“ইয়েষ কৃষ্ণং কামেন কামুকী কামরূপিনী”
“ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ’-এ শ্রীকৃষ্ণ-সরস্বতীর কেচ্ছাকাহিনি যথাযথভাবেই বর্ণিত আছে। ডঃ শ্যামল চক্রবর্তী ‘নারী’ প্রবন্ধে বলেছেন, সরস্বতী গণেশেরও স্ত্রী। মহারাষ্ট্রের কোনো কোনো পূজারী মনে করেন, গণেশের পত্নী সরস্বতী কিংবা সারদা। হয়তো সরস্বতী এবং গণেশ দুজনই বিদ্যা ও সংগীতের অধিষ্ঠাতা দেবতা বলেই এই পতি-পত্নীর কল্পভিত্তি। আর-এক তথ্য অনুসারে জানা যাচ্ছে, দুর্গার কন্যা এই সরস্বতী দুর্গার কুমারী সত্তা। আবার বাঙালিরা মনে করেন গণেশ ও সরস্বতী ভাইবোন, দুর্গার সন্তান। অথচ চিরকুমারী (!) সরস্বতাঁকে স্বর্গের দেবতারা কখনও স্ত্রী, কখনও সেবাদাসী, কখনও গণিকা, আবার কখনও অসুরদের রূপে ভুলিয়ে কাত করাবার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
পণ্ডিতদের মতে সরস্বতী হলেন সৃজন শক্তি। অর্থাৎ ‘Essence of the self’। আপন সত্তার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গুণাবলি। তাঁর চারটি হাত। এক হাতে গোলাপ, এক হাতে বই –এ দুটি হল পিছনের হাত। সামনের দু-হাতে তিনি বীণা বাজাচ্ছেন। তাঁর পরিধানে সাদা বস্ত্র, যা শুদ্ধ জ্ঞানের প্রতীক। বীণাবাদন জাগতিক কর্ম আর পদ্মধারণ আধ্যাত্মিক জগতের প্রতীক বলা হয়েছে। পদ্ম পরম সত্তার প্রতীক। এর দ্বারা মনোযোগ, ধ্যানসমাধি এবং পরম সত্তার সঙ্গে একাত্মতা বোঝায়। তাঁর কাছ একটি ময়ুর থাকলেও বাহন রাজহাঁস। ময়ুরের মেজাজ আবহাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলায়। তাই তিনি পছন্দ করেননি। অপরদিকে রাজহাঁস অসার-সার একসঙ্গে মেশানো দ্রব্য থেকে অসার দ্রব্য নিখুঁতভাবে ত্যাগ করে সারদ্রব্য গ্রহণ করে বলে বাহন হিসাবে বেশি পছন্দ।
হিন্দুদের দেবী হওয়া সত্ত্বেও বৌদ্ধ ও জৈনদের কাছেও পুজো পেয়েছেন সরস্বতী। গান্ধারের পাওয়া বীণাবাদিনী সরস্বতীর মূর্তি থেকে বা সারনাথে সংরক্ষিত মূর্তিতে এর প্রমাণ মেলে। পাথরের একটি ছোটো মূর্তি আছে তাতে সরস্বতী বীণা বাজাচ্ছেন, এর সঙ্গে হিন্দুদের সরস্বতীর কোনো পার্থক্য নেই। মথুরায় জৈনদের প্রাচীন কীর্তির আবিষ্কৃত নিদর্শনে সরস্বতীর যে মূর্তি পাওয়া গেছে সেখানে দেবী জানু উঁচু করে একটি চৌকো পীঠের উপর বসে আছেন, এক হাতে বই। শ্বেতাম্বরদের মধ্যে সরস্বতী পুজোর অনুমোদিত ছিল। জৈনদের ২৪ জন শাসনদেবীর মধ্যে সরস্বতী একজন এবং ১৬ জন বিদ্যাদেবীর মধ্যে অন্যতম হলেন সরস্বতী। শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর জৈন সম্প্রদায় উভয়েই সরস্বতাঁকে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে গৃহীত একজন প্রধান দেবীরূপে স্থান হয়ে গেল।
