শাস্ত্র বলছে ব্রাহ্মণ-ঘরে জন্মালেই কেউ ব্রাহ্মণ হয়ে যায় না, যেমন মুসলমান ঘরে জন্মালেই কেউ মুসলমান হয় না। বিশেষ নিয়মের মধ্যে দিয়ে যেমন মুসলমান হতে হয়, তেমনই ব্রাহ্মণ হয়ে ওঠার জন্য বেশ কিছু নিয়ম করার বিধান দিয়েছে শাস্ত্র। বল্লালচরিত্র ধৃত পূর্ব খণ্ডের ১৩ অধ্যায়ে বলা হয়েছে–
“জন্মনা জায়তে শূদ্রঃ সংস্কারাদ্বিজ উচ্যতে।
বেদ পাঠী ভবেদ্বিপ্রঃ ব্রহ্ম জানাতি ব্রাহ্মণঃ।।”
অর্থাৎ, জন্মমাত্রেই সবাই শূদ্র। সংস্কারে দ্বিজ পদবাচ্য হয়। বেদ পাঠেই বিপ্র হন এবং ব্রহ্মকে জানলেই ব্রাহ্মণ পদবাচ্য।
ধর্মশাস্ত্রে বর্ণিত দশ প্রকার সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। যার একটি হল চূড়াকর্ম। চূড়াকর্ম বা চূড়াকরণ শ্রুতির বিধান অনুসারে ধর্মলাভের জন্য দ্বিজাতিগণের (ব্রাহ্মণ) উচিত এবং আবশ্যিক কর্ম। “চূড়া’ মানে শিখা বা টিকি। মনুর মতে শিশুর চূড়াকরণ বা প্রথম কেশচ্ছেদন/মস্তকমুণ্ডনের অনুষ্ঠান দুই সময়ে করা যায়। শিশুর এক বছর বয়সে বা তিন বছর বয়সে, এ বিষয়ে কোনো কঠোর বিধান নেই। কিন্তু “কুমারা বিশিখা ইব” এই বেদবচন অনুসারে চূড়াকরণ অবশ্য কর্তব্য। এই সংস্কারে শিখা বা টিকি রেখে মাথার অবশিষ্ট চুল কেটে ফেলা হয়, একে চৌলকর্মও বলে। এরপরের সংস্কারটি হল উপনয়ন, একেই পৈতে বা পইতা গ্রহণের অনুষ্ঠান বলে। ‘উপ’ মানে নিকটে বা কাছে এবং ‘নয়ন’ মানে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ বেদ শিক্ষার জন্য বালককে আচার্যের কাছে নিয়ে যাওয়ার অনুষ্ঠান। এটি হল দ্বিজাতির অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রারম্ভিক সংস্কার, এতে উপবীত বা যজ্ঞসূত্র ধারণ করতে হয়। বিধান অনুসারে ব্রাহ্মণদের আট বছর বয়সে, ক্ষত্রিয়দের এগারো বছর বয়সে এবং বৈশ্যদের দ্বাদশ বছর বয়সে উপনয়ন কর্তব্য। অবশ্য উপনয়নের ঊর্ধ্বসীমা ব্রাহ্মণের ষোলো বছর, ক্ষত্রিয়ের বাইশ বছর এবং বৈশ্যের চব্বিশ বছর নিদান আছে। শূদ্রের উপবীত ধারণের কোনো অধিকার নেই। ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের উপবীত ধারণের অধিকার দেওয়া হলেও আসলে উপবীত ধারণের অধিকারটা ব্রাহ্মণগণই আত্মসাৎ করে নিয়েছিল। কারণ ব্রাহ্মণ ছাড়া আর কারোরই পূজা-পার্বণ করার অধিকার ছিল না, যাঁরা পূজা পার্বণ করার অধিকার কায়েম করলেন, তাঁদেরই পৈতে ধারণের প্রয়োজন হয়ে পড়ল, কারণ পূজা-পার্বণে পৈতার ভূমিকা সংযোজন করা হল। শাস্ত্রে আরও বলা হল ষোলো বছরে ব্রাহ্মণদের, বাইশ বছরে ক্ষত্রিয়দের এবং চব্বিশ বছরে যদি উপনয়ন সংস্কার না-হলে তাঁরা ব্রাত্য পরিগণিত হবে। ব্রাত্যরা আচার