উপসংহারে একটা বলতে চাই, সরস্বতী মূলত হিন্দুদের দেবী। বিশেষ করে বাঙালি বিদ্যার্থীদের কাছে একমাত্র উপাস্য। খ্রিস্টান, মুসলমান, শিখ এবং অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীদের দেবী নয়। তবে স্কুল-কলেজে সরস্বতী পুজোর আয়োজন। করা শুধু অশোভনীয়ই নয়, অন্যায়। ভারতবর্ষ কোনো হিন্দু রাষ্ট্র নয়, এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ভারতবর্ষের কোনায় কোনায় স্কুল-কলেজগুলিতে শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাত্রছাত্রীরাই পাঠ নেন না, পাঠ নেয় সব ধর্মের ছাত্রছাত্রীরা। অন্য ধর্মের ছাত্রছাত্রীদের ভিন্ন ধর্মের সরস্বতী বন্দনা চাপিয়ে দেওয়া অসাংবিধানিক। যদি জোর করে সরস্বতী-বন্দনা চাপিয়ে হয়, তবে তা হবে সাংবিধানিক অধিকার হরণের সামিল। সরকারি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় পুজোর কোনো নিয়ম নেই, তবু বিদ্যার দেবী হিসাবে সরস্বতী স্কুল, পাঠশালা কিংবা কলেজে পুজো পেয়ে থাকে। হিন্দু ধ্বজাধারী কোনো স্কুল কলেজে পুজো-পার্বণ হতেই পারে, তাই বলে সর্বসাধারণের স্কুল-কলেজগুলিতে এই পুজো কতটা প্রাসঙ্গিক, প্রশ্ন উঠতে পারে। ভেবে দেখতে বলি সবাইকে।
ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং ভারতীয় সমাজ
ব্রাহ্মণ কে বা কারা? ব্রাহ্মণ কেন? ব্রাহ্মণ্যবাদই-বা কী– এরকম হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল আমাকে। সোস্যাল মিডিয়াগুলিতে সারাদিন ব্রাহ্মণ্যবাদের পোস্ট দিচ্ছে বর্ণবাদে ক্ষিপ্ত মানুষ। তাঁদের কাছে ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ সমার্থক। সেই মুহূর্তে আমি উত্তর দিতে পারিনি– এতগুলি প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া সম্ভবও ছিল না সেদিন। কিন্তু উত্তর তো খুঁজতে হবে। অতএব গাঁইতি-শাবল নিয়ে ইতিহাস খননের অভিযানে হাঁটতে হবে। আমরা সাধারণত দুটি ক্ষেত্রে ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দটির অস্তিত্ব জানতে পারি। একটি বেদের অংশ ব্রাহ্মণ (যা ব্রাহ্মণ সাহিত্য হিসাবে পরিচিত), অন্যটি বর্ণাশ্রমের প্রথম সারির বর্ণ ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণ হল হিন্দু শ্রুতি শাস্ত্রের অন্তর্গত গ্রন্থরাজি। এগুলি বেদের ভাষ্য। ব্রাহ্মণ গ্রন্থাবলির মূল উপজীব্য যজ্ঞের সঠিক অনুষ্ঠানপদ্ধতি। প্রত্যেকটি বেদের নিজস্ব ব্রাহ্মণ রয়েছে। যোড়শ মহাজনপদের সমসাময়িককালে মোট কতগুলি ব্রাহ্মণ প্রচলিত ছিল তা জানা যায় না। মোট ১৯টি পূর্ণাকার ব্রাহ্মণ অদ্যাবধি বিদ্যমান: এগুলির মধ্যে দুটি ঋগবেদ, ছয়টি যজুর্বেদ, দশটি সামবেদ ও একটি অথর্ববেদের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়াও কয়েকটি সংরক্ষিত খণ্ডগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণগুলির আকার বিভিন্ন