অসাধারণ এই শৈল্পিক ও গভীর দার্শনিক কথোপকথন ব্যখ্যা করছে সেই এক এবং অদ্বিতীয় পরব্রহ্ম থেকে সবকিছু উৎপন্ন হতে শুরু করে। একে একে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য, ভু, দ্যু এবং অন্তরীক্ষলোক, বিদ্যুৎশক্তি সবকিছুই তার থেকে তৈরি হয় যাদেরকে ৩৩টি ভাগে ভাগ করা হয় এবং এদেরকে বলা হয় দেব অর্থাৎ শক্তি। আর দিন শেষে শক্তি একটাই যা থেকে সকল কিছু আপাতশক্তিপ্রাপ্ত হয়। আর এই শক্তিই এক এবং অদ্বিতীয় পরমাত্মা।
কী বুঝলেন? আপনি যাই-ই বুঝুন, অবশেষে ব্রাহ্মণগণ বুঝলেন বেদের দেবতাদের খাঁটিয়ে ধান্ধাপানি করা এক্কেবারেই অসম্ভব। অতএব বিকল্প পথের খোঁজে ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক রচিত হল ১৮টি মহাপুরাণ, ১৮টি উপপুরাণ এবং অবশ্যই মনুসংহিতা। এই গ্রন্থগুলির মূল উপজীব্য বিষয় ক্ষত্রিয়-ইতিহাস সংরক্ষণ, ব্রাহ্মণগণের চরম আধিপত্য বিস্তার এবং অবশ্যই রগরগে আদিরসাত্মক ভরপুর কাহিনি (ঈশ্বরিক নয়, মানবিক বৈশিষ্ট্যের সবকটি দোষগুণই প্রকট হয়েছে কাহিনির পরতে পরতে। মানবজাতির সবরকম অবদমিত ইচ্ছা পুরাণগুলিতে লিপিবদ্ধ হয়েছে)। সেই থেকেই ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়ের গাঁটছড়া। অর্থাৎ রাজনীতি আর ধর্মের সহবাস আদিকাল থেকেই। একে অপরের পরিপূরক। একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ধর্ম ছাড়া রাজনীতি অচল, রাজনীতি ছাড়া ধর্ম অচল। পতাকার রং যাই-ই হোক, ধর্মই তাঁদের তুরুপের তাস।
বেদ এবং উপনিষদে একেশ্বরবাদ বর্ণিত হলেও পুরাণে যেন দেবতাদের মিছিল চলতে লাগল। কাড়ি কাড়ি দেবতা। দেবতার দেবতা এবং তার দেবতার তস্য দেবতা। গৌণ দেবতা এবং মুখ্য দেবতা। প্রধান দেবতা এবং অপ্রধান দেবতা। দেবতারা কী ভয়ানক এবং একই সাথে কত করুণাময় সেটা বোঝাতে আমদানি করা হল দৈত্য, দানব, রাক্ষস-খোক্ষস, অসুরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অবশ্য সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে ত্রিমূর্তিবাদ, অর্থাৎ ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। ক্রমশ হিন্দুধর্ম হয়ে উঠল পুরাণভিত্তিক ধর্ম। সারা ভারতে হিন্দুগণের পূজার্চনা, ব্রত, নিয়ম সবকিছুই পুরাণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেল। বৈদিক অগ্নি, বরুণ, ইন্দ্র দেবতার পরিবর্তে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ইত্যাদি ঈশ্বরগণ প্রতিষ্ঠা পেল। চিন্ময়ী উপাসনা মৃন্ময়ী মূর্তিতে চলার জন্য পুরাণেই ব্যবস্থা হল। হিন্দুধর্মে প্রবেশ ঘটল বহুত্ববাদিতার স্বরূপ পৌত্তলিকতার। এই পৌত্তলিকতা এবং পুরাণ কাহিনিগুলিকে আশ্রয় করে কায়েম হল ব্রাহ্মণ্যবাদ। দেবতাদের মূর্তি কল্পনা করে পুজো করতে থাকল বুদ্ধের মৃত্যুর পর। কারণ বুদ্ধের মৃত্যুর তাঁর শিষ্যরাই প্রথম মূর্তি কল্পনা করে। সেটাই ব্রাহ্মণ্যবাদীরা অনুকরণ ও অনুসরণ করে অস্তিত্বের বিপন্নতা থেকে।