অনুষ্ঠানে কোনো অধিকার থাকে না। তাঁদের সঙ্গে ব্রাহ্মণদের অধ্যয়ন সংক্রান্ত এবং বৈবাহিক কোনো সম্পর্ক স্থাপন করা যায় না। তবে হ্যাঁ, যথাবিধি প্রায়শ্চিত্ত করলে তবেই সমাজে তারা স্থান পায়। এইসব কথা অথর্ববেদের পঞ্চদশ কাণ্ডে বলা হয়েছে। আর-একটি সংস্কার হল কেশান্ত সংস্কার। ব্রাহ্মণাদি বর্ণের মধ্যে প্রচলিত এই প্রাচীন সংস্কারে উপনয়নের শেষ ঊর্ধ্বসীমায় চুল কাটা ও দাড়ি কামানোর অনুষ্ঠানই কেশান্ত সংস্কার। এই অনুষ্ঠানে গোরু দান করা হয় বলে আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্রে (১/১৮) একে গোদান বলা হয়েছে।
উপরে যে সংস্কারগুলি আলোচনা করা হল সেগুলি ব্রাহ্মণগণের অবশ্য কর্তব্য। এবার আমরা দেখে নেব ব্রাহ্মণগণের কর্ম-বিভাজনের কারণে শ্রেণি-বিভাজন।
(১) আচার্য : মনুর মতে যে ব্রাহ্মণ শিষ্যের উপনয়ন করিয়ে তাকে কল্প। (যজ্ঞবিদ্যা) ও রহস্য (উপনিষদ) সহ বেদ অধ্যয়ন করান তাকে আচার্য বলা হয় (যেমন –ভট্টাচার্য = ভট্ট + আচার্য)। কল্প ও রহস্যবিদ্যা না জানলে বেদাধ্যয়ন সম্পূর্ণ হবে না। তবে আগে শিষ্যকে উপনয়নের সময় সাবিত্রীমন্ত্র তার কানে কানে পড়বেন। ফলে সেই শিষ্যের দ্বিজাতিত্ব প্রাপ্তি ঘটবে। তখন সে বেদাধ্যয়ন করার অধিকার পাবেন। প্রায় সমস্ত স্মৃতিশাস্ত্রে এই কথা উল্লেখ আছে।
(২) উপাধ্যায় : মনুর মতে যে ব্রাহ্মণ জীবিকার জন্য বেদের অংশমাত্র বা বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করান তিনিই উপাধ্যায় (বন্দ্যোপাধ্যায় = বন্দ্য + উপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায় = মুখ + উপাধ্যায় ইত্যাদি)। সমগ্র বেদ নয়, বেদের অংশ যেমন– সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ প্রভৃতির যে-কোনো একটি। আর বেদাঙ্গ যেমন –শিক্ষা, নিরুক্ত, ব্যাকরণ, ছন্দ ও জ্যোতিষ, কল্প প্রভৃতি। উপাধ্যায়ও শিক্ষক, তবে আচার্যের থেকে কিছু পার্থক্য আছে। উপাধ্যায় অর্থের বিনিময়ে বেদের অংশ বা বেদাঙ্গ পড়ান। কিন্তু আচার্য কোনোরকম দক্ষিণা গ্রহণ করবেন না। তাই উপাধ্যায় অপেক্ষা আচার্য মান্যতর।
(৩) গুরু : মনুর মতে যে ব্রাহ্মণ শাস্ত্রের বিধান অনুসারে গর্ভাধান প্রভৃতি কর্ম সম্পাদন করেন এবং অন্নের দ্বারা প্রতিপালন করেন সেই ব্রাহ্মণ গুরু হিসাবে পরিগণিত হন। এখানে ‘নিষেক’ শব্দের দ্বারা দশবিধ সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, দশটি সংস্কারের মধ্যে গর্ভাধান অন্যতম। ভবিষ্যতের বা হবু পিতাই তাঁর পত্নীর জন্য এই সংস্কার সম্পাদন করেন। পিতাই অন্নের দ্বারা সন্তানদের প্রতিপালন করেন, ফলে পিতাই প্রকৃতপক্ষে গুরু।