প্রকারের। শতপথ ব্রাহ্মণ ‘সেক্রেড বুকস অফ দি ইস্ট’ গ্রন্থের পাঁচ খণ্ড জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে; আবার বংশ ব্রাহ্মণের দৈর্ঘ্য মাত্র এক পৃষ্ঠা। বেদোত্তর যুগের হিন্দু দর্শন, প্রাক বেদান্ত সাহিত্য, আইন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যামিতি, ব্যাকরণ (পাণিনি), কর্মযোগ, চতুরাশ্রম প্রথা ইত্যাদির বিকাশে ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির ভূমিকা অনস্বীকার্য। কোনো কোনো ব্রাহ্মণের অংশগুলি আরণ্যক বা উপনিষদের মর্যাদাপ্রাপ্ত। ব্রাহ্মণের ভাষা বৈদিক সংস্কৃত থেকে পৃথক। এই ভাষা সংহিতা (বেদের মন্ত্রভাগ) অংশের ভাষার তুলনায় নবীন, তবে এর অধিকাংশই সূত্র সাহিত্যের ভাষার তুলনায় প্রবীন। ব্রাহ্মণগুলি লৌহযুগ অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব নবম, অষ্টম ও সপ্তম শতাব্দীতে রচিত। কয়েকটি নবীন ব্রাহ্মণ (যেমন শতপথ ব্রাহ্মণ) সূত্র সাহিত্যের সমসাময়িক, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে রচিত। ঐতিহাসিকভাবে ব্রাহ্মণ গ্রন্থাবলির রচনাকাল পরবর্তী বৈদিক যুগের উপজাতীয় রাজ্যগুলির ষোড়শ মহাজনপদ রূপে উত্তরণের কাল। বৈদিক মন্ত্রের নানাপ্রকারের ব্যাখ্যাসহ বেদের যে অংশে যাগযজ্ঞাদির বিবরণ পাওয়া যায় তাকেই ব্রাহ্মণ সাহিত্য বলে। অন্যভাবে বললে মন্ত্র-ব্রাহ্মণাত্মক বেদের অংশ হল ব্রাহ্মণ (অন্যটি সংহিতা)।
ব্রাহ্মণ শব্দটি ‘ব্ৰহ্মণ’ শব্দ থেকে উৎপন্ন। যার অর্থ গূঢ়শক্তিসম্পন্ন শব্দ। বলবর্ধক এবং আরোগ্যকর মন্ত্রগুলি যাঁরা উচ্চারণ করতেন তাঁদের ব্রহ্ম বলা হত। ব্রহ্ম-উক্তির যোগফল হল ব্রাহ্মণ সাহিত্য। অর্থাৎ পুরোহিত ব্রাহ্মণদের যজ্ঞ সংক্রান্ত বিভিন্ন উক্তি যেখানে লিপিবদ্ধ আছে তার নাম ব্রাহ্মণ। কারোর মতে বেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলেই এই গ্রন্থ ব্রাহ্মণ সাহিত্য। এবার চতুর্বেদের ব্রাহ্মণগুলি জেনে নিতে পারি–
(১) ঋকবেদের ঐতরেয় এবং কৌষিকী (বা সাংখ্যায়ন) ব্রাহ্মণ,
(২) সামবেদের পঞ্চবিংশ, ষড়বিংশ, সামবিধান, আর্যেয়, দৈবত, ছান্দোগ্য, সংহিতোপনিষৎ, বংশ, শাট্যায়ন, জৈমিনীয় বা তলবকার ব্রাহ্মণ,
(৩) কৃষ্ণযজুর্বেদে তৈতিরীয় এবং শুক্লযজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণ,
(৪) অথর্ববেদের গোপথ ব্রাহ্মণ।
পণ্ডিত আপস্তম্ব বেদের ব্রাহ্মণভাগের বিস্তৃত বিবরণ দিয়ে বলেছেন প্রধানত ছয়টি বিষয় ব্রাহ্মণে আলোচনা করা হয়েছে–
(১) বিধি : বিশেষ বিশেষ যজ্ঞকর্ম অনুষ্ঠানের জন্য যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাকে বিধি বলে।
(২) অর্থবাদ : বেদমন্ত্রের অর্থ এবং বিবিধ ক্রিয়াকাণ্ড সম্পর্কে ব্রাহ্মণগুলিতে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে দর্শনগত, ব্যাকরণগত এবং ভাষা সংক্রান্ত আলোচনা হয়েছে।
