প্রকৃত ব্রাহ্মণ তৃষ্ণামুক্ত : যিনি বন্ধনমুক্ত, অনাশ্রব, কামচিন্তা বিরহিত তিনিই তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ নামের যোগ্য। ব্রাহ্মণ ধ্যানী, একক বিচরণশীল, বস্তুকাম ও ক্লেশকাম পরিহার করে চলেন। যিনি সর্ব সংযোজন ছিন্ন করে ভয়মুক্ত, অনাসক্ত, শৃংখলামুক্ত তিনিই তৃষ্ণাক্ষয়ী ব্রাহ্মণ। ক্রোধপূর্ণ, জটাধারী, অজিনচর্ম পরিহিত ব্যক্তি ব্রাহ্মণের যোগ্য হতে পারে না। ক্রোধবিহীন, ব্রতপরায়ণ, শীলবান, সংযমী ও অন্তিম দেহদারী ব্যক্তি তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ বলে যোগ্য হন। যিনি গৃহস্থ ও অনাগরিক উভয়ের প্রতি অসংশ্লিষ্ট অল্পেচ্ছ ও আলয়বিহীন তিনিই তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ। যিনি ছোটো-বড়ো সর্বপ্রকার অদত্ত গ্রহণে বিরত, যার কোনো প্রকার তৃষ্ণা বিদ্যমান নেই যিনি সংশয়মুক্ত ও নির্বাণ প্রাপ্ত তিনিই ব্রাহ্মণ।
জাত্যাভিমানী প্রকৃত ব্রাহ্মণ : তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণেরা অভিমান বা অহংকার করে নিজের গৌরব করে বলত তারাই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে জাতি অভিমান ব্রাহ্মণের কাজ নয়। কারণ জাতি হিসাবে মানুষ মানুষের কোনো পার্থক্য নেই। তঙ্কালীন মানবজাতির মধ্যে ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শুদ্রের পদচিহৃ একই ধরনের। কিন্তু হাতি, ঘোড়া, বাঘ প্রভৃতি প্রাণীদের মতো মানুষ মানুষের মতো পার্থক্য দেখা যায় না। প্রাণীদের মধ্যে স্ত্রী, পুরুষ, বর্ণ, শারীরিক গঠন, লোম, চঞ্চু, প্রভৃতি পার্থক্য আছে। কিন্তু মানুষ মানুষে তেমন পার্থক্য দেখা যায় না। বুদ্ধ মতে, যে-কোনো ব্যক্তি সৎকর্ম করলে ব্রাহ্মণের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেন। সভাব ও কৃচ্ছসাধনের দ্বারা যে-কোনো লোক ব্রাহ্মণ অর্জন করতে পারেন।
ধ্যানীপরায়ণ প্রকৃত ব্রাহ্মণ : পণ্ডিতগণ বলেছেন, বনের প্রাণীরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। ঠিক তেমনি প্রকৃত শ্ৰমণ বা ব্রাহ্মণ ধ্যানপরায়ণ হলে শোভা পায় এবং অনাসক্ত, নিষ্কলুষ, রজযুক্ত লোভ-দ্বেষ-মোহবিহীন হয়। দিনেরবেলায় সুর্য আলো দিয়ে দিনের শোভা বৃদ্ধি করে, রাতের বেলায় চন্দ্র প্রদীপ্ত হয়ে রাতের শোভা রক্ষা করে এবং সৈন্য, সামন্ত, অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত হলে রাজার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। সেরূপ প্রকৃত শ্ৰমণ বা ব্রাহ্মণ ধ্যানপারয়ণ হলে শোভিতক হয়। বুদ্ধ নিজের জ্ঞানের প্রতিভায় দিন-রাত্রি প্রদীপ্ত হন। শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ পাপ পুণ্য ধ্যানরত হয়ে প্রকৃত প্রব্রজিত নামে অভিহিত হন।
