অথচ ভাবুন ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় রাজনীতি থেকে উদ্ভূত প্রভাব প্রবল বাধাগ্রস্ত হয়েছিল সপ্তম থেকে নবম শতকের মধ্যে। এ পর্বে ‘ভক্তিবাদ আন্দোলন গড়ে উঠে গোটা ভারতবর্ষে। ভক্তিবাদীরা প্রত্যাখ্যান করেন ব্রাহ্মণদের বর্ণবাদী শ্রেষ্ঠতের ধারণা। এতে ধ্বনিত হয় সামাজিক প্রতিবাদের সুর। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা ব্রাহ্মণ্য রাজনীতির সঙ্গে শেষপর্যন্ত টিকতে না-পারলেও “ভক্তিবাদ’ আন্দোলনই সনাতন ভক্তদের মনে জন্ম দেয় বর্ণবাদ এবং বর্ণশ্রেষ্ঠতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার।
বললে অত্যুক্তি হবে না যে, ভারতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্মের আগ্রাসনে আক্রমণে-অত্যাচারে বারবার বিপন্ন-বিপর্যস্ত হয়েছে সনাতন ধর্ম তথা ব্রাহ্মণ্যধর্ম তথা হিন্দুধর্ম। ব্রাহ্মণগণ বিপন্নতা থেকে মুক্তি পেতে ধর্মীয় অনুশাসনগুলিকে আরও কঠোর থেকে কঠোরতম করতে গিয়ে হিন্দুধর্মের সর্বনাশ করেছে। ব্রাহ্মণগণের অমানবিক বিধানে জর্জরিত হয়ে তথাকথিত নীচুতলার মানুষগুলো দলে দলে কেউ মুসলমান, কেউ খ্রিস্টান, কেউ বৌদ্ধ হয়ে গেছে। কখনো শুনিনি অন্য কোনো ধর্মের মানুষ হিন্দুধর্মকে ভালোবেসে হিন্দু ধর্মাচরণ করছে। খানখান হয়েছে ব্রাহ্মণ্যবাদ কঠোরতার কারণেই। বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো। পরবর্তীকালে কেরলিয়ান ব্রাহ্মণ শঙ্করাচার্য (আদি) নরমে-গরমে একবার চেষ্টা করেছিলেন এবং সফল হলেন ভারতে ব্রাহ্মণ্যশাসন কায়েম করতে। এ ছাড়া বিভেদনীতির মাধ্যমে ক্ষত্রিয়শক্তিকে দুর্বল করে তোলেন। ফলে অতি সহজেই মুসলমান শক্তি ভারতে দ্রুত প্রসার লাভ করে। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বৌদ্ধধর্মকে প্রায় শেষ করে দিতে সক্ষম হলেও অষ্টাদশ শতাব্দী নাগাদ ব্রাহ্মণদের চক্রান্তে এবং সহায়তায় মুসলমান শক্তিকে পরাভূত করতে ভারতে ব্রিটিশ শাসন কায়েম হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই বেনিয়া-নেতা গান্ধিজিকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ভারতের শাসনক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে প্রয়াসী হন। সেই বিষয়টি ব্রিটিশপুঙ্গবগণ আন্দাজ করতে পেরে তার সদব্যবহার করেছিল। দ্বিজাতিতত্ত্বের আঁতুরঘর এখান থেকেই। মোদ্দা কথা, ব্রাহ্মণ্যবাদের জাঁতাকলে পড়ে হিন্দুধর্ম আজ বিপন্ন, বিপর্যস্ত, ছিন্নভিন্ন। প্রাচীন যুগ থেকেই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। জন্ম নিয়েছে বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্মের মতো ধর্মবাদ। ব্রাহ্মণ্যবাদের অস্পৃশ্যতা এবং প্রাণীহত্যাকে হাতিয়ার করে ব্রাহ্মণ্যবাদকে নিকেশ করতে উঠেছিল বৌদ্ধধর্ম। বিশেষ করে ভারতবর্ষের অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষরা ব্রাহ্মণ্যবাদের অনুশাসনের নামে অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পেতে দলে দলে বৌদ্ধধর্মে চলে আসতে