(১) ব্রাহ্মণ গুরু এবং সকলের কাছে শ্রদ্ধেয় ও প্রণম্য।
(২) তারা অপর জাতির কর্তব্য নির্ধারণ করবে।
(৩) রাজা সকলের প্রভু কিন্তু ব্রাহ্মণের প্রভু নয়।
(৪) বেত্রাঘাত, বন্ধন, অর্থদণ্ড, নির্বাসন, বাকদণ্ড এবং পরিত্যাগ– এই ছয় প্রকারের সাজা ব্রাহ্মণকে দেওয়া যাবে না।
(৫) শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণরা করমুক্ত।
(৬) তাঁদের ঘরে গুপ্তধন পাওয়া গেলেও রাজা তার সবটাই গ্রহণ করতে পারবে না।
(৭) আগে যাওয়ার জন্য তাকে পথ ছেড়ে দিতে হবে।
(৮) অন্য বর্ণের তুলনায় ব্রাহ্মণরা লঘুদন্ড পাবে।
(৯) তাকে সাক্ষ্য দিতে ডাকা যাবে না।
(১০) তারা মৃতাশৌচ পালন করবে দশদিন।
(১১) তারা সুদ গ্রহণ করতে পারবে না।
(১২) আপদকালে তারা বৈশ্যদের বৃত্তি গ্রহণ করতে পারবে, প্রভৃতি।
পূজার্চনাসহ হিন্দুদের যে-কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করা ব্রাহ্মণদের একটি সাধারণ পেশা। তবে বর্তমানে শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যাবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, চাকরি ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তাঁরা অন্যদের চেয়ে অগ্রগণ্য। যদিও ব্রাহ্মণদের যজমানি করা ছাড়া অন্য পেশা গ্রহণ করার অধিকার শাস্ত্র দেয়নি।
সাধারণত বঙ্গীয় ব্রাহ্মণগণ সুশিক্ষিত পণ্ডিত হয়ে থাকেন এবং কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব বঙ্গীয় ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেছেন। কলহণ বিরচিত ‘রাজতরঙ্গিণী’-র শ্লোকানুসারে ব্রাহ্মণগণ মূলত পঞ্চ-গৌড় এবং পঞ্চ-দ্রাবিড়, এই দুই ভাগে বিভক্ত। কলহন কর্তৃক রচিত শ্লোকটি উল্লেখ করা হল–
“কর্ণাটকাশ্চ তৈলঙ্গা দ্রাবিড়া মহারাষ্ট্রকাঃ, গুর্জরাশ্চেতি পঞ্চৈব দ্রাবিড়া বিন্ধ্যদক্ষিণে।
সারস্বতাঃ কান্যকুজা গৌড়া উৎকলামৈথিলাঃ, পঞ্চগৌড়া ইতি খ্যাতা বিনেস্যাত্তরবাসিনঃ।।”
ব্রাহ্মণের মর্যাদাই-বা কতটা– এ ব্যাপারে ‘মনুসংহিতা’-য় মনু পরিষ্কারভাবে বলেছেন —
(১) “ভূতানাং প্রাণিনঃ শ্রেষ্ঠাঃ প্রাণিনাং বুদ্ধিজীবিনঃ।
বুদ্ধিমৎসু নরাঃ শ্রেষ্ঠা নরেষু ব্রাহ্মণাঃ স্মৃতাঃ।।”(১/৯৬)
অর্থাৎ, সৃষ্ট (স্থাবর জঙ্গমাদির মধ্যে) প্রাণী শ্রেষ্ঠ, প্রাণীদের মধ্যে বুদ্ধিজীবীরা শ্রেষ্ঠ, বুদ্ধিমানদের মধ্যে মানুষ এবং মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ বলে কথিত।
(২) “উৎপত্তিরেব বিপ্রস্য মূর্তিধর্মস্য শাশ্বতী।
স হি ধর্মার্থমুৎপন্নো ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।”(১/৯৮)
অর্থাৎ, ব্রাহ্মণের দেহই ধর্মের সনাতন মূর্তি। তিনি ধর্মের জন্য জাত এবং মোক্ষলাভের যোগ্য পাত্র।
(৩) “ব্রাহ্মণো জায়মানো হি পৃথিব্যামধিজায়তে।
ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং ধর্মকোষস্য গুপ্তয়ে।।”(১/৯৯)
অর্থাৎ, জাতমাত্রেই ব্রাহ্মণ পৃথিবীতে সকল লোক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হন এবং সকল সৃষ্ট পদার্থের ধর্মসমূহ রক্ষার জন্য প্রভু হন।
(৪) “সর্বং স্বং ব্রাহ্মণেসেদ্যং যৎকিঞ্চিৎজ্জগতীগতম।
শ্রৈষ্ঠ্যেনাভিজনেনেদং সর্বং বৈ ব্রাহ্মণোহহতি।।” (১/১০০)
অর্থাৎ, পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সেই সব ব্রাহ্মণের সম্পত্তি। শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্য হেতু ব্রাহ্মণ এই সবই পাওয়ার যোগ্য।
(৫) “স্বমেব ব্রাহ্মণ্যে ভুঙতে স্বং বস্তে স্বং দদাতি চ।
আনৃশংস্যাদব্রাহ্মণস্য ভুঞ্জতে হীতরে জনাঃ।।”(১/১০১)
