(৬) রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ : চোলরাজা দেবেন্দ্রবর্মনের ছয় শতকের শিলালিপিতে উত্তর রাঢ় সম্পর্কে প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। রাঢ়ের এ অংশটিকে রাজেন্দ্র চোলের এগারো শতকের তিরুমুলাই শিলালিপিতে সুস্পষ্টরূপে একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক এলাকা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভোজবর্মনের বেলাভ তাম্রলিপিতে উত্তর রাঢ়ের সিদ্ধলা গ্রামকে ভট্টভবদেবের জন্মস্থান হিসাবে নির্দেশ করা হয়েছে। সিদ্ধলাকে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বীরভূম জেলার সিদ্ধলা গ্রামের সঙ্গে এবং নৈহাটি লিপিতে উল্লিখিত বল্লহিহ গ্রামকে বর্ধমান জেলার উত্তর প্রান্তের বালুটিয়ার সঙ্গে শনাক্ত করা হয়েছে। শাণ্ডিল্য গোত্রীয় বন্ধ্যঘাটি গ্রামবাসী, কাশ্যপ গোত্রীয় চট্টগ্রামবাসী, ভরদ্বাজ গোত্রীয় মুখুটিগ্রামী, সাবর্ণী গোত্রীয় গাঙ্গুলি ও কুন্দলাল গ্রামী এবং বাৎস্য গোত্রীয়, ঘোষাল, কাঞ্জিলাল এবং পুতিতুন্ড– এই আট গ্রামীরা রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ।
(৭) বারেন্দ্রীয় কুলীন ব্রাহ্মণ : বরেন্দ্রভূমির নামকরণের পিছনে একাধিক পৌরাণিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। বর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে আশীর্বাদ এবং ‘ইন্দ্র’ শব্দের অর্থ দেবতাদের রাজা। অর্থাৎ ইন্দ্রের বর বা ইন্দ্রের আশীর্বাদ থেকে যে রাজার জন্ম। ‘অদ্ভুৎসাগর’ গ্রন্থে রাজা বরেন্দ্রসেনে এর উল্লেখ আছে, ইন্দ্রের বরে যাঁর জন্ম (পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে) এবং তাঁর রাজ্যটি বরেন্দ্র নামে পরিচিত ছিল। বরেন্দ্রসেন পালরাজা গোপালের সমসাময়িক ছিলেন। সমস্ত বাংলা বৌদ্ধ অধ্যুষিত ছিল, কিন্তু এই রাজ্যটি হিন্দু অধ্যুষিত ছিল। সামন্ত রাজারা একজন রাজাকে মহারাজা হিসাবে নির্বাচন করতে সভা করেন। পরাক্রমশালী রাজা বরেন্দ্রসেন যোগ্য হলেও হিন্দু হওয়ায় বৌদ্ধ সামন্তরাজারা তাঁকে নির্বাচন না করে গোপালকে মহারাজা নির্বাচন করেন। কিন্তু সেনরাজারা নিজেদের শক্তি ক্রমাগত বৃদ্ধি করে পাল সাম্রাজ্যকে নিজেদের হিন্দু সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। বৌদ্ধদের পুনরায় হিন্দু সংস্কারে ফিরিয়ে এনে বর্ণ-কৌলিন্য সংস্কার করেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্রাহ্মণ ডেকে আনে। এই কাহিনির অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে, বরেন্দ্রভূমি ইন্দ্রের পক্ষ থেকে আশীর্বাদস্বরূপ। কৌলিন্য বিচারে সেনরাজারা কুলশ্রেষ্ঠ রাজন্য-ব্রাহ্মণ ছিলেন। রামায়ণ ও মহাভারত গ্রন্থদ্বয়ে বরেন্দ্রভূমিকে ‘পুন্ড্র’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। পুন্ড্র অঞ্চলে বসবাসকারী ব্রাহ্মণ লাহিড়ী, সান্যাল, সরখেল, মৈত্র ও ভাদুড়ী পদবি ব্যবহার করেন।
