উপবীত : ব্রহ্মচারীর উপবীত (পইতা) বাম কার্ধের উপর থেকে ডানদিকে ঝোলানো থাকবে এবং তিনটি সুতোর গোছায় তিন গোছা সুতোয় তৈরি হবে। অবশ্য ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যের ক্ষেত্রে সুতোর উপাদান হবে যথাক্রমে কাঁপাস, শণ ও পশম। অপরদিকে শরীরের যাজ্ঞাপবীতের অবস্থান অনুসারে ব্রাহ্মণদের তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে।
(১) ব্রাহ্মণের উপবীত বাম কাঁধের উপর থেকে ডান হাতের নীচে পর্যন্ত ঝোলানো থাকলে তাঁকে উপবীতি বলে। কখন? দৈব কার্য ও যাজ্ঞ্যজ্ঞাদির সময় ব্যবহার হয়।
(২) ডান কাঁধ থেকে বাম হাতের নীচ পর্যন্ত উপবীত থাকলে প্রাচীনাবীতী বলে। কখন? পিতৃকার্যে বা শ্রাদ্ধাদিতে ব্যবহার হয়।
(৩) উপবীত গলায় হারের মতো লম্বমান থাকলে নিবীতী বলে। কখন? মনুষ্য কার্যের বা প্রাত্যহিক কাজের সময় ব্যবহার হয়।
দণ্ড : উপনয়নের পর ব্রহ্মচারীকে দণ্ড ধারণ করতে হয়। ব্রাহ্মণের দণ্ড হবে তার চুল পর্যন্ত লম্বা এবং বেল বা পলাশ কাঠের তৈরি। ক্ষত্রিয়ের দণ্ড হবে তার কপাল পর্যন্ত লম্বা এবং বট বা খয়ের কাঠের তৈরি। বৈশ্য ব্রহ্মচারীর দণ্ড হবে তার নাক পর্যন্ত লম্বা এবং পীলু বা ডুমুর কাঠের তৈরি। দণ্ডগুলি হবে সরল, অক্ষত, সুদর্শন, বল্কলযুক্ত এবং অগ্নিতে অদগ্ধ।
ভিক্ষা প্রার্থনা : উপনয়নের পর ব্রহ্মচারী দণ্ডধারণ ও অগ্নি প্রদক্ষিণ করে প্রথমে সে মা, বোন কিংবা মাসি অথবা এঁদের অভাবে যে তাকে অবজ্ঞা বা প্রত্যাখ্যান করবেন না এমন ব্যক্তির কাছে ভিক্ষা প্রার্থনা করবে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য ব্রহ্মচারী যথাক্রমে প্রর্থনা বাক্যে প্রথমে, মধ্যে ও অন্তে “ভবৎ” শব্দ গঠিত সম্বোধন পদ ব্যবহার করে ভিক্ষা প্রার্থনা করবে। হিন্দুসমাজে চতুর্বর্ণের সম্মান কাদের কোথায় দেখে নেব ছোট্টো করে। ধন, বন্ধু, বয়স, কর্ম ও বিদ্যা –এই পাঁচটি হল মান্যস্থান।
“বিত্তং বন্ধুয়ঃ কর্ম বিদ্যা ভবতি পঞ্চমী।
এতানি মান্যস্থানানি গরীয়ো য যদুত্তরম”।। (মনুসংহিতা ২/১৩৬)
এই পাঁচটির মধ্যে আগেরটির চেয়ে পরেরটি বেশি সম্মানযুক্ত। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য– এই তিন বর্ণের অন্তর্গত কোনো ব্যক্তির মধ্যে যদি ধন প্রভৃতি পাঁচটির আধিক্য ও উৎকর্ষ থাকে, তবে তিনি সকলের সম্মানের যোগ্য হবেন। কিন্তু শূদ্রের ক্ষেত্রে নব্বই বছরের বেশি বয়স হলে তিনিও সম্মানের যোগ্য হবেন। ব্রাহ্মণ বিদ্যার জন্য, ক্ষত্রিয় বীরত্বের জন্য, বৈশ্য ধনসম্পদের জন্য এবং শূদ্র বয়সে বড় হলেই শ্রেষ্ঠ হবেন। বুঝুন! শূদ্রের শুধু বয়সেই সম্মান, তাও আবার নব্বইয়ের অধিক হতে হবে। অর্থাৎ ধন, বন্ধু, কর্ম এবং বিদ্যার কোনো অধিকার নেই, অর্জন করলেও স্বীকৃতি নেই। মনুসংহিতায় মনুবাবু বলছেন, শূদ্রকে শিষ্য করবে না এবং শূদ্রের শিষ্য হবে না(মনুসংহিতা– ৩/১৫৬)। সে কারণেই দ্রোণ কর্তৃক নিষাদপুত্র একলব্যকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ হারিয়ে তুণ্ড হয়ে যেতে হয়, সে কারণেই রামচন্দ্র কর্তৃক শূদ্র শম্বুককে অকারণে (তপস্যা করার অপরাধে!) মৃত্যুবরণ করতে হয়। এ ঘটনা অস্বাভাবিক নয়, কেন-না এটা মনুসংহিতার মনুর নির্দেশ–
