেষ্ঠ, বুদ্ধিমানদের মধ্যে মানুষ এবং মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ বলে কথিত।
(৩) “উৎপত্তিরেব বিপ্রস্য মূর্তিধর্মস্য শাশ্বতী।
স হি ধর্মার্থমুৎপন্নো ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে”।। (১/৯৮)
অর্থাৎ, ব্রাহ্মণের দেহই ধর্মের সনাতন মূর্তি। তিনি ধর্মের জন্য জাত এবং মোক্ষলাভের যোগ্য পাত্র।
(৪) “ব্রাহ্মণো জায়মানো হি পৃথিব্যামধিজায়তে।
ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং ধর্মকোষস্য গুপ্তয়ে”।। (১/৯৯)
অর্থাৎ, জাতমাত্রেই ব্রাহ্মণ পৃথিবীতে সকল লোক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হন এবং সকল সৃষ্ট পদার্থের ধর্মসমূহ রক্ষার জন্য প্রভু হন।
(৫) “সর্বং স্বং ব্রাহ্মণেসেদ্যং যৎকিঞ্চিৎজ্জগতীগতম।
শ্রৈষ্ঠেনাভিজনেনেদং সর্বং বৈ ব্রাহ্মণোহহতি”। (১/১০০)
অর্থাৎ, পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সেই সব ব্রাহ্মণের সম্পত্তি। শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্য হেতু ব্রাহ্মণ এই সবই পাওয়ার যোগ্য।
(৬) “স্বমেব ব্রাহ্মণ্যে ভুঙতে স্বং বস্তে স্বং দদাতি চ।
আনৃশংস্যাদব্রাহ্মণস্য ভুঞ্জতে হীতরে জনাঃ”।। (১/১০১)
অর্থাৎ, ব্রাহ্মণ নিজের অন্নই ভক্ষণ করেন, নিজের বস্ত্র পরিধান করেন এবং নিজের দ্রব্য দান করেন। অন্য লোকেরা যা ভোগ করে, তা ব্রাহ্মণের দয়া হেতু করে।
কী বুঝলেন বন্ধু? ব্রাহ্মণদের আসন পাকা, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। আসুন, এবার। দেখব রাজা কে? রাজার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তটা কেমন সেটাও দেখে নিতে পারি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যাঁরা ছাত্র তাঁরা জানেন রাষ্ট্রর উৎপত্তির বিষয়ে ঐশ্বরিক মতবাদ। যাঁরা জানেন না তাঁদের জন্য বিষয়টি পুনরায় উল্লেখ করলে অত্যুক্তি হবে না বোধকরি। প্রাচীনকালে রাষ্ট্রের ঐশ্বরিক মতবাদ বহুল প্রচলিত ছিল। মধ্যযুগে সেন্ট অগাস্টাইন, সেন্ট পল, সেন্ট টমাস অ্যাকুইনাসের লেখনীতে এই মতবাদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে ১৬৮৮ সালের ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লবের পর থেকে এই মতবাদের গুরুত্ব হ্রাস পেতে শুরু করে। ঐশ্বরিক মতবাদের মূল বক্তব্য ছিল —
(১) রাষ্ট্র ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন। এই সৃষ্টির পিছনে মানুষের কোনো ভূমিকা নেই।
(২) রাজা হলেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি। তাই ঈশ্বরের ইচ্ছা রাজার মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়। সেইজন্য রাজার আদেশ বা নির্দেশ, যা আইনরূপে গণ্য হয়ে থাকে, তা মান্য করা সকল মানুষের একান্ত কর্তব্য। রাজার আইন মান্য না করার অর্থ হল ঈশ্বরকে অবমাননা করা।