শ্রীপঞ্চমীর ‘শ্রী’ অর্থে লক্ষীকে বোঝায়। অর্থাৎ এই তিথি লক্ষ্মীর। তাই শ্রীপঞ্চমীর পুজো ধনের বা শস্যের বা তাঁর অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মীরও পুজো। এই কারণে দেখা যায় কৃষিজীবী মানুষের কৃষি উৎপাদনের উপাদানগুলি এই পুজোয় অন্তর্ভুক্ত। তাই সরস্বতী পুজোর অন্যতম উপাচার পঞ্চশস্য (ধান, যব, সাদা সর্ষে, মুগ ও মাসকলাই) এবং পঞ্চপল্লব (কাঁঠাল, আম, অশন্থ, বট ও বকুল)। অনেকে মনে করেন সরস্বতী নামে দেবী কৃষিকর্মের সহায়ক এবং উৎপাদক ব্যবস্থার সঙ্গেই বেশি যুক্ত। অমরসিংহের সময় পর্যন্ত প্রাচীন কোনো কোশগ্রন্থে ‘শ্রী’ শব্দের অর্থ সরস্বতী না থাকলেও মধ্যযুগের আচার্য রেদিনীবর হেমচন্দ্র প্রমুখের অভিধানে সরস্বতী আর-একটি নাম হিসাবে ‘শ্রী”-র সন্ধান পাওয়া যায়।
সরস্বতী আলোচনা প্রসঙ্গে লক্ষ্মীর প্রসঙ্গও এসে যায়। কারণ আমরা লক্ষ্মী ও সরস্বতীর দ্বন্দ্বের কাহিনি আমরা শুনেছি। দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে, লক্ষ্মী কৃষ্ণের জিহ্বাগ্র থেকে উৎপন্ন হয়েছেন। ব্রহ্মা প্রথম তাঁকে পুজো করেন। পরে জগতে তাঁর পুজো প্রতিষ্ঠিত হয়। দেবীপুরাণে বলা হয়েছে, একবার সত্যযুগের শুরুতে ভগবান বিষ্ণু ক্ষীর সাগরে যোগনিদ্রায় শায়িত ছিলেন। সেইসময় লক্ষ্মী তাঁর পদসেবা করছিলেন। সেইসময় হঠাৎ বৈকুণ্ঠলোকে সরস্বতী চলে আসেন। বিষ্ণুর পদসেবায় নিয়োজিত লক্ষ্মীকে দেখে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন সরস্বতী এবং লক্ষ্মীকে বৈকুণ্ঠ ছেড়ে চলে যেতে বললেন। তাঁর ক্রুব্ধ হওয়ার একমাত্র কারণ হল তিনি তখন ভেবেছিলেন বিষ্ণুই হয়তো তাঁর স্বামী। লক্ষ্মী অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন সরস্বতাঁকে। কিন্তু সরস্বতী কিছুতেই বুঝতে চাননি যে, বিষ্ণুই লক্ষ্মীর স্বামী। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মধ্যে এ নিয়ে তুমুল দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হল। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর তুমুল দ্বন্দ্ব দেখে গঙ্গা তাঁদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে উদ্যোগী হন। গঙ্গা স্বাভাবিকভাবে লক্ষ্মীর পক্ষ নিলেন এবং সরস্বতীর বিপক্ষে দাঁড়ালেন। গঙ্গা সরস্বতাঁকে যারপরনাই বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, বিষ্ণুই একমাত্র লক্ষ্মীর স্বামী। এ ঘটনা কি এটাই প্রমাণ করে যে, সরস্বতী বিষ্ণুকে নিজের স্বামী করছিলেন? সরাসরি সদার্থক উত্তর পাওয়া না গেলেও বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। যাই হোক, সরস্বতী কি গঙ্গার এই বিচার মেনে নিলেন? না, মানেননি। তিনি লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিলেন, বললেন– “লক্ষ্মী মর্ত্যলোকে মানবী হয়ে জন্মাবেন, অসুরের স্ত্রী হয়ে দুঃখ সহ্য করবেন এবং অবশেষে বৃক্ষতে রূপান্তরিত হবেন।” সরস্বতী লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিতেই গঙ্গাও সরস্বতাঁকে অভিশাপ দিলেন– সরস্বতী নদীরূপে পৃথিবীতে প্রবাহিত হবে। সরস্বতীও গঙ্গাকে পাল্টা অভিশাপ দিলেন –গঙ্গাও পৃথিবীতে নদীরূপে প্রবাহিত হবেন।
