(২) পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ : পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণরা হল ভারতের হিন্দুধর্মের দুটি বৃহত্তর ব্রাহ্মণগোষ্ঠীর একটি। পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ ছাড়া দ্বিতীয় প্রকার গোষ্ঠীটি পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ নামে পরিচিত। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে কলহণের কাশ্মীরের ইতিহাস বিষয়ে রচিত ‘রাজতরঙ্গিনী’ গ্রন্থে বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণভাগে অবস্থিত পাঁচটি পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করা রয়েছে। এগুলি হল– (১) কর্ণাটক (কন্নড়ভাষী সহ তৎসংলগ্নভাষী ব্রাহ্মণ), (২) তৈলঙ্গ (তেলুগু ব্রাহ্মণ), (৩) দ্রাবিড় (তামিলনাড়ু ও কেরালা অঞ্চলের ব্রাহ্মণ), (৪) মহারাষ্ট্রক (মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ) এবং (৫) গুর্জর (গুজরাট ও রাজস্থানের দক্ষিণাঞ্চলের ব্রাহ্মণ)
মারাঠা সাম্রাজ্যের সময়কালে দক্ষিণাত্যের মারাঠাদের অঞ্চলে আমলাতান্ত্রিক জমি জরিপ ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। নথি অনুসারে ব্রাহ্মণদের মধ্যে পাঁচ প্রকার পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণের উল্লেখ রয়েছে। সেগুলি হল –(১) অন্ধ্র পূর্ব ব্রাহ্মণ, (২) অন্ধ্র-পশ্চিম ব্রাহ্মণ, (৩) কর্ণাটক ব্রাহ্মণ, (৪) দ্রাবিড় ব্রাহ্মণ এবং (৫) দেশাষ্ট ব্রাহ্মণ।
আমলাতান্ত্রিক সম্প্রদায়ভিত্তিক নথি ‘কৈফিয়ৎ’ অনুসারে গুর্জর ব্রাহ্মণরা পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণদের অন্তর্গত। নথিটিতে এই পঞ্চদ্রাবিড়দের ১৬ টি উপবিভাগে ভাগ করা হয়েছে, সেগুলি হল– (১) কোঙ্কণাষ্ট, (২) কহাড়ে, (৩) বড়কারি, (৪) মধ্যদিন, (৫) বনাস, (৬) কর্ণাটক, (৭) ষষ্টিক, (৮) নন্দবংশিক, (৯) তৈলঙ্গ, (১০) শ্রীবৈষ্ণব, (১১) শখিকন্থ, (১২) কীবন্ত, (১৩) সিহাবসৈ, (১৪) নুরচের, (১৫) সেনবী/সেনই/সেন এবং (১৬) গোবলকোণ্ডে।
(৩) পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ : পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণরা হল ভারতের হিন্দুধর্মের দুটি বৃহত্তর ব্রাহ্মণগোষ্ঠীর একটি। পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ ছাড়া দ্বিতীয় প্রকার গোষ্ঠীটি ‘পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ’ নামে পরিচিত। আগেই আলোচনা করেছি। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে কলহণের কাশ্মীরের ইতিহাস বিষয়ে রচিত ‘রাজতরঙ্গিনী’ গ্রন্থে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তরভাগে অবস্থিত পাঁচটি পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করা রয়েছে। স্কন্দপুরাণেও এই গোষ্ঠীবিভাগগুলির বিন্যাস রয়েছে। এগুলি হল– (১) সারস্বত ব্রাহ্মণ, (২) গৌড় ব্রাহ্মণ, (৩) কান্যকুজ ব্রাহ্মণ, (৪) মৈথিল ব্রাহ্মণ এবং (৫) উকল ব্রাহ্মণ।
স্কন্দপুরাণের একটি অংশ হিসাবে বিবেচিত সহ্যাদ্রিখণ্ডেও উপরোক্ত শ্রেণিবিন্যাসেরই উল্লেখ আছে। মারাঠা সাম্রাজ্যের সময়কালে দক্ষিণাত্যের মারাঠাদের অঞ্চলে আমলাতান্ত্রিক জমি জরিপ ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। নথি অনুসারে ব্রাহ্মণদের মধ্যে পাঁচ প্রকার পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণের উল্লেখ আছে। সেগুলি হল –(১) কান্যকুজ ব্রাহ্মণ, (২) কামরূপী ব্রাহ্মণ, (৩) উৎকল ব্রাহ্মণ, (৪) মৈথিল ব্রাহ্মণ এবং (৫) গুর্জর ব্রাহ্মণ। আমলাতান্ত্রিক সম্প্রদায়ভিত্তিক নথি ‘কৈফিয়ৎ’ অনুসারে পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণরা সাধারণত স্মার্ত, বৈষ্ণব কিংবা ভাগবতের অনুসারী হয়ে থাকেন।