প্রথম যে ব্রাহ্মণগোষ্ঠী বাংলায় ঘাঁটি গেড়েছিল, তাঁরা খ্রিস্টীয় পঞ্চম/ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারত থেকে এসেছিল। মধ্যদেশ থেকে ব্রাহ্মণদের এই আগমন ধারা অব্যাহত ছিল। অষ্টম শতাব্দী থেকে ব্রাহ্মণ অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়তে থাকল। ব্রাহ্মণরা উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে এসেছিল। এমনকি গুজরাটের লাত অঞ্চলের মতো দূরের দেশ থেকেও আসত। সেসময় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পালরাজারা বাংলা শাসন করতেন। এইসব ব্রাহ্মণরা এসে পালরাজাদের শাসনবিভাগের উচ্চবিভাগে নিযুক্ত হত। এইসব ব্রাহ্মণরা বহিরাগত ছিলেন বলেই হয়তো তাঁরা বেশি মান্যতা পেত। এইসব ব্রাহ্মণদের যাবতীয় বিবরণ আমরা কুলজি গ্রন্থগুলি থেকে পেতে পারি। এখানেই আছে বাংলার ব্রাহ্মণদের বংশবৃত্তান্ত। যেমন– ধ্রুবানন্দ মিশ্রের ‘মহাবংশাবলী’, নুলো পঞ্চাননের ‘গোষ্ঠীকথা’, বাচস্পতি মিশ্রের ‘কুলরাম’, ধনঞ্জয়ের ‘কুলপ্রদীপ’, হরি মিশ্র ও এড় মিশ্রের ‘কারিকা’, সর্বানন্দ মিশ্রের ‘কুলতত্ত্বার্ণব’, বরেন্দ্র কুলপঞ্জিকা ইত্যাদি। তবে কুলজি গ্রন্থগুলির লেখকরা যেসব বর্ণনা করেছেন, তা প্রায়ই পরস্পরবিরোধী ও অসংগতিতে পূর্ণ। আদিশূরের কাহিনি ছাড়া কোনো তথ্যের সঙ্গে কোনো তথ্য মেলে না। তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন আদিশূরের কাহিনির কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। সমসাময়িক কোনো পুথিপত্র ও লেখমালাতেও আদিশূর নামে কোনো রাজার উল্লেখ পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিক নৃপেন্দ্রকুমার দত্ত বলেছেন, আদিশূরের কাহিনি কল্পিত ও বিভিন্ন টুকরো টুকরো অংশ জোড়াতালি দিয়ে পরে রচিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, এই কাহিনির ঐতিহাসিকতা নিয়ে এতটাই সন্দেহের অবকাশ আছে যে, এটাকে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের উপাদান হিসাবে একেবারেই গ্রহণ করা যায় না।
কুণাল চক্রবর্তী তাঁর ‘বহিরাগত’ প্রবন্ধে লিখেছেন– “মধ্যযুগ পর্যন্ত বাংলায় ব্রাহ্মণদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কয়েকটি তথ্য অনস্বীকার্যভাবে উঠে আসে। প্রথম, বাংলায় ব্রাহ্মণরা বহিরাগত। দ্বিতীয়, এদের অধিকাংশেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা যথেষ্ট ছিল না। তৃতীয়, এদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্নতা এতই ব্যাপক ও প্রকট ছিল যে এদের ব্রাহ্মণ– এই একটিমাত্র অভিধায় চিহ্নিত করাই কঠিন ছিল। তবু ব্রাহ্মণরা বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয়-সামাজিক জীবনে দীর্ঘদিন তাঁদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিলেন। তা কী করে সম্ভব হয়েছিল, সেই ইতিহাস অনুসন্ধানের সময় এসেছে।”
যাই হোক, ব্রাহ্মণ হল হিন্দু বর্ণচতুষ্টয়ের প্রথম এবং উচ্চতম বর্ণ। হিন্দুধর্মানুসারে এই বর্ণজাত ব্যক্তিগণই সমাজে শিক্ষক, আধ্যাত্মিক গুরু, শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত এবং বিধানকর্তার ভূমিকা পালন করার অধিকারপ্রাপ্ত। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি মনে করেন, “সেই চরম সম্মানের জায়গাটা তাঁদের নির্ভুল বেদমন্ত্র উচ্চারণের মাহাত্ম্য থেকেও আসেনি, যাগযজ্ঞের আড়ম্বরে একটা মহান গভীরতা তৈরি করে সমাজকে ম্যাজিক দেখিয়েও এই সম্মান আসেনি। এই সম্মান এবং এই ব্রাহ্মণ্য ভারতবর্ষের সর্বোত্তম শিক্ষালাভের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল এবং সেই শিক্ষাও এসেছে ত্যাগ-বৈরাগ্য-তপস্যার চরম অনুশীলন থেকে।” শাস্ত্রানুসারে