তাহলে এই যে এত এত ব্রাহ্মণ সৃষ্টি হল কিংবা সৃষ্টি করা হল ভারতে, তাতে কার কী কাজে লাগল, তারাই-বা কী করল সমাজে, কী রাখল সমাজে? মনুসংহিতা’-য় মনু ব্রাহ্মণদের জন্য বললেন —
“অধ্যাপনমধ্যয়নং যজনং যাজনং তথা।
দানং প্রতিগ্ৰহঞ্চৈব ব্রাহ্মণানামকল্পয়ৎ”। (১/৮৮)।
অর্থাৎ, ব্রাহ্মণদের জন্য সৃষ্টি করলেন অধ্যাপনা, অধ্যয়ন, যজন, যাজন, দান, প্রতিগ্রহ।
ব্রাহ্মণগণের আশ্চর্যজনক এবং অদ্বিতীয় আবিষ্কার ঈশ্বর বা দেবতা বা ভগবান। এটাই ব্রাহ্মণগণের একমাত্র পুঁজি বা মূলধন। এবং ঈশ্বরকে সামনে রেখে স্বর্গ নরক, পাপ-পূণ্য, আত্মা, ইহকাল-পরকাল, জন্মান্তর, কর্মফল ইত্যাদি মানুষের জীবন-মরণের সঙ্গে সংযোজন করে দিলেন। সাধারণ মানুষের মনে কোনো অদৃশ্য শক্তির ধারণাটা ছিলই, সেই সভ্যতার ঊষাকাল থেকে। কীভাবে এই ধারণা জন্মালো? বিধ্বংসী ঝড়, অনর্গল ভারী বর্ষণ, কড়কড়িয়ে মরণ বজ্রপাত, মুহুর্মুহু বিদ্যুতের ঝলকানি, নিথর মৃত-শরীর, দাবানল, প্লাবনই মানুষের মনে দানা বেঁধেছে কোনো অদৃশ্য শক্তির। প্রাকৃতজনের দেবদেবীদের উৎপত্তিস্থল ভীতি। তাই মনসা, চণ্ডী, শিব, ষষ্ঠি ইত্যাদি দেবদেবীদের জন্ম। তুর্কি আক্রমণের পরবর্তী সময়ে উন্নাসিক ব্রাহ্মণরা নীচু শ্রেণির মানুষদের সঙ্গে মেলবন্ধনের প্রয়োজন উপলব্ধি করেন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। তাই বৈদিক দেবদেবীদের সঙ্গে লৌকিক দেবদেবীদের একটা মনগড়া যোগ কল্পনা করে সংস্কৃত ছেড়ে লৌকিক ভাষায় মন্ত্র রচনায় মনোনিবেশ করেন।
দক্ষিণ রায়, বনদেবী, মারাংবুরু, ভাদু, টুসু, ইতু, মনসা, ওলাউঠা, শীতলা প্রভৃতি লৌকিক দেবতাগণও পেলাম কালে কালে, বিভিন্ন সময়ে। বেদের যুগে অগ্নি, বরুণ, ইন্দ্রও লৌকিক দেবতা। এমনকি বেদের যুগের আগেও পশুপতি (যা পরে ব্রাহ্মণগণ আত্মসাৎ করে শিব তথা মহেশ্বরে রূপান্তরিত করে নেয়) লৌকিক দেবতা। লক্ষ করুন এই দেবতারা ব্রাহ্মণদের সৃষ্ট দেবদেবী নয়, সাধারণের আত্মীয়। সংস্কৃত মন্ত্র নেই, ব্রাহ্মণ-পুরোহিত নেই। এই দেবতারা শান্ত, নরম, সন্তানসম, আদরের। ব্রাহ্মণদের দেবতারা ক্ষতিকর, হিংস্র, ত্রাস সৃষ্টিকারী, অসহিসষ্ণু, কামুক, কামার্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ, ছিদ্র অন্বেষক– দুষ্টের দমন শিষ্টের পালনের নামে খুনোখুনি করে। এরা নরকের ভয় দেখায়, স্বর্গের লোভ দেখায়।
এ ছাড়া মানুষ যা যা করতে অক্ষম, ঈশ্বরের মধ্যে সেই গুণগুলিই আরোপিত হয়েছে। এর থেকেই স্পষ্ট যে মানুষের দুর্বলতা এবং অসহায়তাই ঈশ্বরের আঁতুরঘর। লক্ষ করুন, এইসব প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি সবই উপরের শূন্য থেকে মানে আকাশ থেকেই পতন হয়। অর্থাৎ এইসব অঘটনের ধারণা হল স্রষ্টা আকাশেই থাকেন এবং অবশ্যই নিরাকার। সে কথা লিপিবদ্ধ হল হিন্দুদের প্রধান এবং একমাত্র ধর্মগ্রন্থ বেদে। বেদে আমরা ঈশ্বরের নিরাকার রূপই পাই। একমেবাদ্বিতীয়। ঈশ্বর এক বেদে বর্ণিত বেশিরভাগ দেবতাকল্পই প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেবতা (অগ্নি আগুনের দেবতা, বরুণ বৃষ্টির দেবতা, ইন্দ্ৰ বজ্রের দেবতা ইত্যাদি। ) এবং এরা বেদের যুগে কেউ কেউ পুজো পেলেও পুরাণোত্তর যুগে ব্রাত্য হয়েছে। সে কথায় পরে আসছি। আগে দেখে নেব বেদে বর্ণিত দেবতা কারা।