পুরাণ মতেও ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্ত হলেই কেবল ব্রাহ্মণত্ব অর্জিত হয়। তারপরও সনাতন ধর্ম যুগ যুগ ধরে চতুর্বর্ণভেদ টিকে ছিল প্রায় হাজার বছর ব্যাপী। তবে ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় চাতুরি কার্যকারিতা হারাতে থাকে উনিশ শতকের শেষের দিকে। ব্রাহ্মণ্যবাদ থেকে উদ্ভূত কয়েকটি কদাচার-কুৎসিত সংস্কারের পর থেকেই এই অবরোহণের শুরু। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সহ প্রমুখ প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বের সংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মণরা ক্ষমতা হারাতে শুরু করেন। এই শতকে নেওয়া দেবদাসী প্রথার আইনানুগ অবসান, সতীদাহ প্রথা নিবারণ, বিধবা-বিবাহের প্রচলন, কৌলীন্য প্রথার বিলোপ, ব্রাহ্মধর্ম প্রবর্তন এবং ছুৎমার্গের বাড়াবাড়ি অনেকটা কমে আসা থেকে ব্রাহ্মণদের খর্বতা শুরু হয়েছিল। কেন ব্রাহ্মণদের এরকম খর্ব শুরু হয়েছিল? কেন ব্রাহ্মণদের সম্মান নষ্ট হতে শুরু করল? কবে থেকে?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ব্রাহ্মণ’ প্রবন্ধে লিখছেন, “ব্রাহ্মণও যখন আপন কর্তব্য পরিত্যাগ করিয়াছে, তখন কেবল গায়ের জোরে পরলোকের ভয় দেখাইয়া সমাজের উচ্চতম আসনে আপনাকে রক্ষা করিতে পারে না। কোনো সম্মান বিনামূল্যের নহে। যথেচ্ছ কাজ করিয়া সম্মান রাখা যায় না।”
অপরদিকে প্রাজ্ঞ পণ্ডিত নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী একটি প্রবন্ধে বলেছেন– “ত্যাগ বৈরাগ্য-কৃচ্ছতা নেই, ঋজুতা নেই, তপস্যা নেই, অথচ অর্থগুঘ্নতা আছে, আত্মম্ভরিতা আছে, মাতব্বরি আছে, ভয় দেখানো আছে, এমন ব্রাহ্মণ্য সামাজিক মানুষের সম্মান লাভ করতে পারে না। …..প্রথাগত ব্রাহ্মণ্যের বিরুদ্ধে, জন্মব্রাহ্মণ্যের বিরুদ্ধে অথবা ব্রাহ্মণ্য-প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থোপার্জন করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং গুপ্ত সমালোচনা কিন্তু অনেকদিনই আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল এবং সেটা ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের মধ্যেই হয়েছিল। শুধুমাত্র শুষ্ক আচার দেখিয়ে, গুরুর গৌরব দেখিয়ে, পিতার গৌরব দেখিয়ে অধস্তন বর্ণকে অপমান করার একটা আদত ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের মধ্যে এমনভাবে নিহিত হয়ে গিয়েছিল যে, গৌরবযুক্ত পিতামাতার পুত্র-কন্যারা এবং অনুপযুক্ত শিষ্যরাও সমাজভুক্ত অধর বর্ণকে কথায় কথায় অপমান করে বসত। একদা ক্ষত্রিয়ের ক্ষাত্রবৃত্তি যেমন ব্রাহ্মণকে আশ্রয় করে উজ্জীবিত থাকতেন, ঠিক তেমনিই ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণ্যও ক্ষত্রিয়ের দয়া-দাক্ষিণ্য-উপঢৌকন-উপাধি প্রাপ্তের উপরই নির্ভর ছিল। ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় দুই বর্ণই পরস্পরের পরিপূরক– সংসৃষ্টং ব্ৰহ্মণা ক্ষত্রং ক্ষত্রেণ ব্ৰহ্ম সংহিতম। অবশ্য কালের নিয়মে একদিন কার্তবীর্য বললেন, ব্রাহ্মণরা ক্ষত্রিয়দের আশ্রয় করে আছেন, এটা ঠিক। কিন্তু কোনোভাবেই ক্ষত্রিয়রা ব্রাহ্মণদের আশ্রয় করে নেই– “ব্রাহ্মণাঃ সংশ্ৰিতাঃ ক্ষত্রং নক্ষত্রং ব্রাহ্মণাশ্রিতম”।
