ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে যে বদনামগুলি সর্বজনবিদিত, সেগুলি কি অনর্থক?– (১) লাখ টাকার ব্রাহ্মণ ভিখারি। (২) খাদ্য-লোভী ব্রাহ্মণ। এ কথাগুলি ব্রাহ্মণদের কতটা সম্মান প্রদর্শন করে! যজমানদের বাড়িতে গিয়ে ব্রাহ্মণদের হামলা হামলি করাই লাখ টাকার ভিখারি প্রতিপন্ন হল। কিছু সুবিধাবাদী ধান্ধাবাজ ব্রাহ্মণ রাজানুগত্য পেয়ে রসেঘিয়ে থাকলেও অধিকাংশ ব্রাহ্মণদের হাল মোটেই ভালো ছিল না। কারণ শাস্ত্রানুযায়ী ব্রাহ্মণগণ যজন-যাজন, অধ্যয়ন-অধ্যাপনা নিয়ে থাকবে, পরের চাকরি করবে না, কৃষিকার্য করবে না এবং রাজবাড়ি বা ধনীদের গৃহে-দপ্তরে খিদমদগারির মাধ্যমে অর্থোপার্জন করবে না। ব্রাহ্মণ হয়ে অন্য উপায়ে টাকাপয়সা করলে সমাজ নিন্দা করে। সবচেয়ে ঘৃণা করা হত রাজবাড়ির অর্থপুষ্ট ব্রাহ্মণকে। তা সত্ত্বেও ব্রাহ্মণগণও অন্য পেশায় নিযুক্ত না হয়ে নিজেদের রক্ষা করতে পারল না। পেট বড়ো বালাই। বামনাইগিরির নিকুচি করেছে! অবশেষে মরা পোড়ানোর (ডোমের চাকরি!) চাকরি হলেও আবেদনপত্র প্রেরণ। রিক্সা চালানো, মোট বওয়া, জুতো পালিশ করা –এরকম সব কাজেই ব্রাহ্মণদের উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে।
ব্রাহ্মণদের খাওয়াতে পারলে যজমানরা যেমন খুশি হন, তেমনি ব্রাহ্মণগণও যারপরনাই খুশি হন। সঙ্গে সন্তুষ্টজনক দক্ষিণা তো আছেই। তাই আজও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য এবং অবজ্ঞা-ভরে হলেও কোনো অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণভোজন করানোর রীতি চালু আছে। কেননা —
“মুখ না থাকায় প্রেতাত্মা ব্রাহ্মণের মুখে করে যে ভোজন।
ব্রাহ্মণ ভোজন না করালে প্রেতাত্মা করে যে রোদন।।
মনুসংহিতার ১/৯৫ নং শ্লোকে যে বিধান আছে, তা দেখব —
“যস্যাস্যেন সদাশ্নতিহব্যানি ত্রিদিবৌকনঃ।
কব্যানি চৈব পিতরঃ কিস্তুতমধিকং ততঃ”।
অর্থাৎ, বাস্তবিক স্বর্গবাসী দেবগণও যাঁর মুখে হবনীয় দ্রব্য সামগ্রী সবসময় ভোজন করে থাকেন, শ্রাদ্ধাদিতে প্রদত্ত অন্নাদি পিতৃগণ যাঁর মুখে গ্রহণ করেন,সেই ব্রাহ্মণ অপেক্ষা অধিকতর শ্রেষ্ঠ এই পৃথিবীতে আর কেই-বা আছেন। তাই “তুষ্যন্তি ভোজনৈর্বিপ্রা ময়ূরাঃ ঘনগর্জিতৈঃ” এবং অবশ্যই “নৃত্যন্তি ভোজনৈর্বিপ্রা”।
শাস্ত্রমতে কর্মের ভিত্তিতে চার বর্ণে ভাগ করা হয়েছে। ব্রহ্ম সম্পর্কে জ্ঞান। অর্জনকারীরাই ব্রাহ্মণ। এখনকার সব পুরোহিতকে কে ব্রাহ্মণ বলছেন! আর বললেও কোন্ যুক্তিতে বলছেন? সব ব্রাহ্মণ কিন্তু পুরোহিত নয়। পুরোহিত এবং ব্রাহ্মণ আলাদা ব্যাপার। তবে আপনি যদি কোনো পুরোহিতকে জিজ্ঞাসা করেন তবে দেখবেন তাঁরা নিজেদের ব্রাহ্মণ বলে পরিচয় দেন। আর তাঁরা তাঁদের বর্ণের পরিচয় এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে, কারও হাতের অন্নগ্রহণকে পাপ বলে মনে করেন। যা হাস্যকর একটি ব্যাপার! একজন জ্ঞানী ব্যক্তির কাছ থেকে কেউই এই ধরনের ব্যবহার আশা করে না। আগেই বলেছি, জন্মগতভাবে তো কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারে না। এটা শুধুমাত্র একটা পদ বলতে পারেন। যেমন শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এরকম! যোগ্যতার ভিত্তিতে! রামায়ণ, মহাভারত গ্রন্থগুলিতে লক্ষ করলেই আমরা তা জানতে পারব। ব্রাহ্মণ হল ব্ৰহ্ম সম্পকে জ্ঞান অর্জনকারী। আমি যতটুকু জানি, কোনো নির্দিষ্ট দু-একটি গ্রন্থ পড়ে ব্ৰহ্ম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। যাঁরা একটি ধর্মের শাস্ত্রীয় গ্রন্থের নাম বলতে অক্ষম, তাঁদের ব্রাহ্মণ বলার যুক্তি কোথায় আমি বুঝি না!
