পুরাণ মত অনুযায়ী মনু ব্ৰহ্মার দেহ থেকে তৈরি হয়েছেন। সুতরাং, পৃথিবীতে ভগবান ব্রহ্মার একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন মনু। যাকে স্বায়ম্ভব মনু বলা হয়। তবে জানা গেছে ব্রহ্মার ইচ্ছায় ১৪ জন মনু [স্বায়ম্ভব (ব্রহ্মা ও গায়ত্রী থেকে সম্ভূত),স্বরোচিষ, উত্তম, তামস, রৈবত, চাক্ষুষ, বৈবস্বত বা সত্যব্রত,সাবর্ণি, রোচ্য, ভৌত, মেরূ সাবৰ্ণি,ঋভু, ঋতুধামা, বিস্বব] জন্ম নিয়েছেন এবং এদের সবাই ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছেন। স্বায়ম্ভুব মনু ব্ৰহ্মার কাছ থেকে স্মৃতিশাস্ত্র পাঠ করা শিখে তা তার শিস্যদের তা পাঠ করান। পরবর্তীতে ভৃগু নামে একজন মনুর আদেশে এই ধর্মশাস্ত্র ঋষিদের কাছে ব্যাখা করেন। যা এখন ‘মনুসংহিতা নামে পরিচিত। এই মনুসংহিতাই ব্রাহ্মণ্যবাদের আকরগ্রন্থ, প্রাণভোমরা। বলা হয় বেদের পরে মনুসংহিতা সৃষ্টি হয়েছে। ভগবান ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভুব মনুর দেখানো পথ অনুসরণ করে বাকি ১৪ জন মনু এই শাস্ত্র ধারণ ও পরিবর্ধন করেছেন। মুলত “ভগবান ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভুব মনু” এর বর্ণিত শ্লোকগুলিই বাকি মনুরা সম্পাদনা ও টীকা বা ব্যাখ্যা যোগ করেছেন এবং কিছু কিছু আইন ও আচরণ পদ্ধতির প্রবর্তন করেছেন। এরকমই একটা পরিচয় অনেকেই বিশ্বাস করেন।
এখন প্রশ্ন হল মনু কি সত্যিই ‘ভগবান’ ছিলেন? আমরা এ লেখার পরতে পরতে দেখতে চেষ্টা করব মনু কেমন ভগবান ছিলেন। মনুসংহিতার পাতাতেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারি। উত্তর সেখানেই লুকিয়ে আছে। বস্তুত মনু ছিলেন একজন শাসক বা রাজা, ব্রাহ্মণ-শাসক –ভগবান কখনোই নয়। ভগবান যে নয়, তার প্রমাণ মনুর সৃষ্টিতত্ত্ব। সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি তিন জায়গায় তিন রকম বর্ণনা করেছেন। পড়ুন–
(১) মনুসংহিতার প্রথম অধ্যায়ের পঞ্চম থেকে উনিশতম শ্লোকে সৃষ্টিতত্ত্বে। বলছেন, আদিতে এই বিশ্ব অন্ধকারময় ছিল, তার অস্তিত্ব বোঝা যেত না, কোনো কিছুরই লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন ছিল না, প্রমাণগ্রাহ্য ছিল না। সব কিছু ছিল অবিজ্ঞেয়। যেন সবদিকে প্ৰসুপ্ত, তারপর অপ্রতিরোধ্য শক্তিসম্পন্ন অন্ধকারনাশক ভগবান স্বয়ংভূ স্বয়ং অব্যক্ত থেকে পঞ্চমহাভূতাদি সকল পদার্থকে ব্যক্ত করলেন। ইন্দ্রিয়ের অগোচর সূক্ষ্ম, সনাতন, সর্বভূতময়, অচিন্তনীয় তিনি নিজেই উদ্ভূত হলেন। তিনি নিজের শরীর থেকে বিবিধ জীব সৃষ্টি করতে ইচ্ছুক হয়ে ভেবে ভেবে প্রথমে জল সৃষ্টি করে তাতে তাঁর বীজ আরোপিত করলেন। সেই বীজ সূর্যতুল্য প্রভাবিশিষ্ট স্বর্ণডিম্বে পরিণত হল। তাতে সমগ্র জগতের পিতামহ ব্রহ্মা স্বয়ং জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর প্রথম বাস ছিল জলে, জলকে যেহেতু নারা বলে অভিহিত করা হত সেইহেতু তাঁকে বলা হত নারায়ণ (নারা + অয়ন বা আশ্রয়)। সেই-ই প্রথম কারণ, যা অব্যক্ত এবং যা সৎও বটে, অসৎও বটে। তার থেকে উদ্ভূত পুরুষকেই লোকে ব্ৰহ্মা বলে। সেই অণ্ড বা ডিম্বে ভগবান এক বছর বসবাস করে তাকে দ্বিধা বিভক্ত করলেন, সেই দুই ভাগ থেকে তিনি সৃষ্টি করলেন স্বর্গ এবং মর্ত। তাদের মাঝখানে অন্তরিক্ষ, আট দিক্ এবং সমুদ্র [আধুনিক ভূতত্ত্ববিদদের মতে একদা পৃথিবী দু-ভাগে বিভক্ত ছিল– (i) সমুদ্র বা জলভাগ, যা ‘প্যানথালাসা’ নামে চিহ্নিত এবং (ii) স্থলভাগ, যা ‘প্যানজিয়া’ নামে চিহ্নিত]। নিজের থেকেই তিনি মন উদ্ধৃত করলেন– তা সৎ বটে, অসৎও বটে। মন থেকে উদ্ভূত হল অহংকার এবং মহাত্মা, সত্ত্বাদি ত্রিগুণাত্মক সবকিছু, পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়। অহংকার ও পঞ্চতন্মত্রের সূক্ষ্ম উপাদান নিজের অংশের সঙ্গে মিশিয়ে তিনি সমস্ত জীব সৃষ্টি করলেন। পঞ্চমহাভূত সকল জীবের স্রষ্টার মধ্যে প্রবিষ্ট হন।
(২) মনুসংহিতা বা মনুস্মৃতির প্রথম অধ্যায়ে বত্রিশতম থেকে একচল্লিশতম শ্লোকে মনু বলছেন, ব্রহ্মা স্বদেহকে দ্বিধা বিভক্ত করলেন –একভাগ হল পুরুষ, অপরভাগ নারী। সেই নারীর থেকে তিনি সৃষ্টি করলেন বিরাজ। এই বিরাজ তপস্যা করোন্তর একটি পুরুষ সৃষ্টি করলেন; এই পুরুষই “মনুসংহিতা”-র প্রবক্তা মনু। জীবসিসৃক্ষু মনু প্রথমে সৃষ্টি করলেন প্রজাপতি স্বরূপ দশজন মহামুনিকে। তাঁরা সৃষ্টি করলেন সপ্তমনু, বিভিন্ন শ্রেণির দেবগণ, মহান ঋষি, যক্ষ, রাক্ষস, গন্ধর্ব, অপ্সরা, সর্প, বিহঙ্গ, বিভিন্ন শ্রেণির পিতৃগণ, বিদ্যুৎ, মেঘ, ক্ষুদ্র-বৃহৎ নক্ষত্ররাজি, বানর, মৎস্য, গোমহিষাদি, হরিণ, মানুষ, কীট, মক্ষিকা ও স্থাবর বৃক্ষাদি।
(৩) মনুসংহিতা বা মনুস্মৃতির প্রথম অধ্যায়ে চুয়াত্তরতম থেকে আটাত্তরতম শ্লোকে মনু বলছেন, সুপ্তোত্থিত ব্রহ্মা তাঁর মন সৃষ্টি করলেন। ব্রহ্মার সিসৃক্ষার প্রেরণায় উদ্ভূত হল শব্দগুণ আকাশ, আকাশের বিকৃতি থেকে সৃষ্ট হল স্পর্শগুণ বায়ু, বায়ু থেকে উদ্ভব দীপ্তিময় আলোকের, যার থেকে প্রাদুর্ভাব হল জলের, জল থেকে উৎপত্তি হল গন্ধযুক্ত ক্ষিতি বা মাটির।
অতএব ‘ভগবান’ হলে এমন তথ্যগত ভুল কখনোই হত না। মানুষ বলেই এমনটা হয়। ভুল মানুষের হয়। সময়ে পরিপ্রেক্ষিতে সে সময়ে মানুষের জ্ঞান ছিল সীমিত। তথাকথিত ধর্মগ্রন্থগুলি মানুষের লেখা বলেই এত ভুল আর বিভ্রান্তি। ঈশ্বর বা ভগবানের নামে চালালেই তো হল না। নির্ভুল হতে হয়। মানুষের পক্ষে কখনোই নির্ভুল হওয়া সম্ভব নয়। সেই সময়ে মানুষের যেটুকু জ্ঞানের পরিধি ছিল, সেই জ্ঞানের পরিধিতেই লিখেছে। মনুও ব্যতিক্রম নয়। আসল উদ্দেশ্য শোষণ ও শাসন করা। সেটা সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছে, সেটাই বড়ো কথা।
