(৩) নিন্দা ও বিরোধী মতের সমালোচনা তার খণ্ডন ও পরিহারকে বলে নিন্দা।
(৪) প্রশংসা : ব্রাহ্মণগুলিতে কোনো কোনো ক্রিয়ার অনুমোদনের জন্য সেগুলির স্তুতি বা প্রশংসা করা হয়েছে।
(৫) পুরাকল্প : অতি প্রাচীনকালে যেসব যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়েছে বা দেবতাগণের (?) অনুষ্ঠিত যাগযজ্ঞাদির যেসব কাহিনি ব্রাহ্মণগুলিতে উল্লিখিত হয়েছে সেইসব বৃত্তান্ত পুরাকল্পের মধ্যে পড়ে।
(৬) পরকৃতি : যজ্ঞকর্মে অভিজ্ঞ খ্যাতনামা পুরোহিতগণের কীর্তি, বিখ্যাত রাজাদের যাগযজ্ঞ, দান, দক্ষিণা প্রভৃতি বিবরণই প্রকৃতি।
ব্রাহ্মণ সাহিত্যে বৈশিষ্টগুলি লক্ষ্যণীয়। দেখা যাক–
(১) ঋগবেদের ব্রাহ্মণে হোতা, যজুর্বেদের ব্রাহ্মণে অধ্বর্য, সামবেদের ব্রাহ্মণে উদগাতার করণীয় বিষয়ের উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
(২) ব্রাহ্মণ সাহিত্যের অধিকাংশ গদ্যে লেখা।
(৩) ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলিতে বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা প্রসঙ্গে আখ্যায়িকার অবতারণা করা হয়েছে। কিছু কিছু বৈদিক ভাষা ব্যাখ্যা এবং বিশেষ বিশেষ বৈদিক শব্দের ব্যুৎপত্তি পাওয়া যায়।
(৪) ব্রাহ্মণের অর্থবাদ বাক্যের মধ্যে পরবর্তীকালে দর্শন, ব্যাকরণ ও ভাষাতত্ত্বের বীজ নিহিত ছিল।
(৫) প্রতিটি ব্রাহ্মণে বিভিন্ন যজ্ঞের খুঁটিনাটি বর্ণনার সঙ্গে যজ্ঞকর্মে পুরোহিতের প্রাধান্যই বর্ণিত।
এখন প্রশ্ন ব্রাহ্মণ সাহিত্যে প্রয়োজনীয়তা বা উপযোগিতা কি কিছু আছে? প্রয়োজনীয়তা বা উপযোগিতা আছে কি না সেটা আপনারাই বিচার করুন। আমি শুধু উল্লেখ করব–
(১) যদি সমাজচিত্রটা দেখি, তাহলে দেখব বৈদিক ভারতের জাতিভেদ, ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণের মধ্যে শক্তির দ্বন্দ্ব, প্রত্যেক বর্ণের জীবিকা, শিক্ষা, স্ত্রীশিক্ষা, বিবাহসংস্কার, কৃষিবাণিজ্য, খাদ্য প্রভৃতি বর্ণিত আছে।
(২) ঐতিহাসিক মূল্যের দিকটা যদি দেখি, তাহলে দেখব ভারতের পরবর্তীকালের ধর্ম ও দার্শনিক তত্ত্বের ইতিহাসে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের মূল্য অপরিসীম।
(৩) আখ্যানভাগের দিকটা যদি বলি, তা অবশ্য যারপরনাই রোমাঞ্চকর এবং বহুমাত্রিক। যেমন –(ক) শতপথ ব্রাহ্মণের পুরূরবা-উর্বশীর কাহিনি (১১.৫.১), (খ) মনুমৎস্যকথা (১.৮.১), (গ) ঐতরেয় ব্রাহ্মণে শুনঃশেপ আখ্যান (৭/১৩ ১৮)।
(৪) নীতিবোধ শিক্ষাও পাওয়া যায়। যেমন –(ক) শতপথ ব্রাহ্মণের নীতিবোধে বিশেষত যৌন সম্পর্কিত নীতির আভাস পাই। সেখানে এক ব্যক্তির স্ত্রীর পক্ষে অপর ব্যক্তির সহবাস পাপজনক বিবেচিত হত। (খ) আমরা হরিশ্চন্দ্রপুর রোহিতের উদ্দেশ্যে ইন্দ্রের মুখে শুনি চরিষ্ণু মানবজীবনের এগিয়ে চলার মন্ত্র– “চরৈবেতি” অর্থাৎ “চল চল”।