অর্থাৎ, ব্রাহ্মণ নিজের অন্নই ভক্ষণ করেন, নিজের বস্ত্র পরিধান করেন এবং নিজের দ্রব্য দান করেন। অন্য লোকেরা যা ভোগ করে, তা ব্রাহ্মণের দয়া হেতু
সেনযুগে ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। এই পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয় বৌদ্ধদের বিলীন করে এবং বৌদ্ধদের অনুসরণ ও অনুকরণ করে। কথিত হয় যে, কর্ণাট থেকে পঞ্চ ব্রাহ্মণ এনে সেন রাজারা যজ্ঞক্রিয়া সম্পন্ন করেন। লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় ‘পঞ্চরত্ন’ নামে পরিচিত পঞ্চ ব্রাহ্মণ সংস্কৃত কবি ছিলেন। সেযুগের কবি-শাস্ত্রকারদের অধিকাংশই ছিলেন ব্রাহ্মণ; রাজপদোপজীবী ব্রাহ্মণ কর্মচারীর সংখ্যাও কম ছিল না। এ সময় সমাজে ব্রাহ্মণদের আধিপত্য বিস্তৃত হয়। স্মৃতিশাস্ত্রের বিধি অনুযায়ী ব্রাহ্মণরা সমাজের বিধান দিতে থাকে। বল্লালসেন রাজ্যে কৌলীন্য প্রথা প্রচলন করেন। ব্রাহ্মণদের মধ্যে বন্দ্য (বন্দ্যোপাধ্যায়), চট্ট (চট্টোপাধ্যায়), মুখটী (মুখোপাধ্যায়), ঘোষাল, পুততুন্ড, গাঙ্গুলী (গঙ্গোপাধ্যায়), কাঞ্জীলাল ও কুন্দলাল হচ্ছে মুখ্য কুলীন। আর রাঢ়ী, গুড়, মহিন্ত, কুলভী, চৌতখন্ডী, পিপ্পলাই, গড়গড়ি, ঘণ্টাশ্বরী, কেশরকোণা, দিমসাই, পরিহল, হাড়, পিতমুন্ডী ও দীর্ঘতি গৌণ কুলীন হিসেবে পরিগণিত। কিংবদন্তি অনুযায়ী বল্লালসেনের আমলে কুলীন বলে স্বীকৃত হয় লাহিড়ী, বাগচী, মৈত্র, সান্যাল ও ভাদুড়ী এই পাঁচটি গোত্র।
বৌদ্ধমতে, ব্রাহ্মণ বলতে অনাসক্ত, রজঃমুক্ত, লোভ-দ্বেষ-মোহবিহীন এবং ব্রতপরায়ণ, শীলবান, বীতৃষ্ণ, সংযত ও অন্তিম দেহদারী ব্যক্তি ব্রাহ্মণ বলে কথিত হন। যিনি গৃহস্থ ও অনাগারিক উভয়ের প্রতি অসংশ্লিষ্ট, অল্পে ও আলয়বিহীন তিনিই ব্রাহ্মণ। বুদ্ধের জন্মের পূর্বে ভারতে ব্রাহ্মণেরা তাঁদের নিজ মাহাত্ম প্রচারছলে জাতি অভিমান প্রকাশ করত মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ। কিন্তু বুদ্ধের সঙ্গে তেবিজ্জের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, কেবল ত্রিবেদ জ্ঞাত হলে প্রকৃত ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করা যায় না। ব্রাহ্মণত্ব লাভ করার জন্য অসমার্থক তর্ক ও বেদ, মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ভাবনা করা দরকার। যাঁরা এরূপ ভাবনার অধিকারী হয়ে অনাসক্ত নিষ্কলুষ, রজঃমুক্ত, লোভ-দ্বেষ-মোহবিহীন হয় এবং যিনি পাপ পঙ্কিল দুরতিক্রম্য মোহপূর্ণ সংসারাবর্ত মুক্ত হয়েছেন তিনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ। হিন্দুদের বিশ্বাস জাতি দ্বারাই প্রকৃত ব্রাহ্মণ অধিকারী হয় অর্থাৎ প্রকৃত ব্রাহ্মণ হতে হলে ব্রাহ্মণ জাতিতে জন্ম কিংম্বা ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত হতে হবে। কিন্তু বুদ্ধ মতে, ব্রাহ্মণ জাতিতে জন্ম কিংবা ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত হয়ে পাপ মল ত্যাগ না করলে তাঁকে প্রকৃত ব্রাহ্মণ বলা যাবে না। তাঁকে কেবল ব্রাহ্মণ বলে সম্বোধন করা যায়। বংশগৌরব অথবা উচ্চ বংশে জন্ম লাভ করেও শীল গুণে বিভূষিত না-হলে কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারে না। বহুলোক নীচু কুলে জন্মগ্রহণ করেও শীলাচার সম্পন্ন হয়ে পরিশ্রমের দ্বারাই সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্বর্গে গমন করতে পারে। তাই বুদ্ধ বলেছেন, জন্মের দ্বারা কেউ চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হয় না, কর্মের দ্বারাই চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হয়। যিনি বন্ধনমুক্ত