অপরদিকে ক্ষত্রিয়-সন্তান বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত জনসাধারণের উপর ব্রাহ্মণ-সম্প্রদায়ের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল অপ্রতিরোধ্য। ধর্মচিন্তাকে সুসংঘবদ্ধ করতে সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণি নিজেদের আধিপত্য অব্যাহত রাখতে তৈরি করেছিলেন উপাসনালয় এবং এর কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নিয়োগ করতে হয়েছিল উপাসক বা পুরোহিত সম্প্রদায়। প্রাচীন ভারতে উপাসকদের মনোনীত করতে হত। ক্রমশ এই উপাসক বা পুরোহিতদের শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এই সুবাদে তাঁরা হস্তগত করে ফেলেন উপাসনা পদ্ধতি প্রণয়নের অধিকারও। যাঁদের কাজ ছিল বিশ্বাসীদের জন্য বিশেষ বিশেষ প্রথার জন্ম দিয়ে ঈশ্বর এবং তার কল্পিত অনুচরদের তুষ্টি বিধানের পাশাপাশি নিজেদের তুষ্টি এবং পুষ্টিসাধন। উপাসনার নেতৃত্ব দিতে উপাসক বা পুরোহিতরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করেছিলেন সেটি হচ্ছে দৈবশক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দুর্বোধ্য সংস্কৃত ভাষায় ভাষ্যরচনা সৃষ্টি, যাকে বলা হয় ‘মন্ত্র’। প্রথমদিকে বৈদিক ধর্মগুরুরা ছিলেন মন্ত্র রচয়িতা। এরপর মূলত ব্রাহ্মণ এবং শাস্ত্রকাররা সনাতন ধর্মের সাংগঠনিক রূপ দেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালীরা শাসক সম্প্রদায়ের ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে আঁতাত করে চতুর্বর্ণ প্রথার জন্ম দেন। এই বর্ণপ্রথার বর্ণপ্রধান হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন ব্রাহ্মণগণ এবং স্বাভাবিকভাবেই উপাসনার জন্য মন্ত্র-স্তোত্র-স্তব রচনা করার ক্ষমতা অধিকার করেন। সম্ভবত ব্রাহ্মণরাই একমাত্র পূজারী শ্রেণি যাঁরা জন্ম সুত্রে এই অধিকার পান (যদিও এ ব্যাপারটি অশাস্ত্রীয়)। অবশ্য শুরুর দিকে ব্রাহ্মণরা উত্তরাধিকার সূত্রে পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না। এজন্য বিশেষ গুণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হত। বর্ণপ্রথা পাকাপাকিভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে সনাতন ধর্ম চেপে বসার আগে মন্ত্র রচনা করে ব্রাহ্মণ হতে পারতেন যে কেউ। এমনকি জন্মসুত্রে ব্রাহ্মণরা উপাসনার দায়িত্ব ছেড়ে বেছে নিতে পারত অন্য যে-কোনো পেশাও।
সমাজের সুবিধাবাদী মন্ত্র-রচয়িতা ব্রাহ্মণরা খুব সহজেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন ধর্মীয় কাজ মায় ঈশ্বরের উপাসনা কর্মটি একাধারে আধ্যাত্মিক এবং পার্থিব প্রাধান্য বিস্তারে একটি শক্তিশালী নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে এবং এই চিন্তাসুত্রে ক্রমশ শাসক এবং মন্ত্র-রচয়িতা সম্প্রদায় নিজ নিজ স্বার্থের তাগিদে তৈরি করতে থাকে উপাসনা প্রকল্প। মগধীয় যুগ এবং মৌর্য যুগ– এসময়ই ব্রাহ্মণরা নিজেদের শ্রেষ্ঠতর দাবি করে শাস্ত্র রচনা শুরু করেন। এরপর আবিষ্কার করা হল বারো মাসে তেরো পার্বণ। জন্ম থেকে মৃত্যু– কোথায় নেই তাঁরা, এঁটুলি পোকার মতো আষ্টেপৃষ্টে রইলেন! আবিষ্কার করা হল কোটি কোটি দেব-দেবতার কোটি কোটি পুজো-পার্বণ– সারা বছর, প্রতিদিন এবং প্রতি মুহূর্তের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। মানুষকে স্বর্গে পৌঁছে দেওয়ার এইরকম বিশাল এবং সফল ইন্ডাস্ট্রি পৃথিবীতে আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।
