“মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিত”।
অর্থাৎ, ক্রৌঞ্চযুগলের থেকে প্রেমবিবশ একটি পাখিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে সে যে পাপকর্ম করেছে তার ফলে সেই ব্যাধ চিরকালের জন্য কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। কোনোদিন সুখৈশ্বর্য, গৌরব, প্রতিপত্তি কোনোরকম প্রতিষ্ঠা সে পাবে না, অর্থাৎ সে নির্বংশ থাকবে।
ওঃ, ভাবা যায় না। ‘রামায়ণম্’ নামক একটি মহাকাব্য শুরুই হল অভিসম্পাত দিয়ে। এই সেই রামায়ণম্, যা পবিত্র– যেখানে এক উচ্চজাতি তথা ব্রাহ্মণ দ্বারা অভিসম্পাত বর্ষিত হল এক অন্ত্যজ ব্যাধের জীবনে। এটিই বোধহয় সর্বকালের বিখ্যাত অভিসম্পাত।
মজার ব্যাপার হল পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারতের ক্ষত্রিয়গণ কেউ যৌনক্ষম, কেউ বা জন্মদানে অক্ষম। অক্ষম পুরুষে ছড়াছড়ি। বীর্যহীন পুরুষের কাহিনি। অথচ ব্রাহ্মণগণ দেখুন কেমন বীর্য বিতরণে সক্রিয়! ব্রাহ্মণগণ ঘোষণা দিলেন “পুত্রার্থে ভার্যা”। বললেন অপুত্রক রাজার মুখ দেখা অশুভ। রাজাগণও সন্তান নয়, পুত্রলাভের জন্য অস্থির। বিচিত্রবীর্য, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, দশরথ, দিলীপ প্রমুখ। অসংখ্য ক্ষত্রিয় রাজাগণ অপুত্রক ছিলেন। ব্রাহ্মণদের শয্যাসুখেই তাঁরা পুত্রবান হলেন। কীভাবে? সবার কথা এখানে আলোচনা করার পরিসর নেই। কালিদাস বিরচিত মহাকাব্য ‘রঘুবংশ’ থেকে অমিত পরাক্রমশালী বীর রাজা দিলীপের অপুত্রক থেকে পুত্রবান হওয়ার পুরাণকথা শুনব।
সন্তানলাভের উপায় অন্বেষণের জন্য চড়ে এক সন্ধ্যায় সমবেত হয়ে ব্রহ্মার মানসপুত্র গুরু বশিষ্ঠ এবং গুরুপত্নী অরুন্ধতীর চরণ বন্দনা করেন। এরপর পরস্পর কুশল বিনিময়ের পর রাজা দিলীপ আসল কথাটি বলে ফেললেন। বললেন, রাজ্ঞী সুদক্ষিণার গর্ভে পুত্র না-হওয়ায় অনন্ত রত্নপ্রসবিনী বিশাল পৃথিবীও তাঁকে সুখদান করছে না। তাঁর পিতৃপুরুষগণ পিণ্ডলোপের আশঙ্কায় ভুগছেন। তাই কুলগুরু বশিষ্ঠ যেন তাঁর পিতৃঋণ মোচনের জন্য সন্তানলাভের ব্যবস্থা করে দেন। ব্রাহ্মণ শিরোমণি বশিষ্ঠ প্রত্যুত্তরে বললেন, সেবার দ্বারা নন্দিনীকে (স্বর্গের কামধেনু, বশিষ্ঠের হোমধেনু) প্রসন্ন করলে দিলীপের পুত্রলাভের যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা দূর হবে। কেমন সেই সেবা? অভ্যাস দ্বারা যেভাবে বিদ্যাকে আয়ত্ত করতে হয়, সেইভাবে ফলমূলাদি (বন্যবৃত্তি অবলম্বনের দ্বারা) আহার করে ব্রহ্মচর্য পালনের দ্বারা এবং সর্বদা অনুগমনের মধ্য দিয়ে নন্দিনীকে প্রসন্ন করতে হবে। অর্থাৎ নন্দিনী প্রস্থান করলে রাজাও প্রস্থান করবে, সে অবস্থান করলে রাজাও অবস্থান করবেন। নন্দিনী জলপান করলে রাজাও জলপান করবেন। তপোবনের সীমান্ত পর্যন্ত নন্দিনীকে করতে হবে। যেই কথা সেই কাজ। নন্দিনী চরতে চরতে এমনভাবে প্রতিদিনই সীমান্ত অতিক্রম করে এবং রাজাও বশিষ্ঠের কুঠির ত্যাগ করে বহুদূর চলে আসে। সেইসময় এই অবকাশে সুদক্ষিণার সঙ্গে বশিষ্ঠের সম্ভোগ-সুখ বিনিময় হতে থাকে দীর্ঘদিন ধরে। অবশেষে পুত্রলাভের আশীর্বাদ। সুদক্ষিণা গর্ভবতী হলেন। বাকিটা অনুমেয়।