ব্রাহ্মণকুলজাত ব্যক্তিগণ বিপ্র (অর্থাৎ জ্ঞানী) এবং দ্বিজ (অর্থাৎ দু-বার জাত) হিসাবেও অভিহিত হয়ে থাকেন। ব্রাহ্মণ শব্দটা এসেছে ব্ৰহ্ম থেকে,এক অর্থে, যার রয়েছে ব্রহ্মজ্ঞান সেই ব্রাহ্মণ। বর্ণপ্রথা পাকাঁপোক্ত হয়ে সনাতন ধর্মে চেপে বসার আগে মন্ত্র রচনা করে ব্রাহ্মণ হতে পারতেন যে কেউ। এমনকি জন্মসুত্রে ব্রাহ্মণরা উপাসনার দায়িত্ব ছেড়ে বেছে নিতে পারত অন্য যে-কোনো পেশাও। মহাভারতের বশিস্ট তীর্থ, অর্ধকীল তীর্থ, বিশ্বামিত্র নামক তীর্থস্থানে গেলে ব্রাহ্মণ হতে পারে যে কেউ। পুরাণ মতেও ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্ত হলেই কেবল ব্রাহ্মণত্ব অর্জিত হয়। ঋগ্বেদের দশম মন্ডলে নববই সংখ্যক পুরুষসূক্তের বর্ণনা অনুসারে ব্রাহ্মণের জন্য পুরুষের (স্রষ্টার) মুখ থেকে। মহাভারতের শান্তিপর্বে উল্লিখিত হয়েছে যে, ব্রহ্মা প্রথমে সমগ্র জগৎ ব্রাহ্মণময় করেছিলেন, পরে কর্মানুসারে সকলে নানা বর্ণত্ব প্রাপ্ত হয়; কেউ হয় ব্রাহ্মণ, কেউ ক্ষত্রিয়, কেউ বৈশ্য এবং কেউ বা শূদ্র। মহাভারতে আরও বলা হয়েছে। যে, যিনি সদাচারী ও সর্বভূতে মিত্রভাবাপন্ন, যিনি কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ ত্যাগ করেছেন, যিনি সন্তোষকারী, সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয় ও শাস্ত্রজ্ঞ, তিনিই ব্রাহ্মণ; অর্থাৎ গুণ ও কর্মানুসারে ব্রাহ্মণাদি চতুর্বর্ণের সৃষ্টি, জন্মানুসারে নয়। পরবর্তীকালে অবশ্য জন্মসূত্রে বর্ণ নির্ধারণ-ব্যবস্থা প্রচলিত হয়। ব্রাহ্মণদের মধ্যে নানা শ্রেণিভেদ আছে। অনেকের মতে এই শ্রেণির সংখ্যা ২০০০। এক সারস্বত ব্রাহ্মণদের মধ্যেই ৪৬৯টি শাখা আছে। শ্রেণি অনুযায়ী ব্রাহ্মণদের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হয়। বাংলায় আচার্য বা গণক এবং শাকদীপি ব্রাহ্মণেরা পতিত বলে গণ্য হয়। নিম্নবর্ণের পৌরোহিত্য করে বলে বর্ণ ব্রাহ্মণরাও পতিত। তেমনি অগ্রদানী, ভাট ও পিরালি ব্রাহ্মণরাও সমাজে হীনরূপে দেখা হয়। বাংলার বাইরে মন্দিরের পূজারী হওয়ার জন্য তামিল ও কর্ণাট ব্রাহ্মণরা সমাজে অপাঙক্তেয়। নাম্বুদ্ৰী ব্রাহ্মণরা সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। নৃতাত্ত্বিক বিচারে বাংলার ব্রাহ্মণদের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের ব্রাহ্মণদের মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। সবচেয়ে বড়ো অমিল বাংলার ব্রাহ্মণরা আমিষাশী, বাংলার বাইরের ব্রাহ্মণরা নিরামিষাশী। বাংলার ব্রাহ্মণরা খুব কম সংখ্যকই আর্য বংশোদ্ভূত। তাঁরা চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতকে বাংলায় আসেন এবং তাঁদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি করে। তবে পাল আমলে বৌদ্ধধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া এবং যাগ-যজ্ঞ ভুলে যাওয়ার ফলে তাঁদের পতিত ও শাস্ত্র অনুযায়ী শূদ্রে পরিণত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। মধ্যযুগীয় সমাজে ব্রাহ্মণরা সকল বর্ণ বা সম্প্রদায়ের মানুষের হাতে জল গ্রহণ করত না। তবে তিলি, তাঁতি, মালাকার প্রভৃতি মাত্র নয়টি সম্প্রদায়ের হাত থেকে জলগ্রহণের রীতি চালু ছিল। ধর্মশাস্ত্রে ব্রাহ্মণদের অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে–
