শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পুজো সম্পন্ন করা যায়। সরস্বতীর পুজো সাধারণ পুজোর নিয়মানুসারেই হয়। তবে এই পুজোয় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। যেমন অভ্র-আবীর, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ। পুজোর জন্য বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুলও প্রয়োজন হয়। লোকাঁচার অনুসারে, ছাত্রছাত্রীরা পুজোর পূর্বে কুল ভক্ষণ করেন না পুজোর দিন কিছু লেখাও নিষিদ্ধ। যথাবিহিত পুজোর পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার (দোয়াত-কলম), পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পুজো করার প্রথা প্রচলিত আছে। পুজোর শেষে পুস্পাঞ্জলি দেওয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের দল বেঁধে অঞ্জলি দিয়ে থাকে।
কেউ কেউ বলেন, মর্ত্যধামে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে প্রথম বারের মতো শ্রীশ্রী সরস্বতী দেবী পুজোর প্রচলন করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শৈশব কাল থেকেই সরস্বতী পুজো প্রচলন করে সমগ্র পৃথিবীর শিক্ষার্থীদের সরস্বতী পুজোর গুরুত্ববহ বিদ্যার্জন ও বিদ্যালয়সমূহে সরস্বতী পুজোর প্রচলন করে গেছেন, যা এখনও পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত রয়েছে। সরস্বতী পুজো স্বৰ্গমর্তে, উভয়লোকে দেবতা, গন্ধর্ব, কিন্নর, ঋষি, মহর্ষি, রাজা-প্রজা সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে করে আসছে। সরস্বতী পুজোর অঞ্জলি দেওয়ার সময় পলাশ ফুলের ব্যবহার ভগবান শ্রীকৃষ্ণই প্রচলন করেন। বলে অনেকে মনে করেন। শ্রীকৃষ্ণের বয়স তখন ৭ বছর।
পুস্পাঞ্জলী মন্ত্রঃ
ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।।
নমঃভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ।।
বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যা-স্থানেভ্য এব চ।।
এস স-চন্দন পুষ্পবিল্ব পত্রাঞ্জলি সরস্বতৈ নমঃ।।
প্রণাম মন্ত্রঃ
নমো সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী বিদ্যাংদেহি নমোহস্তুতে।।
জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।।
সরস্বতীর স্তবঃ
শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেত পুষ্পোপশোভিতা।
শ্বেতাম্ভরধরা নিত্যা শ্বেতাগন্ধানুলেপনা।।
শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চ্চিতা।
শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারবভূষিতা
বন্দিতা সিদ্ধগন্ধর্বৈৰ্চিতা দেবদানবৈঃ।
পূজিতা মুনিভি: সৰ্ব্বৈঋষিভিঃ স্কয়তে সদা।।
স্তোত্রেণানেন তাং দেবীং জগদ্ধাত্রীং সরস্বতীম্।
যে স্মরতি ত্রিসন্ধ্যায়ং সৰ্বাং বিদ্যাং লভন্তি তে।।