পুরাণে উল্লেখ্য ছিল ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য সব বর্ণের মানুষ শংকর, তাঁরাই শুধু আদি অবিমিশ্র রক্তধারার আর্য এবং সেই কারণেই তারা শ্রেষ্ঠতম। তৈত্তিরীয় সংহিতায় বলা হয়েছিল রাজাদের পুরোহিতদের সহায়তা অবশ্য প্রয়োজনীয়, এমন কি রাজার পক্ষে সঠিক পথে চলার নিমিত্ত পুরোহিতদের প্রয়োজন। পুরোহিত ক্ষত্রিয়ের আত্মা, কারণ পুরোহিত ব্যতীত রাজার অন্ন দেবতারা গ্রহণ করে না কিনা! অর্থাৎ, ক্ষত্রিয়রা শাসক সম্প্রদায় হলেও ব্রাহ্মণদের আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রেখেই রাজ্যশাসন করতে থাকবে। শরভঙ্গ, সুতীক্ষ্ণ, অগস্ত্যভ্রাতা ইধ্ববাহ, অগস্ত্য নামক ব্রাহ্মণদের প্ররোচনায় ঐন্দ্রধনু, খ, অক্ষয় বাণ, তূর্ণী দ্বারা ক্ষত্রিয় ভগবান (?) শ্ৰীমান রামচন্দ্র দণ্ডকারণ্যে প্রায় চোদ্দো হাজার অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষদের (যাঁদেরকে রামায়ণে রাক্ষস-খোক্ষস বলে চিহ্নিত করা হয়েছে) নির্বিচারে হত্যা করেছিলেন। “রক্ষসাং নিহতান্যাসন্ সহস্রাণি চতুর্দশ” (রামায়ণ–বালকাণ্ড–প্রথম সর্গ, ৪৯তম শ্লোক)। প্রাচীনকালে রাজারা সজ্ঞানেই ব্রাহ্মণদের কখনও ঘাটতে যাননি, কারণ শাস্ত্র সম্পর্কে অজ্ঞ মানুষের কাছে ব্রাহ্মণরা ঈশ্বর এবং ধর্মের নামে নিজেদের চূড়ান্ত শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন তার অনেক আগে থেকেই। তাই রাজারা ব্রাহ্মণদের হোশামোদ করেই প্রজাদের শাসন-শোষণ নিরবচ্ছিন্নভাবে করতে চাইতেন। ঠিক এই সময়েই ব্রাহ্মণরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের কীর্তন-গাঁথা রচনায় মনোযোগ দেন। তাতেও যখন কাজ হচ্ছিল না তখন তাঁরা কর্মফল, পুনর্জন্ম, আত্মা-পরমাত্মা, জন্মান্তরবাদ ইত্যাদি তত্ত্ব রচনাতে মনোনিবেশ করেন। পার্থিব ব্রাহ্মণ হত্যাকে ‘ব্রহ্মহত্যা পাপ’ নামে স্বর্গীয় পাপের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে আরও কঠোর করা হল ব্রাহ্মণদের অস্পৃশ্যবাদী প্রকল্পের চূড়ান্ত।
ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত হিন্দুধর্মটি আসলে ব্রাহ্মণ্যধর্মের শোরুম। বেদ বা বৈদিক আশ্রিত নয়, পুরাণ বা পৌরণিক আশ্রিত। অনেক বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণদের মতবাদই ব্রাহ্মণ্যবাদ কায়েম হয়ে গেল। এ এমন এক মতবাদ, যা মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ শূদ্রদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করল। শুধু শূদ্রদের নয়, ক্ষত্রিয়-বৈশ্যদেরও কবজা করে ফেলেছিল ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়গণ। ক্ষত্রিয়দের অস্ত্রশিক্ষাও তাঁরা নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিলেন জটিল কৌশলে। পরশুরাম, দ্রোণাচার্য প্রমুখ ব্রাহ্মণগণ ক্ষত্রিয়দের অস্ত্রগুরু হিসাবে খুবই প্রসিদ্ধ হয়েছেন। এমনকি রাজকার্য পরিচালনাতেও ক্ষত্রিয়দের অভিভাবক এই ব্রাহ্মণই। বৃহস্পতি, শুক্রাচার্য, বশিষ্ঠ প্রমুখ ক্ষত্রিয়দের গুরু ছিলেন। আর তাই বশিষ্ঠের নির্দেশেই ক্ষত্রিয় রামচন্দ্র শূদ্র-তপস্বী শম্বুককে নিজের হাতে হত্যা করেছিলেন। ক্ষত্রিয়গণ বহুবার চেষ্টা করেছিলেন ব্রাহ্মণ্য প্রভাব থেকে মুক্ত হতে। পারেনি। যতবারই চেষ্টা করেছে ততবারই ব্রাহ্মণগণ নির্মমভাবে শাস্তিবিধান করেছেন। ব্রাহ্মণ পরশুরামের কথা মনে পড়ছে? ইনি পৃথিবীকে একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন। মানে ক্ষত্রিয়দের ধরে কচুকাটা করেছিলেন।