(৪) বৈদ্য ব্রাহ্মণ : বৈদিক সময়ে বঙ্গ-বিহার ও নেপালের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল বিদেহ রাজ্য, বিদেহ রাজ্যের ব্রাহ্মণরা বৈদহ ব্রাহ্মণ বা বৈদ্য ব্রাহ্মণ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁরা বৈদিক যজ্ঞাদি এবং বৈদিক চিকিৎসাশাস্ত্র চর্চা করতেন। বৈদ্য অর্থ বেদজ্ঞ হলেও কালক্রমে এটি চিকিৎসক বোঝাতে বেশি ব্যবহৃত হয়। আধ্যাত্মিক ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্র ‘আয়ুর্বেদ অনুশীলনকারী সম্প্রদায় বৈদ্য ব্রাহ্মণ হিসাবে পরিচিত। এঁদেরকে ‘ত্রিজ’ বলেও অভিহিত করা হত। বিদেহ রাজ্যে ‘ত্রিজভূক্তি’ নামে একটি অঞ্চল ছিল, যা এখনও বিদ্যমান নেপালের ত্রিরাই নামক জায়গায়। বাংলাতেই সবচেয়ে বেশি বৈদ্য ব্রাহ্মণ দেখা যায়। সেন, গুপ্ত, সেনশর্মা, সেনগুপ্ত ইত্যাদি পদবির সম্প্রদায় বৈদ্য ব্রাহ্মণ বলে পরিচিত। যদিও সেনরা রাজশাসনে যুক্ত হলে ‘ব্ৰহ্ম-ক্ষত্রিয়’ বা ‘রাজন্য-ব্রাহ্মণ বলে আত্মপ্রকাশ করে।
প্রবীণ অনুশীলনকারী বা শিক্ষকদের সম্মানের চিহ্ন হিসাবে ‘বৈদ্যরাজ’ বলা হত। কিছু অনুশীলনকারী যাঁদের গ্রন্থগুলির সম্পূর্ণ জ্ঞান ছিল এবং অনুশীলনে দক্ষ ছিলেন তাঁরা প্রাণাচার্য’ নামে পরিচিত ছিলেন। ভারতের কিছু রাজপরিবারের ব্যক্তিগত বৈদ্য ছিল এবং তাঁদের রাজবৈদ্য (রাজার চিকিৎসক)। হিসাবে উল্লেখ করা হত। প্রচলিত একটি মতে দেবাসুরের সমুদ্র মন্থনকালে ধন্বন্তরীর জন্ম হয় এবং বৈদ্যরা তাঁর উত্তরপুরুষ। অন্য মতে ধন্বন্তরীর জন্ম হয়
জনৈক মুনির বৈদিক মন্ত্র জপের মাধ্যমে খড়ের গাদা থেকে, তাই তিনি বৈদ্য নামে পরিচিত হন। যেহেতু তাঁর পিতা ছিল না এবং তিনি এক পালিকা মায়ের আদর-যত্নে বড়ো হন, সেহেতু তাঁকে বলা হয় ‘অম্বষ্ঠ’। বৈদ্য ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একটি মতও প্রচলিত আছে যে, অম্বষ্ঠ নামে সিন্ধুনদের তীরে একটি অঞ্চল ছিল। সেখান থেকে বৈদ্যদের একটি দল দক্ষিণ ভারতে এবং অপর দলটি বাংলায় আসেন।
(৫) চক্রবর্তী (পদবি) ব্রাহ্মণ : বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণদের কোনো পদবি ছিল না। ব্রাহ্মণরা সবসময়ই সদাচারী, সত্যান্বেষী এবং সৎ ছিলেন। ব্রাহ্মণদের পুজো অর্চনা, বেদপাঠ ও যোগসাধনা ছিল প্রধান কর্ম। তা ছাড়া ব্রাহ্মণরা শিক্ষানুরাগী ছিলেন। প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে শিক্ষার গুরু দ্বায়িত অর্পিত ছিল ব্রাহ্মণদের উপর, তাই টোলের শিক্ষকতা ছিল তাঁদের অন্যতম পেশা। ব্রাহ্মণরা নিজেদের সংকল্পার্থে নিজিদের পদবি ‘দেবশর্মা ব্যবহার করতেন। কালক্রমে পুন্ড্র শাসন ব্যবস্থায় ব্রাহ্মণদের ‘আচার্য’ বা ‘শাস্ত্রী’ উপাধি প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ‘দেবশর্মা’ পদবিটি হারাতে বসে। পাল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ধর্মপালের শাসনকালে বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রাহ্মণদের মধ্যে অনেকেই রাজকার্যে যোগদান করেন। তাই ব্রাহ্মণদের সম্রাট হিসাবে ‘চক্রবর্তী’ পদবির উদ্ভব হয়। চক্রবর্তী শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। চক্রবর্তী শব্দের অর্থ সম্রাট। চক্রবর্তীর ভাবার্থ হচ্ছে রাজ্যাধিপতি, অর্থাৎ রাজার রাজা। সহজভাবে বলতে গেলে চক্র অর্থ হচ্ছে ‘চাকা’ এবং বর্তী অর্থ হচ্ছে ‘সুশাসন’ চালিয়ে যাওয়া।