শতপথ ব্রাহ্মণ (১৪.৫)-এ যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি শাকল্যকে বলছেন– দেব ৩৩টি যা পরমেশ্বরের মহিমার প্রকাশক। ৮ বসু, ১১ রুদ্র, ১২ আদিত্য, ইন্দ্র, প্রজাপতি। শতপথ ব্রাহ্মণ, মনুসংহিতা ও বৃহদারণ্যক উপনিষদে এর বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া আছে– বিদগ্ধ শাকল্য যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞেস করলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব (শক্তি) কয়টি? যাজ্ঞবল্ক্য বললেন ৩৩টি। তখন শাকল্য আবার বললেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব কয়টি? তখন তিনি আবার বললেন ৬টি। শাকল্য আবার বললেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব কয়টি? তখন যাজ্ঞবল্ক্য উত্তর দিলেন ৩টি। আবার শাকল্য জিজ্ঞেস করায় তিনি উত্তর দিলেন দুইটি। তখন শাকল্য আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব কয়টি? তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন দেড়টি। শাকল্য আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব কয়টি? তখন তিনি বললেন একটি! তখন শাকল্য জিজ্ঞেস করলেন, এই ৩৩টি দেব কী? যাজ্ঞবল্ক্য বললেন ৮ বসু যা হল অগ্নি, পৃথিবী, বায়ু, অন্তরিক্ষ, আদিত্য, দ্যৌ, চন্দ্র, নক্ষত্র, ১১ রুদ্র যা হল প্রাণ (নিঃশ্বাস), অপান (প্রশ্বাস), ব্যন, সমান, উদাম, নাগ, কুৰ্ম্ম, কৃকল, দেবদত্ত, ধনঞ্জয় এবং জীবাত্মা, ১২ আদিত্য হল ১২ মাস, ইন্দ্র, প্রজাপতি অর্থাৎ মোট ৩৩টি। ইন্দ্র হল বিদ্যুৎ আর প্রজাপতি হল যজ্ঞ (যে কোনো শুভ কর্ম )। তখন শাকল্য আবার জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে ৬টা দেব কী কী? তখন তিনি। উত্তর দেন– অগ্নি, পৃথিবী, বায়ু, অন্তরিক্ষ, আদিত্য, দ্যুঃ। তখন তিনি বললেন, তাহলে ৩টি দেব কী? তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, তিনলোক (ভ, দ্যু, অন্তরিক্ষ)। তারপর শাকল্য আবার বললেন, সেই দুইটি দেব কী কী,? খাদ্য এবং প্রাণ– উত্তর দিলেন যাজ্ঞবল্ক্য। তখন আবার শাকল্য জিজ্ঞেস করলেন, সেই দেড়টি কী? তখন যাজ্ঞবল্ক্য উত্তর দিলেন যিনি প্রবাহিত হন। তখন শাকল্য বললেন সেই এক এবং অদ্বিতীয় যিনি প্রবাহিত হন তাঁকে আপনি কীভাবে দেড় বললেন? তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন যখন তা প্রবাহিত হয় তখনই সবকিছু উৎপন্ন হতে শুরু করে। তাহলে কে সেই এক? প্রাণ! হ্যাঁ প্রাণ (পরমাত্মা) সেই এক এবং অদ্বিতীয় দেব যাকে সবাই তৎ বলে জানে।”