“নাবি স্পষ্ট মধীয়ীত ন শূদ্র জন সন্নিধ্য।
ন নিশান্তে পরিশ্রান্তো ব্রাহ্মাধীত্য পুনঃ স্বপেৎ”।
অবশ্য এক শ্রেণির ব্রাহ্মণগণ মিথ্যা একটা প্রচার চালালেন। ভাবটা এমন যেন তাঁরা কত উদার! কী বললেন? বললেন– শূদ্র যদি ব্রাহ্মণের বা ক্ষত্রিয়ের মতো কাজে পারদর্শী হয় তবে তাকে ব্রাহ্মণত্বে বা ক্ষত্রিয়ত্বে উন্নীত করা যাবে। কার্যে তার কোনো প্রমাণ আছে নাকি? বিশ্বামিত্রের কথা বলবেন বুঝি? প্রথমত বিশ্বামিত্র শূদ্রপুত্র নয়, ক্ষত্রিয়। দ্বিতীয়ত ক্ষত্রিয়রাজ বিশ্বামিত্রকে ক্ষমতায় রুখতে না-পারার কারণে ব্রাহ্মণগণ বাধ্য হয়েই ব্রাহ্মণ বলে মেনে নিয়েছিলেন। যে ব্রাহ্মণগণ মনুসংহিতা রচনা করে–
“সহাসনমভিপ্রেক্ষ্ণরুকৃষ্টস্যাপকৃষ্টজঃ।
কট্যাং কৃতাঙ্কো নিৰ্বাস্যঃ স্কিচং বাস্যাব কৰ্তয়েৎ”
অর্থাৎ ব্রাহ্মণেতর অধম জাতি যদি ব্রাহ্মণের সঙ্গে একাসনে উপবেশন করে তবে রাজা ওই তার কটিদেশে গরম লোহার দাগ দিয়ে দেশ থেকে বিতাড়িত করবেন অথবা যেন না মরে এমনভাবে তার পাছা কেটে দেবে।
বলেন সেই ব্রাহ্মণগণ মঙ্গলদায়ক আর কী করতে পারে! অব্রাহ্মণ শিক্ষকতা করলেও সে অব্রাহ্মণই থাকে, তাকে কেউ ব্রাহ্মণ বলে অতিরিক্ত সম্মান করে না। কারণ ‘মনুস্মৃতি’ নিদান দিয়ে দিয়েছেন —
(১) ১০ বছরের ব্রাহ্মণ এবং ১০০ বছরের এক ক্ষত্রিয়ের সম্পর্ক যদি পিতা-পুত্র হয়, তাহলে এদের মধ্যে ব্রাহ্মণ হচ্ছে পিতা।
(২) একজন ব্রাহ্মণের গৃহে কোনো ক্ষত্রিয়, বৈশ্য অথবা শূদ্রকে অতিথি বলা যাবে না। একজন ব্রাহ্মণের গৃহে শুধু ব্রাহ্মণেরই অতিথি হওয়ার অধিকার আছে।
(৩) একজন ব্রাহ্মণ নিশ্চিন্ত মনে একজন শূদ্রের জিনিস নিয়ে নিতে পারে, কারণ শূদ্রের নিজের বলে কিছুই নেই।
মনুসংহিতায় শ্রীমান মনু বলছেন, কারা কাদের পিতা ব্রাহ্মণ হলেও কে ব্রাহ্মণ নয়। যিনি জাতিতে ব্রাহ্মণ হয়েও আচার-আচরণে ব্রাহ্মণ নন, তাঁরা ব্রাহ্মণব্রুব হিসাবে পরিগণিত হবেন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য বর্ণের কোনো বালকের উপনয়নের বয়সের ঊর্ধ্বসীমা যথাক্রমে ষোলো, বাইশ এবং চব্বিশ বছর অতিক্রম করে গেলেও যদি তার উপনয়ন সংস্কার অনুষ্ঠিত না-হয় সে ব্রাত্য হিসাবে চিহ্নিত হয়। এই ব্রাত্যদের কোনো ব্রাহ্মণের সঙ্গে যাজন, অধ্যাপনা প্রভৃতি বেদসম্বন্ধ ছিল না এবং সংশ্লিষ্ট বর্ণের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কও নিষিদ্ধ ছিল। অবশ্য শাস্ত্র বলছে মূর্খ ব্রাহ্মণগণ শূদ্রের অধম। অতএব সাধু সাবধান! মূর্খ ব্রাহ্মণগণ দূর হোঠো। নারায়ণ-শিলা স্পর্শ করবেন না।