হলায়ুধ, যিনি লক্ষ্মণসেনের সমসাময়িক এবং তাঁর যুগের প্রধান স্মৃতিকার ছিলেন। তাঁর ব্রাহ্মণসর্বস্ব গ্রন্থরচনার সমর্থনে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, রাঢ় ও বরেন্দ্র ব্রাহ্মণরা বেদ পাঠ করে না। ফলে তাঁরা বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানের নিয়মাবলির সঙ্গে পরিচিত নয়। তাতে কী হয়েছে? ব্রাহ্মণ্যবাদ জাঁকিয়ে বসেছে এখানেও।
ব্রাহ্মণ্যবাদ মুক্ত একটা সমাজ চাই। পৌরহিত্যই ভারতের সর্বনাশের মূল। পুরোহিতগিরি পেশাকে নির্মূল করতে না-পারলে তোক ঠকাবার ব্যাবসা বন্ধ হবে না। সমাজ থেকে পুরোহিতগিরি বর্জন করতে হবে। পুরোহিতদের প্রত্যাখ্যান করেই বিয়ে, অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধাদি অনুষ্ঠান করা শুরু করতে হবে। সংস্কৃত ভাষার মোহ ত্যাগ করে বাংলায় প্রার্থনা করুন। ঈশ্বর অবশ্যই শুনবেন এবং মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। ডঃ আম্বেদকরের বক্তব্য যথার্থ –“ধূর্ত ব্রাহ্মণরা শাস্ত্র রচনা করে হিন্দুদেরকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে একেবারে বোকা বানিয়ে ফেলেছে।” অতএব পুরোহিত বর্জন।
এ প্রবন্ধ ব্রাহ্মণ-বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দেয় না এবং অবশ্যই ব্রাহ্মণ্যবাদের তীব্র বিরোধিতা করছি। যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিগণ প্রচলিত শ্রাদ্ধ না করে শুধু শ্রদ্ধাই জানান, বাকি সব বর্জন করুন। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর বাণী ও রচনার দশম খণ্ডে লিখলেন, “মৃত্যুর পর মানুষ স্বর্গে যায় এটা কল্পনামাত্র। সজ্জন ব্যক্তি মৃত্যুর পর স্বর্গে গিয়া অনন্ত সুখময় জীবনযাপন করে– এই ধারণা স্বপ্নমাত্র। স্বর্গ ও নরক এসব আদিম ধারণা।” ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকলে আপনার মাতৃভাষায় নিজেরাই তার কাছে প্রার্থনা জানানো যায়। হিন্দুধর্মকে রক্ষা করতে চাইলে অবিলম্বে ব্রাহ্মণ্যবাদের নিষ্পত্তি করতে হবে। স্বামী বিবেকানন্দের নাম ভাঙিয়ে যাঁরা নানা কিছু করেন, তাঁরা সোচ্চারে বলুন এবং অক্ষরে অক্ষরে পালন করুন। কী বলবেন? পড়ন, স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর “জাতি, সংস্কৃতি ও সমাজ” গ্রন্থে যা বলেছেন– “পৌরহিত্যই ভারতের সর্বনাশের মূল। যেখানেই পুরোহিততন্ত্রের আবির্ভাব, সেখানেই ধর্মের গ্লানি। …এসো মানুষ হও। প্রথমে দুষ্টু পুরুতগুলোকে দূর করে দাও। কারণ এই মস্তিষ্কহীন লোকগুলো কখনও শুধরোবে না। …আগে তাঁদের নির্মূল করো।”
মনু, মনুসংহিতা এবং হিন্দুবাদের ভারতবর্ষ
ঋগবেদে মনুকে মানবজাতির পিতা বলা হয়েছে। তিনি আদিত্য বিবস্বতের পুত্র বলে বিবস্বান, স্বয়ম্ভু ব্ৰহ্মার পুত্র বলে স্বায়ম্ভুব মনু, যাস্কের নিরুক্তে মনু দুস্থানীয় দেবতা, তৈত্তিরীয় সংহিতায় মনু এক পরিবারের পিতা, শুক্ল যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে সুপ্রসিদ্ধ মনুমৎস্যকথা অংশে তিনি মানবজাতির সৃষ্টিকর্তা। তিনি মানবজাতির পিতা, তাই তিনি নৈতিক ও সামাজিক আদর্শের প্রবর্তক –মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি, যজ্ঞানুষ্ঠানের সৃষ্টিকর্তা, শাসক ব্যবহার বিষয়ে প্রামাণ্য ব্যক্তি, মহর্ষি, বেদবিদ্যায় বিদ্বান, পৃথিবীর উৎপত্তি-স্থিতি-প্রলয়ের কারণ তিনি জানেন।
