কিন্তু ব্রাহ্মণগণ বুঝেছিলেন এই বেদ অনুসরণ করলে ব্যাপক কোনো ফায়দা হবে না। অথচ মৃতের পরিবারের কাছ থেকে ব্যাপক ফায়দার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যু একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। কোন্ পরিবার -চায় তাঁর মৃত সদস্য স্বর্গসুখ পাক? অতএব মৃত সদস্যের স্বর্গের সমস্ত রকম সুখ দেওয়ার সবরকম ব্যবস্থার বিধি সৃষ্টি করতে হবে। অতঃপর ব্রাহ্মণগণ পুরাণের মতো গ্রন্থগুলি রচনার কাজে হাত দিলেন। রচিত হল ১৮টি প্রধান পুরাণ এবং ১৮টি উপপুরাণ নামক আকর গ্রন্থ। এই পুরাণগুলির পাতায় পাতায় বর্ণিত ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ বিষয়ক ভয়ংকর সব বক্তৃতা এবং স্ববিরোধী নিয়ম-বিধি-বিধান। এই পুরাণগুলিই হল ব্রাহ্মণ্যবাদের রক্ষাকবচ। ব্রাহ্মণ্যবাদের আলোচনায় পরে আসছি। এখন ফিরে যাই শ্রাদ্ধের প্রসঙ্গে। নিয়ম করলেন শোকার্ত পরিবারের কাছ থেকে কীভাবে কতটা চুষে খাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে চার্বাক সম্প্রদায়ের বাণী মনে পড়ছে– বেদ ভণ্ড, ধূর্ত, ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের রচনা। জীবিকা অর্জনের স্বার্থে তাঁরা স্বর্গ, নরক, পাপ, পুণ্য, ঈশ্বর, কর্মবাদ, কর্মফল, জন্মান্তরবাদ, আত্মা ইত্যাদি মিথ্যা অলৌকিক ধারণা প্রচার করে সাধারণ অসহায় মানুষদের যাগযজ্ঞ বাধ্য করে।
নিয়ামক– হ্যাঁ, সেই নিয়ামকের মিশনে পৌঁছে যেতে ব্রাহ্মণরা কুলশ্রেষ্ঠের মর্যাদাটি দখল করে নেয়। তাঁরা রচনা করতে থাকে দুর্বোধ্য সব মন্ত্রাদি, বেছে নেন সংস্কৃত ভাষার মতো দুর্বোধ্য এবং অপ্রচলিত কৃত্রিম ভাষা। যে ভাষা ওরা ছাড়া কেউ বুঝত না, বোঝার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। সমাজের মাঝে প্রধান হয়ে উঠার জন্য এটিই ছিল অমোঘ হাতিয়ার। মন্ত্রের ঐন্দ্রজালিক মোহ দিয়ে তাঁরা ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। মন্ত্রকে ঈশ্বরের বাণী বলে প্রচার করতে থাকেন এবং সমাজের প্রায় সবার সমর্থনে আসন গেঁড়ে বসেন সমাজের শিখরে। সেখান থেকে যাতে কোনোভাবেই প্রত্যাবর্তন না-করতে হয় সেইজন্য দ্বিতীয় কুলশ্রেষ্ঠ ক্ষত্রিয় বা রাজা-শাসকদের সঙ্গে বজায় কূটনীতিক সদ্ভাব অব্যাহত রাখা হত। পুরাণে উল্লেখ্য ছিল ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য সব বর্ণের মানুষ শংকর, তারাই শুধু আদি অবিমিশ্র রক্তধারার আর্য এবং সেই কারণেই তাঁরা শ্রেষ্ঠতম। তৈত্তিরীয় সংহিতায় বলা হয়েছে, রাজাদের পুরোহিতদের সহায়তা অবশ্য প্রয়োজনীয়, এমনকি রাজার পক্ষে সঠিক পথে চলার জন্য পুরোহিতদের প্রয়োজন। পুরোহিত ক্ষত্রিয়ের আত্মা (রাজার আত্মা) কারণ পুরোহিতবিহীন রাজার অন্ন (দেবতাদের সন্তুষ্টির জন্য তুলে দেওয়া প্রাসাদ) দেবতারা গ্রহণ করে না। সে সময়ে ব্রাহ্মণগণ ক্ষত্রিয়দের পিঠ চাপড়াতেন, ক্ষত্রিয়ের সপক্ষে কাব্য-মহাকাব্য লিখতেন –অন্যদিকে ক্ষত্রিয়গণ ব্রাহ্মণদের পিঠ চাপড়াতেন, প্রশংসা করতেন, উপাধি দিতেন, অর্ধেক রাজ্য দিতেন ইত্যাদি– এভাবেই ধীরে ধীরে আম-আদমিদের অভিশাপ-আশীর্বাদের ভয়-ভরসা প্রদর্শন করে গড়ে তোলা হয়েছিল সনাতন ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ, যা আরও অনেক পরে হিন্দুধর্ম হিসাবে প্রকাশিত হয়। অপরদিকে ক্ষত্রিয়রা শাসক সম্প্রদায় হলেও ব্রাহ্মণদের আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রেখেই রাজ্যশাসন করবে –এই হল অদৃষ্ট, নিয়তি।