কৃতঃকৃত্য অনাশ্রব, কামচিন্তা বিরহিত তিনিই তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ নামের যোগ্য। ব্রাহ্মণ ধ্যানী, একক বিচরণশীল, বস্তুকাম ও ক্লেশকাম পরিহার করে চলেন। যিনি সর্ব সংযোজন ছিন্ন করে ভয়মুক্ত, অনাসক্ত, শৃংখলামুক্ত তিনিই তৃষ্ণাক্ষয়ী ব্রাহ্মণ। ক্রোধপূর্ণ, জটধারী, অজিনচর্ম পরিহিত ব্যক্তি ব্রাহ্মণের যোগ্য হতে পারে না। ক্রোধবিহীন, ব্রতপরায়ণ, শীলবান, সংযমী ও অন্তিম দেহদারী ব্যক্তি তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ বলে যোগ্য হন। যিনি গৃহস্থ ও অনাগরিক উভয়ের প্রতি অসংশ্লিষ্ট অল্পেচ্ছু ও আলয় বিহীন তিনিই তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ। যিনি ছোট-বড় সর্বপ্রকার অদত্ত গ্রহনে বিরত, যাহার কোন প্রকার তৃষ্ণা বিদ্যমান নাই যিনি সংশয়মুক্ত ও নির্বাণ প্রাপ্ত তিনিই ব্রাহ্মণ। তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণেরা অভিমান বা অহংকার করে নিজের গৌরব করে বলত তারাই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে জাতি অভিমান ব্রাহ্মণের কাজ নয়। কারণ জাতি হিসেবে মানুষ সঙ্গে মানুষের কোনো পার্থক্য নেই। তৎকালিন মানব জাতির মধ্যে ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শুদ্রের পদচিহৃ একই ধরনের। প্রাণীদের মধ্যে স্ত্রী, পুরুষ, বর্ণ, শারীরিক গঠন, লোম, চঞ্চু, প্রভৃতি পার্থক্য আছে। কিন্তু মানুষ মানুষে তেমন পার্থক্য দেখা যায় না। বুদ্ধ মতে, যে-কোন ব্যক্তি সকর্ম করলে ব্রাহ্মণের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেন। সম্ভব ও কৃচ্ছসাধনের দ্বারা যে-কোনও লোক ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করতে পারেন। বনের প্রাণীরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। ঠিক তেমনি প্রকৃত শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ ধ্যানপরায়ণ হলে শোভা পায় এবং অনাসক্ত, নিষ্কলুষ, রজঃযুক্ত লোভ দ্বেষ-মোহবিহীন হয়। অবশ্য ২০০২ সালের ৫ অক্টোবর দিল্লির সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত ঐতিহাসিক রায়টির কথাটি স্মর্তব্য। কেরালার আলাঙ্গাদ গ্রামের শিবমন্দিরে জন্মের ভিত্তিতে অব্রাহ্মন এক ব্যক্তিকে পুরোহিত করা নিয়ে স্থানীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের করা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি এস রাজেন্দ্র ও ডুরাই স্বামীর বেঞ্চ রায় দেয় যে যে-কোনও মন্দিরে যে-কোনও বর্ণ বা গোত্রের মানুষ পুজারী হতে পারবেন। কোর্ট আরও আদেশ দেয় যে “শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠানে অনভিজ্ঞ এবং শাস্ত্রজ্ঞানহীন অযোগ্য জন্মসুত্রে কোনো ব্রাহ্মণ বেদপাঠ করতে বা মন্দিরের পুজারী হতে পারবে না। সেখানে বলা হয় যে, “বেদপাঠ,শাস্ত্রজ্ঞান যে-কোনো সাধারণ হিন্দুর থাকলেই সে পুরোহিত বা ব্রাহ্মণ হতে পারবেন। ভারতের সকল হিন্দু ধর্ম প্রতিষ্ঠান ও মন্দিরের ক্ষেত্রে এই আদেশ প্রযোজ্য হবে।” পবিত্র বেদ অনুযায়ী যে-কোনো কেউ-ই যদি শাস্ত্রপাঠের মাধ্যমে জ্ঞানী হতে পারে, তবে সে যজ্ঞ করতে সক্ষম। পবিত্র বেদের বর্ণাশ্রম কর্ম ও গুণভিত্তিক, জন্মভিত্তিক নয়। আর সেটাই আইন করে প্রতিষ্ঠিত করল দিল্লির সুপ্রিম কোর্ট। আর এই রায়ের মাধ্যমে পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্যবাদ ও মূর্খদের বর্ণপ্রথার দর্প চূর্ণ হল, বিজয় লাভ করল পৃথিবীর কোটি কোটি তথাকথিত দলিত, পদাহত, শূদ্র সনাতন ধর্মালম্বী মহৎ প্রাণগণ।