(৫) ব্রাহ্মণ সাহিত্য বহুমুখী সভ্যতা ও কৃষ্টির আকর বলে পরিগণিত হয়েছে। এতে আমরা পাই নৃত্যবাদ্যাদি, ললিতকলা, রাজনীতি, যুদ্ধবিদ্যা, স্থাপত্যবিদ্যা, ব্যাকরণ, ভাষাতত্ত্ব, অপরাধশাস্ত্র, নৌবিদ্যা, পশুপক্ষী ও ভেষজবিজ্ঞান প্রভৃতি।
(৬) তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে ইন্দ্র-ভরদ্বাজের কাহিনিতে (৩/১০) ব্রহ্মচর্যের মহিমা কীর্তন বর্ণিত হয়েছে।
আর্যরা ভারতের মানুষকে চারটি জাতিকে ভাগ করেছে। শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে– প্রকৃতির তিনটি গুণ ও কর্ম অনুসারে আমি মানবসমাজকে চারটি বর্ণবিভাগ সৃষ্টি করেছি। আমি এই প্রথার স্রষ্টা হলেও আমাকে অকর্তা এবং অব্যয় বলে জানবে।
“চাতুবর্ণং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম।।”
ভাগবদগীতার সিদ্ধান্ত অনুসারে বর্ণবিন্যাস জন্মসূত্রে নয়, বরং গুণ অনুসারে নির্ণীত হয়। উপরের শ্লোক অনুসারে বর্ণবিভাগ যে জন্মানুসারে নয়, বরং কর্মানুসারে তা শতভাগ নিশ্চিত। তাই একই গোত্রের কর্ম ও গুণ অনুসারে চারটি বর্ণ থাকতে দেখা যায়। কেউ যদি শাস্ত্র অধ্যায়ন তথা বুদ্ধিভিত্তিক কাজে পারদর্শী হন এবং সেভাবে জীবিকা অর্জন করে তবে সে ব্রাহ্মণ। পরিচালনায় দক্ষ হলে ক্ষত্রিয়। ব্যাবসা-বাণিজ্যে জীবিকা নির্বাহ করলে সে বৈশ্য এবং সকল পেশার লোক পেশার লোকদের সেবাকারীর কোনো বৃত্তি হলে সে শূদ্র বলে গণ্য হবে।
ব্রাহ্মণ কে? মনুসংহিতায় বলা হয়েছে–
“লোকানান্তু বিবৃদ্ধ্যর্থং মুখবাহ্রুপাদতঃ।
ব্রাহ্মণং ক্ষত্রিয়ং বৈশ্যং শূদ্রঞ্চ নিরবর্তয়ৎ।।”
অর্থাৎ লোকবৃদ্ধির জন্য (স্রষ্টা) মুখ, বাহু, ঊরু ও পদ থেকে যথাক্রমে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ এবং শূদ্র সৃষ্টি করলেন।
ঋগ্বেদ বলছে–
“ব্রাহ্মণোহস্য মুখমাসীদ বাহু রাজন্য কৃতঃ।
উরু তদস্য যদ্বৈশ্যঃ পদভ্যাং শুদ্ৰো অজায়ত।।”
অর্থাৎ ব্রাহ্মণেরা মানবসমাজের মুখ স্বরূপ, ক্ষত্রিয় বাহু স্বরূপ, বৈশ্য উরু স্বরূপ এবং শূদ্র পাদ স্বরূপ।
শাস্ত্র অনুসারে ব্রাহ্মণদের কয়েকটা ভাগ পাওয়া যায়। যেমন– (১) সারস্বত ব্রাহ্মণ (২) পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ (৩) পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ (৪) বৈদ্যব্রাহ্মণ (৫) চক্রবর্তী (পদবী) ব্রাহ্মণ (৬) রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ এবং (৭) বারেন্দ্রীয় কুলীন ব্রাহ্মণ।