ব্রাহ্মণগণ সবচেয়ে বেশি লাভবান হতেন শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে। প্রচুর সম্পদ সংগ্রহ হত। কেমন ছিল সেই সেকালের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান? তার আগে জেনে নিই হিন্দুদের আদি বা মূল ধর্মগ্রন্থ বেদ হিন্দুদের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান নিয়ে কী নির্দেশ দিয়েছেন প্রাঙ্গণ। বৈদিক সংস্কারে মৃতের শেষকৃত্য সমাপনে যে মন্ত্রাদি ব্যবহৃত হয় তা পৌরাণিক নিয়ম অর্থাৎ হিন্দুদের বর্তমানে প্রচলিত নিয়ম বা মন্ত্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈদিক নিয়মে মৃতের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে দুই থেকে তিনদিন লাগে। মানুষ মারা গেলে তাকে দাহ করার নাম “অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া। অন্ত্যা’ অর্থে অন্তিম, চরম বা সর্বশেষ এবং ইষ্টি’ অর্থে যজ্ঞ, শুভকর্ম বা সংস্কারকে বোঝায়। বৈদিক পণ্ডিত শ্রীমদ্ দয়ানন্দ সরস্বতী তাঁর রচিত “সংস্কার বিধি”-তে বলেছেন, “এখানে ‘ইষ্টি’ বলিতে যজ্ঞ বা শুভকর্ম বোঝয় বলিয়া অন্ত্যেষ্টি কর্মে পুণ্যই হইয়া থাকে। ইহাতে পাপ বা অশৌচ হইলে ইহার নাম ‘ইষ্টি’ হইত না। ‘অন্ত্যেষ্টি’ শব্দ স্বয়ং ঘোষণা করিতেছে যে, মৃতদেহ দাহ করাই পুণ্যের কাজ”। বড়োজোর, স্বামী দয়ানন্দ বলেছেন, শব দাহান্তে যে গৃহে মৃত্যু হয়েছে সেই গৃহ মার্জন, লেপন ও প্রক্ষালন করে বিশুদ্ধ করে নেওয়া যেতে পারে। এমনকি স্বস্তি বাচন ও শান্তি প্রকরণাদি মন্ত্র দ্বারা ঈশ্বরের উপাসনা করা যেতে পারে। কিন্তু পুরাণগুলির (বিশেষ করে গরুড়পুরাণ) ছত্রে ছত্রে যজমানদের নিঙড়ে কামানোর ফরমান। সবৎস্য গোরু দান, ভূমিদান, স্বর্ণদান, ষোড়শদান (১৬টি দ্রব্য –ভূমি বা ভূমিমূল্য, আসন, শয্যা, অন্ন, বস্ত্র, গোরু, জল, প্রদীপ, তাম্বুল, ছত্র বা ছাতা, গন্ধ, মাল্য বা মালা, ফল, পাদুকা, সোনা, রুপো। এগুলি দান করলে মৃত ব্যক্তি ৯৬০ হাজার বছর স্বর্গে সুখে কাল কাটাতে পারবে। মৃতের আত্মীয়গণ যত ভালো ভালো দ্রব্যাদি ব্রাহ্মণকে দান করতে পারেন তত ভালো ভালো দ্রব্যাদি মৃত ব্যক্তি স্বর্গে পাবেন। ), মৃতের পছন্দের জিনিসপত্র, ব্রাহ্মণভোজন ইত্যাদি কঠোর বিধান। সামর্থ্য থাক-বা-থাক, প্রয়োজনে ভিক্ষা করে এসবের আয়োজন করতে হবে। এইসব ব্রাহ্মণগণ মৃত আত্মীয়ের স্বর্গে পাঠানোর বাহানায় সমগ্র হিন্দুজাতিকে ভিখিরি করে ছেড়েছে। তবে বহুদিন হল ওইসব নিয়মের অনেক কাটছাঁট হয়ে গেছে। মৃত আত্মীয়ের বুকে ‘গীতা’ রাখলেই তিনি স্বর্গে চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার গীতাপাঠও করান। যদিও যাঁর উদ্দেশে পাঠ করা হচ্ছে তিনি কিছুই শুনতে পান না। কারণ তিনি মৃত, জড়বস্তু মাত্র।
