(৪) ঋত্বিক : কোনো ব্যক্তি যাঁকে যজ্ঞের জন্য বরণ করে নেওয়ার তিনি ওই ব্যক্তির জন্য অগ্ন্যাধান, অর্থাৎ যজ্ঞকালে মন্ত্রসহকারে অগ্নি উৎপাদন ও স্থাপন, পাকযজ্ঞ এবং অগ্নিষ্টোম প্রভৃতি যজ্ঞ সম্পাদন করেন তাঁকে বলে। আচার্য প্রভৃতির মতো ঋত্বিকও যে সম্মানীয় তা দেখানোর জন্যই এই পদ। বৈদিক যজ্ঞে ঋত্বিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। মনুসংহিতায় দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৪৩ সংখ্যক শ্লোকে যে ঋত্বিকদের কথা বলা হয়েছে তিনি শুধু বৈদিক নন, স্মার্ত বা লৌকিক ক্রিয়াকর্ম সম্পাদন করেন। গায়ত্রী মন্ত্র : যিনি যেই মুহূর্তে ব্রাহ্মণে উন্নীত হলেন, সেই মুহূর্ত থেকে তিনি প্রণব বা ওংকার এবং গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণের অধিকার অর্জন করলেন। উপনয়ন প্রাপ্ত ব্রহ্মচারীর কর্তব্য বিষয়ে উপদেশ দিতে গিয়ে মনু প্রণব বা ওংকার কথাটি ৭৬ সংখ্যক শ্লোকে বলেছেন, বেদপাঠের আগে ও পরে বেদপাঠার্থী শিষ্য প্রণব বা ওংকার উচ্চারণ করলে মনের একাগ্রতা, পবিত্রতা আছে। ওংকারহীন পাঠ কোনো কাজে আসে না। প্রণব বা ওংকারে আছে তিনটি অক্ষর। — ‘অ’, ‘উ’, ‘ম’– তিনটি অক্ষর মিলে উচ্চারণ হয় “ওঁ”– উচ্চারণ করলে ‘অউম’ হয়। গায়ত্রী মন্ত্রের তিনটি প্রয়োজনীয় বিভাগ আছে, সেগুলি হল –(ক) প্রণব বা ওংকার, (খ) ব্যাহতি এবং (গ) সাবিত্রী ঋক্। ব্যাহৃতি শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল– উক্তি, কথন, উচ্চারণ, বি-আ-হৃ + ক্তি = ব্যাহৃতি। ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ –এগুলি গায়ত্রী মন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত সাবিত্রী বচন, এগুলিকে ব্যাহৃতি বলে। অনেকে ব্যাহৃতি মানে শব্দ (word) বা স্থান বলেছেন। তিনটি ব্যাহৃতি-র মধ্যে ‘ভুঃ’ হল পৃথিবীলোক, অগ্নিদেবতা, ঋগ্বেদ ও প্রাণবায়ুস্বরূপ। ’ভুবঃ’ হল অন্তরিক্ষলোক, বায়ুদেবতা, সাম ও অপানস্বরূপ। স্বঃ হল দ্যুলোক, আদিত্যদেবতা, যজুঃ ও ব্যানবায়ুস্বরূপ। যেহেতু বেদ অধ্যয়নের আগে প্রণব, ভূঃ, ভুবঃ স্বঃ ব্যাহৃতি ও সাবিত্রী বা গায়ত্রী মন্ত্রপাঠ করতে হয়, সেহেতু এগুলিকে বেদের মুখ বা প্রবেশদ্বার বলা হয়েছে। ঋকের দেবতা সবিতা, কিন্তু মন্ত্রটি গায়ত্রী ছন্দে গ্রথিত। তাই সাধারণভাবে একে গায়ত্রী মন্ত্র বলা হয়। সাবিত্রী শব্দের দ্বারা গায়ত্রীকেই বোঝায়। সাবিত্রী হল ত্রিপাদযুক্ত গায়ত্রী মন্ত্র ব্রহ্মা ঋক্, সাম, যজুঃ– এই তিনটি বেদ থেকে গায়ত্রীর তিনটি পাদ –(ক) তৎসবিতুর্বরেণ্যং, (খ) ভর্গো দেবস্য ধীমহি, (গ) ধিয়ো যো নঃ প্রচোদ্দয়াৎ। অর্থাৎ প্রকাশমান (দেব) সবিতার সেই বরেণ্য তেজঃ (ভগ) আমরা ধ্যান করি, যিনি আমাদের বুদ্ধিসমূহকে প্রেরণ করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয় ওংকার (অ = ব্রহ্মা, উ = বিষ্ণু, ম = মহেশ্বর) এবং গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ করার অধিকার অব্রাহ্মণদের নেই, এ অধিকার শুধুমাত্র ব্রাহ্মণগণের। অবশ্য শাস্ত্রানুযায়ী বর্তমানে ‘ব্রাহ্মণ’ বলে যদি কোনো অস্তিত্ব থাকে! বেদ পাঠ তো দূরের কথা– ঋক্, সাম, যজুঃ বা সাম বেদ বেশিরভাগ ব্রাহ্মণগণ চোখেই দেখেননি। আর ব্রহ্মজ্ঞান? দেড় টাকা দিয়ে উপবীত বা পইতে পরে নিলেই ব্রহ্মজ্ঞান হয়ে যায় না। শাস্ত্রকার রঘুনন্দন বলেছেন– “বিপ্রাঃশূদ্র সমাচারাঃ ভবিষ্যন্তি কলিযুগে”। অর্থাৎ, “ভবিষ্যতে কলিযুগে বিপ্র এবং শূদর সবাই সমান আচার সম্পন্ন হবে”। তবে ‘ওঁ’ শব্দের পরিবর্তে অব্রাহ্মণগণকে সহজ মন্ত্র ‘নমঃ’ শব্দ উচ্চারণ করার ঢালাও অধিকার দেওয়া হয়েছে।
ভারতে কোন্ ব্রাহ্মণ কোথায় থাকতেন সেটা একবার দেখে নেব। মনুসংহিতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে ধর্মানুষ্ঠানের পক্ষে উপযুক্ত দেশরূপে ব্রহ্মাবর্তের কথা বলা হয়েছে–
(১) সরস্বতী এবং দৃষদ্বতী –এই দুটি দেবনির্মিত পবিত্র নদীর মধ্যবর্তী প্রদেশ ব্ৰহ্মাবর্ত বলে পরিচিত ছিল। এই স্থান ধর্মানুষ্ঠানের পক্ষে উপযুক্ত স্থান বলে কথিত। ব্ৰহ্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণগণ অধিক সংখ্যায় এই স্থানে বাস করতেন। এই ব্ৰহ্মাবর্তের ব্রাহ্মণাদি বর্ণের আচার-আচরণই মনু সদাচার বলেছেন।
(২) মনু কুরুক্ষেত্র, মৎস্য, পঞ্চাল ও শূরসেন– এই চারটি প্রদেশকে ব্রহ্মর্ষিদেশ বলা হয়েছে। উৎকর্ষের বিচারে ব্রহ্মাবর্তের পরেই ব্রহ্মর্ষিদেশ। ব্রহ্মর্ষিদেশের ব্রাহ্মণগণ পণ্ডিত, শাস্ত্রজ্ঞ, ধার্মিক এবং শ্রুতি ও স্মৃতি প্রতিপাদিত কর্মসমূহের অনুষ্ঠানে দক্ষ। তাই এঁদের কাছ থেকে অন্যান্য দেশের লোকেরা যথার্থ আচার-আচরণ শিক্ষা করবে।
(৩) মনু বলেন যে দেশে কৃষ্ণসার মৃগ স্বভাবত বাস করে অর্থাৎ যেখানে এইরকম মৃগ জোর করে অন্য জায়গা থেকে আনা হয় না বা এখানে কেউ কারোকে হিংসা করে না বলে কৃষ্ণসার মৃগ স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়, সেই দেশকে যজ্ঞীয় দেশ বলে। এবার দেখব উত্তরীয়, মেখলা, উপবীত, দণ্ড, ভিক্ষা প্রার্থনা ব্রাহ্মণ সহ বর্ণভেদে (শূদ্র ব্যতীত) কার কেমন (বিভাজন) হওয়া আবশ্যক।
উত্তরীয় : ব্রহ্মচারীর উত্তরীয় বা ঊধ্বসন হবে– ব্রাহ্মণদের কৃষ্ণমৃগের, ক্ষত্রিয়দের রুরু হরিণের এবং বৈশ্যদের ছাগের চামড়ায় তৈরি হবে। তেমনই অধোবসন হবে যথাক্রমে শণ, রেশম এবং পশমের তৈরি বস্ত্র পরিধান করবে।
মেখলা : ব্রাহ্মণ ব্রহ্মচারীর মেখলা (কোমরবদ্ধ) হবে মুথা ঘাসের তৈরি, ত্রিগুণিত, সমান ও চিক্কণ। ক্ষত্রিয় ব্রহ্মচারীর মেখলা হবে তৈরি এবং ধনুকের গুণের মতো। বৈশ্য ব্রহ্মচারীর মেখলা হবে শণসূত্রে নির্মিত এবং ত্রিগুণিত (তিনটি সমান মোটা সুতোয় প্রস্তুত)।