(১) সারস্বত ব্রাহ্মণ : সারস্বত ব্রাহ্মণরাই মূল বৈদিক শ্রেণি। এঁরা শাকদ্বীপ (ইউরোপ) থেকে এসে ঋগ্বেদে উল্লেখিত সরস্বতী নদী বিধৌত অঞ্চল গান্ধার (আফগানিস্তান), আর্য (ইরান), পাকিস্তান অঞলে বসে বেদ দৃষ্ট হন। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে এই অঞ্চল গ্রিক রাজ্যের অধিনে যায় এবং ব্যাকট্রিয়া রাজধানী হয়। তাঁরা আস্তে আস্তে জম্বুদ্বীপ (বর্তমান ভারত) আসেন এবং বেদ প্রচার চালিয়ে যান। দ্বিতীয় শতাব্দীতে একজন সারস্বত ব্রাহ্মণ বিন্ধ্যাচল থেকে দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত রাজা হন, যা ‘বাকাটক রাজবংশ হিসাবে পরিচিত। এঁরাই সর্বপ্রথম পদবি হিসাবে ‘সেন’ ব্যবহার শুরু করেন। পুরাণে এঁদের ‘মূর্ধাভিষিক্ত ব্রাহ্মণ’ বা ‘ব্ৰহ্মক্ষত্রিয়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এঁরা বৈদিক জাতির ‘মূর্ধা’ বা মস্তকে অভিষিক্ত এবং মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, ব্রহ্মার মস্তকের সর্বোচ্চ স্থান থেকে এঁদের জন্ম হয়েছে। এই বংশের দ্বিতীয় রুদ্রসেনের সঙ্গে গুপ্ত রাজবংশের প্রভাবতী গুপ্তের বিবাহ হয় এবং দুই রাজবংশের মিত্রতা হয়। ফলে সারস্বত ব্রাহ্মণরা পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে বেদ প্রচারের সুযোগ পান এবং সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েন। এই সময়কে বৈদিকধর্ম ও সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের স্বর্ণযুগ হিসেবে ধরা হয়। কৌলিন্য ও বর্ণ সমীকরণের অধিকার শুধুমাত্র সারস্বত ব্রাহ্মণদের ছিল। এঁরা বিভিন্ন অঞ্চলের নাম অনুযায়ী ব্রাহ্মণ সমাজের নামকরণ করেছিলেন। দাক্ষিণাত্য শাসনের সুবাদে সবচেয়ে বেশি সারস্বত ব্রাহ্মণ দাক্ষিণাত্য ও বিন্ধ্যপর্বত অঞ্চলে বসবাস করে। পাল শাসনকালের সময় গৌড় এবং কামরূপের নিকটাধীন একটি অঞ্চলে এঁরা বাস করত বলে ষষ্ট শতাব্দীর ভাস্করবর্মার তাম্রশাসনে ব্রাহ্মণ জমিদানে এঁদের নাম দেখা যায়। পরবর্তীতে বরেন্দ্রসেন একটি ক্ষুদ্র রাজ্য গড়ে তোলেন, যা ‘বরেন্দ্রভূমি’ হিসাবে পরিচিত। এটি পাল সাম্রাজ্যের সময় সামন্ত রাজ্য হিসাবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে এই রাজ্যের সারস্বত ব্রাহ্মণ বীরসেনের ঔরসে এবং গৌড় সারস্বত ব্রাহ্মণ কন্যা সোমটা দেবীর গর্ভজাত বংশধরেরা পাল সাম্রাজ্য অধিকার করে এবং আসমুদ্রহিমাচল সেন সাম্রাজ্যের সূচনা করে। বৌদ্ধ প্রধান। বাংলায় হিন্দু প্রাধান্য সৃষ্টি করে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্রাহ্মণ ডেকে আনেন। বিভিন্ন অঞ্চলে বৈদিকধর্ম প্রচারের জন্য দূত প্রেরণ করে। বেদানুসারে বর্ণ ও কৌলিন্য সমীকরণ করে। তিন যুগ বা ৩৬ বছর পরপর এই সমীকরণ হত এবং কর্মানুযায়ী বর্ণ ও কৌলিন্য নির্ধারণ হত। এই সমীকরণের কারণে সারস্বত সমাজে সম্প্রদায়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। আধুনিক হিসাব অনুযায়ী ৪৬০ প্রকারের সারস্বত শ্রেণি আছে।