ব্রাহ্মণগণের দ্বিতীয় মহার্ঘ আবিষ্কার হল সংস্কৃত ভাষা। এই সেই ভাষা যা দেবভাষা তথা দেবনাগরী বলে তকমা পেল। অর্থাৎ এ ভাষায় দেবতারা কথা বলেন– দেবতারা কথা বলেন, তাই ব্রাহ্মণগণ সেই ভাষায় কথা বলেন। অতএব দেবতাগণই ব্রাহ্মণ; ব্রাহ্মণগণই ঈশ্বর। ৩৬টি পুরাণ, একটি মনুসংহিতা এবং বেদ-পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারত অনুসরণে শত-সহস্র সাহিত্য লিখিত হল সংস্কৃত ভাষায়। এমন ভাষা, যা নিজেরাই লিখলেন, নিজেরাই পড়লেন, নিজেরাই বুঝলেন। ব্রাহ্মণগণের তৃতীয় আবিষ্কার আত্মা, স্বর্গ-নরক, পাপ-পুণ্য, জন্মান্তর, কর্মফলের ধারণা ইত্যাদি।
ব্রাহ্মণগণের চতুর্থ আবিষ্কার অভিসম্পাত এবং আশীর্বাদ।
একদা ব্রাহ্মণগণের মুখ হইতে কী অগ্নি নিঃসৃত হইত? এমন কথা অবশ্য অনেককে বুক ফুলিয়ে বলতে শুনেছি– “আগে ব্রাহ্মণদের মুখ দিয়ে আগুন বেরুত”। কী মনে হয় পাঠকবন্ধু? উঁহু, ব্রাহ্মণদের মুখ দিয়ে আগুন কোনোদিন নিঃসৃত হত না, এগুলি ব্রাহ্মণদের ভয়-সঞ্চারের কৌশল– গল্পকথা। মুখ দিয়ে যা বেরত, তা হল অভিসম্পাত। কথায় কথায় অভিশাপ আর ক্রোধ বর্ষণ হত। এই অগ্নিরূপ অভিসম্পাতই ব্রাহ্মণের প্রতি ভীতির কারণ। পুরাণগুলিতে পরতে পরতে ব্রাহ্মণগণ কখন অভিশাপ দেন এবং কী অভিশাপ দেন এবং অভিশাপের ফলে কী পরিণতি হয় সেই কাহিনিই বর্ণিত হয়েছে। দুর্বাশার অভিশাপে দুষ্যন্তের স্ত্রী শকুন্তলাকে ভুলে যাওয়া, ভরতমুনির অভিশাপে অপ্সরা উর্বশীর পৃথিবীতে পতন, এমনকি সব অসুর-দৈত্যরাই অভিশাপের পরিণাম ভোগ এবং অবশেষে মুক্তি– ইত্যাদি হাজারো সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী কাহিনি। শুধু পুরাণই নয়, প্রাচীনকালে সংস্কৃত সাহিত্যগুলিতে ব্রাহ্মণের রোষে কী পরিণাম হতে পারে তার বর্ণনা পাওয়া যায়। মহাকবি কালিদাস বিরচিত ‘রঘুবংশম্’-এ দেখছি পূজ্য ব্যক্তিদের (পড়ুন ব্রাহ্মণদের) কোনোভাবেই অসম্মান করা উচিত নয়। পূজনীয় ব্যক্তির পূজার্চনায় বিঘ্ন ঘটলে শ্ৰেয়লাভের নানা বিঘ্ন এসে উপস্থিত হয়। প্রাচীন ভারতে রাজাদের মধ্যে নিমি, নহুষ প্রমুখ প্রবল পরাক্রান্ত রাজা হওয়া সত্ত্বেও পূজনীয় ব্রাহ্মণদের অপমান করার জন্য তাঁরা বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। বাচ্চা ব্রাহ্মণ পূজনীয়, বৃদ্ধ ব্রাহ্মণও পূজনীয়। পুরাণগুলি পাঠ করলেই স্পষ্ট হয়। ব্রাহ্মণগণ মোটেই ষড়রিপুমুক্ত ছিলেন না; কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য –সবই বিদ্যমান ছিল। অত্যন্ত অন্যায়ভাবে অযাচিত মায় আগ বাড়িয়ে ব্রাহ্মণ বাল্মীকি অভিসম্পাত করলেন শিকারি নিষাদকে (ব্যাধ)। প্রণয়মিলনে মত্ত এক ক্রৌঞ্চমিথুনের পুরুষটিকে তীরবিদ্ধ করে জনৈক ব্যাধ হত্যা করে। পুরুষ সঙ্গীর মৃত্যুশোকে নারী ক্রৌঞ্চীর করুণ বিলাপ আকাশ-বাতাস মুখরিত হল। এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বাল্মীকির মনে হল শিকারি নিষাদ অত্যন্ত গর্হিত এবং নিষ্ঠুর কাজ করেছে। তখন তাঁর মুখ থেকে স্বভাবসিদ্ধ আচরণে শাপবাণী তীব্র গরলের মতো নির্গত হল —