ব্রাহ্মণকে হত্যা করা যায় না, হাজার গর্হিত অন্যায় কাজ করলেও নয়– পার্থিব ব্রাহ্মণ হত্যাকে ‘ব্রহ্মহত্যা পাপ’ নামে স্বর্গীয় পাপের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে আরও কঠোর করা হল ব্রাহ্মণদের অস্পৃশ্যবাদী প্রকল্পের চূড়ান্ত। চাউর করে দেওয়া হল ব্রাহ্মণ হত্যা করলে বেহ্মদত্যি হয়। বলা হল ৬৪ লক্ষ যোনি ভেদ করে ব্রাহ্মণের জন্ম হয়। ইতিহাসবিদ এবং পর্যটক মেগাস্থিনিসের বিবরণ থেকে জানা যায়, মৌর্যযুগে ধর্ম এবং ধর্মীয় কাজে ব্রাহ্মণদের প্রাধান্য ছিল। অপ্রতিরোধ্য। রাজ-দরবার এবং আইন-আদালত সর্বত্র প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কারণে এবং সব শ্রেণির কাছ থেকে দানদাক্ষিণ্য পেয়ে এক বিশাল বিত্তশালী শ্রেণীতে পরিণত হয় ব্রাহ্মণগণ। অনেকে আবার সরাসরি রাজকর্মও নির্বাহ করতেন। একসময় মগধ এবং মৌর্য রাজ্যগুলিতে রক্ষণশীল ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তুলনামূলক ভাবে অরক্ষণশীল ব্রাহ্মণদের চিন্তাগত দ্বন্দ্ব দেখা যায়।
বৌদ্ধধর্ম মতে ব্রাহ্মণের বেশ কিছু ব্যাখ্যা এবং সংজ্ঞা পাওয়া যায়। আসুন, আমরা একটু অনুধাবন করার চেষ্টা করি। কিছুই ফেলা যায় না।
প্রকৃত ব্রাহ্মণ : বুদ্ধের জম্মের পূর্বে ভারতে ব্রাহ্মণেরা তাদের নিজ মাহাত্ম্য প্রচারছলে জাতি অভিমান প্রকাশ করত মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ। কিন্তু বুদ্ধের সঙ্গে তেবিজ্জের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, কেবল ত্রিবেদ জ্ঞাত হলে প্রকৃত ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করা যায় না। ব্রাহ্মণত্ব লাভ করার জন্য অসমার্থক তর্ক ও বেদ, মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ভাবনা করা প্রয়োজন। যাঁরা এরূপ ভাবনার অধিকারী হয়ে অনাসক্ত নিষ্কলুষ, রজঃমুক্ত, লোভ-দ্বেষ-মোহবিহীন হয় এবং যিনি পাপ পঙ্কিল দূরতিক্রম্য মোহপূর্ণ সংসারাবর্ত মুক্ত হয়েছেন তিনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ।
জাতি দ্বারাই প্রকৃত ব্রাহ্মণ : হিন্দুদের বিশ্বাস জাতি দ্বারাই প্রকৃত ব্রাহ্মণ অধিকারী হয়। অর্থাৎ, প্রকৃত ব্রাহ্মণ হতে হলে ব্রাহ্মণ জাতিতে জন্ম কিংবা ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত হতে হবে। কিন্তু বুদ্ধ মতে, ব্রাহ্মণ জাতিতে জন্ম কিংবা ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত হয়ে পাপ মলত্যাগ করতে না করলে তাঁকে প্রকৃত ব্রাহ্মণ বলা যাবে না। তাঁকে কেবল ব্রাহ্মণ বলে সম্বোধন করা যায়। বংশগৌরব অথবা উচ্চবংশে জন্ম লাভ করেও শীল গুণে বিভূষিত না-হলে কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারে না। বহুলোক নীচু কুলে জন্মগ্রহণ করেও শীলাচার সম্পন্ন হয়ে পরিশ্রমের দ্বারাই সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্বর্গে গমন করতে পারে। তাই বুদ্ধ বলেছেন, জন্মের দ্বারা কেউ চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হয় না, কর্মের দ্বারাই চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হয়।