নদী সরস্বতীর মহিমা ভারতবাসীর মনে এত রেখাপাত করেছিল যে, পরবর্তীকালে গঙ্গা সরস্বতীর স্থান দখল করলেও তাঁরা তাঁকে ভুলতে পারেনি। প্রয়োগে অন্তঃসলিলারূপে গুপ্তভাবে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গে সরস্বতীর সঙ্গম, পশ্চিমবঙ্গে হুগলি জেলার ত্রিবেণীতে গঙ্গার স্রোত ধারা থেকে সরস্বতীর মুক্তি হিন্দুদের প্রিয় ও পবিত্র বিশ্বাস। সরস্বতী নিয়ে নানা ব্যাখ্যা নানা বিশ্লেষণ প্রচলিত আছে। তাই সঠিক সিদ্ধান্তে যাওয়ার চেষ্টা করা বৃথা, তবে অসম্ভব নয়। অতএব আমরা দেখলাম নদীরূপে, ব্রহ্মার কন্যারূপে, বিষ্ণুর জিহ্বায় অবস্থানকারী রূপে ইত্যাদি নানাভাবে আদি কাহিনিগুলিতে বারবার সরস্বতী এসে হাজির হয়েছেন। সরস্বতী শব্দের যা অর্থ তা নদীর সঙ্গে মিল খায় না। যদিও সেইকালে নদীর অপরিসীম গুরুত্ব ছিল। পরবর্তীকালে তাঁকে বাগদেবী হিসাব পুজো করা শুরু হয়। এইখানে আমরা বিগ ব্যাং থিয়োরির কথাটা একবার মনে করতে পারি, যা শব্দ থেকে ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি কথাটার সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি করে। এবার আমরা যদি সহজ করে ভাবি তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে একটা পরমসত্তা ছিল, একটা শব্দ নির্গত হল আর ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি হল। সরস্বতী যদি সেই শব্দ হয় তবে সারা সৃষ্টির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রয়েছে।
এতক্ষণ যাঁরা সরস্বতীর বিচিত্র কাহিনি পাঠ করলেন, তাঁদের বলি এইসব সরস্বতী একজন কেউ নন। ভিন্ন ভিন্ন সরস্বতী। একই নামে একাধিক সরস্বতীর একত্র রূপ। যেহেতু প্রাচীনকালে কারোর পদবি ছিল না বা পদবির উৎপত্তি হয়নি, তাই কারোকেই পৃথক করা যায় না। সবাইকেই একই সত্তা বলে মনে হয়।
লেখক মনোবর বলছেন–“সমস্ত জ্ঞান, যা শব্দ বা বাক্য দ্বারা ধারণা করা যায় তার এক চিন্ময়ী মূর্তি হিসাবে দেবী সরস্বতীর পুজো করা হয় এইটা হচ্ছে মোদ্দা কথা। সমস্ত প্রকার শক্তিকেই দেবীরূপে কল্পনা বা ব্যাখ্যা করা হয়েছে তাই সরস্বতী হলেন বিদ্যাশক্তির অধিষ্ঠাত্রী। ব্যস! এবার আর কোনো সমস্যা নেই। এই প্রবল শক্তি, যা জগতের বিকাশের অন্যতম ভিত্তি তার পুজো পাওয়া মানে ওই বিদ্যার বিকাশের পথ সুগম হওয়া সেটা আমাদের জন্য আনন্দদায়ক হওয়ার কোন কারণ নেই। যা আমরা গুরুত্বপুর্ণ ভাবি তাকে শ্রদ্ধাভক্তি করায় দ্বিধার কোন কারণ তো নেই। এখানে আমরা বা আমাদের বলতে শুধুমাত্র হিন্দুদের কথা বলা হয়েছে বুঝতে হবে। কারণ মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান, ইহুদি ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের দেবী সরস্বতী নেই। তাঁরা কেউই সরস্বতীর বরে বিদ্যালাভ করে বিদ্বান হননি। তাঁরা সরস্বতীর বর বা আশীর্বাদ না পেলেও বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, গবেষক, দার্শনিক হওয়া তাঁদের আটকায়নি। আইনস্টাইন, নিউটন, কোপারনিকাস, প্লেটো, ডেকার্ত, পিট সিগার, ইবনে বতুতা, হিউয়েন সাঙ, আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, রুজভেল্ট, সামসুর রহমান, হুমায়ুন আজাদ, আবদুল্লাহ আবু সয়ীদ, হুমায়ুন আহমেদ, মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, সৈয়দ মুজতবা সিরাজ, আল্লামা ইকবাল, জসিমউদ্দিন, কার্ল মার্ক্স, লেনিন, স্তালিন হয়ে উঠতে কারোরই সরস্বতীর প্রয়োজন হয়নি।