থাকলেন। ভীত-সন্ত্রস্ত ব্রাহ্মণবাদের পুরোধারা কখনো বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে অস্ত্র শানালেন, কখনো-বা কৌশল অবলম্বন করে বৌদ্ধদের ভারত থেকেই প্রায় উৎখাত করে দিলেন। এই বৌদ্ধদের ঠান্ডা করতে ডাণ্ডা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন কেরলের ব্রাহ্মণ শংকরাচার্য এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গো-শাগরেদরা। বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণ্য-সন্ত্রাস চালিয়েও বৌদ্ধদের যখন দমানো গেল না তখন কৌশলে ঘোষণা করে দেওয়া হল বৌদ্ধধর্মও যা, হিন্দুধর্মও তাই এমন একটা অবস্থা তৈরি করে নিল। কারণ ভগবান বুদ্ধদেব বিষ্ণুর দশমাবতারের এক অবতার (যথাক্রমে মৎস্যাবতার, কূর্মাবতার, বরাহ অবতার, নৃসিংহ অবতার, বামনাবতার, পরশুরাম, শ্রীরাম, কৃষ্ণাবতার, বুদ্ধদেব, কল্কি)। এরপর বেশ কিছুকাল ভালোই কাটছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের অনুশাসন। শুরু হয়ে গেল সুদূর আরব থেকে মুসলিমদের ভারতে আগমন এবং আগ্রাসন। একে একে হিন্দু রাজাদের পরাস্ত এবং সিংহাসনচ্যুত করে মুসলিম শাসন শুরু হয়ে যায়। তারপর ৭০০ বছর ব্রাহ্মণ্যবাদ কোণঠাসা। চরম অবক্ষয় দৃশ্যমান হয়। ব্রাহ্মণ্যবাদকে অস্বীকার করা শুরু হল গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে। অন্ত্যজ শ্রেণি তো বটে, উচ্চবর্ণের অনেক মানুষও ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হতে থাকল। আবার অস্তিত্বের বিপন্নতা। আরবি-ফারসি ভাষা শিখতে বাধ্য হল সবাই। ভারতবর্ষে মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তেই থাকল। দ্বিতীয় প্রধান ধর্মীয় শক্তি হয়ে উঠল। এরই মধ্যে ভারতবর্ষে পোর্তুগিজ, ফরাসি, ব্রিটিশদের বণিকরূপে আবির্ভূত হয়ে অবশেষে হাতে উঠে এল শাসকের দণ্ড। শুরু হয়ে গেল নতুন অধ্যায়– ব্রিটিশশাসন। সেইসঙ্গে খ্রিস্টধর্মের আবির্ভাব– মিশনারিদের প্রভাবে আবার ধর্মান্তরকরণ। তবে খ্রিস্টধর্ম নয়, ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে রইল ইসলাম ধর্ম। অতএব খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে পীড়িত বাড়িয়ে মুসলিম বিরোধিতায় পরোক্ষে-প্রত্যক্ষে ব্রিটিশদের ইন্ধন জোগানো। দ্বিজাতিতত্ত্ব খাঁড়া করে টুকরো টুকরো হয়ে গেল আমাদের সাধের স্বাধীন ভারত, ধর্মের ভিত্তিতে। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদ আর উঠে দাঁড়াতে পারল না। শত বিভক্ত হয়েই রইল। এই ব্রাহ্মণবাদকে উৎখাত না-করলে হিন্দুধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে না। হিন্দুত্ববাদীরা শূদ্র, দলিত, অন্ত্যজদের হিন্দুভুক্তি করে না, যারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীকে বাইরে রেখে কখনো কোনো ধর্ম শক্তিশালী হতে পারে? একদা যে দেশ বৌদ্ধদের ছিল, সেই দেশ ব্রাহ্মণ্যবাদীরা কজা করে নিলেও একছত্র হতে পারল না। ভারতের সকল মতবাদকে এক ছাতার তলায় আনতে পারল না, যেটা আরবে হজরত মোহম্মদ সফলতার সঙ্গে পেরেছিল।
