এক বিষ্ণুকে ঘিরে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গঙ্গা তিনজনেই একে অপরকে অভিশাপ দিলেন। এই পুরাণ-কাহিনি থেকে হিন্দুরা বিশ্বাস করে –সরস্বতীর অভিশাপে লক্ষ্মী তুলসীগাছ হয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছেন, গঙ্গার অভিশাপে সরস্বতী পৃথিবীর বুকে নদীরূপে প্রবাহিত হচ্ছেন এবং গঙ্গাও সরস্বতীর অভিশাপে পৃথিবীর বুকে নদীরূপে প্রবাহিত হচ্ছেন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে বলেন– সরস্বতী, গঙ্গা ও লক্ষ্মীর মধ্যে যে, দ্বন্দ্ব-বিবাদ হয়েছে, তা নিছকই দেবলীলা। আবার অনেকেই বলেন, এসব নিছকই মনোরঞ্জক গালগপ্পো, রূপকথা।
মহাভারতের এক জায়গায় উল্লেখ আছে, নগরে প্রবেশের আগে যুধিষ্ঠির তাঁকে প্রীতি ও সাদর সম্ভাষণ জানাতে গণিকাদের লোক মারফত প্রেরণ করেন। প্রাচীন ভারতে গণিকারাই ছিলেন নারীদের মধ্যে একমাত্র শিক্ষিত শ্রেণি। এঁদের চৌষট্টি কলায় পারদর্শিনী হতেই হয়। শুধু তাই নয়, অলংকার, ছন্দ ও কাব্য সম্পর্কেও তাঁদের বিশেষ জ্ঞান ছিল। সেই কারণেই তাঁরা রাজদরবারে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে আমন্ত্রণ পেতেন। যে সময় সাধারণ নারীরা পড়াশোনা করতেন, সে সময় গণিকারাই কেবল কেবলমাত্র বিদ্যা, সঙ্গীত ও অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞানী ছিলেন। আর এইসব জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রীদেবী হিসাবে ছিলেন সরস্বতী। ধনী নাগরিক ও গণিকাদের দ্বারা পূজিত হতেন, সে বিষয়ে উল্লেখ আছে বাৎসায়নের কামসূত্র গ্রন্থে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে প্রাচীন যুগে ধনী নাগরিক ও গণিকাদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। বিদ্যা আজও গরিবদের জন্য নয়।
তবে গণিকাদের লক্ষ্মীপুজো থেকে বঞ্চিত করা হলেও সরস্বতী পুজো করতে পারেন। সরস্বতী কেন? সরস্বতীর অধিষ্ঠান কী তবে গণিকালয়ে? তা না-হলে লক্ষ্মী নয় কেন? গণিকাদের তো লক্ষ্মী বা ধনসম্পদের প্রয়োজন। দক্ষিণ ভারতে যে ময়ূরবাহন সরস্বতীর মূর্তি পাওয়া গেছে সেটা কৌমারীর সঙ্গে অনেকটা মিলজুল হয়। কৌমারী কার্তিকের পত্নী। তাই বোধহয় গণিকাদের দেবতা কার্তিকের পাশাপাশি সরস্বতীর পুজোও গণিকালয়ে হয়ে থাকে। যুগে যুগে ইতিহাসবিদরা জানিয়েছেন উপাসনালয় থেকে গণিকালয়– সর্বত্র পুজো পায় সরস্বতী। সরস্বতী তাঁর কৌমার্য হারিয়েছে বহু পুরুষের বাহুডোরে। নেপালে চতুর্দশ শতকের পাওয়া শিলালিপিতে লেখা আছে– “সারদা তুমি মাতৃরূপী, তুমি কামমূর্তি”। তাই কি স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের উচ্চারণ করতে হয়– “ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে”। তিব্বতে এমন অনেক সরস্বতী পাওয়া গেছে যাঁর উর্ধ্বাঙ্গে কোনো বসনই ছিল না। তাই হয়তো মকবুল ফিদা হোসেনের সরস্বতীর পরনে আব্রু নেই! সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক, গণেশ– এরা কেউ কারোর ভাই-বোন নয়, এটা বাঙালিদের মনগড়া রূপকল্প। ভিত্তি নেই, সমর্থনও নেই।
আমরা বাঙালিরা সাধারণত সরস্বতীর যে মূর্তি কল্পনা করি, তা হল তিনি চতুর্ভুজা, শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা, শ্বেত পদ্মাসনা, শ্বেত হংস। এছাড়াও আমরা সরস্বতীর আরও দুটি রূপ পাচ্ছি– (১) মহা সরস্বতী ও (২) মহাবিদ্যা নীল সরস্বতী।
মহা সরস্বতী : দেবীমাহাত্ম অনুসারে ইনি মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতীর মিলিত রূপ। ইনি অষ্টভুজা, শ্বেত পদ্মাসনা, বীণাবাদনরত। তাঁর হাতে ঘণ্টা, ত্রিশূল, লাঙলের ফলা, শাঁখ, মুষল, চাকতি, ধনুক ও শর। শারদ পূর্ণিমার চন্দ্রের মতো তাঁর দীপ্তি। গৌরীর শরীর থেকে তাঁর জন্ম এবং তিনি শুম্ভ ইত্যাদি অসুরদের বধকারিণী। শুম্ভ ও নিশুম্ভ অসুরদ্বয়কে বধ করার সময় দেবী দুর্গার শরীর থেকে কৌশিকী দেবীর উৎপত্তি হয়েছিল।
মহাবিদ্যা নীল সরস্বতী : ইনি মহাবিদ্যা তারার আর-এক রূপ। তন্ত্রসারে তাঁর ধ্যানমন্ত্র পাওয়া যায়। কথিত আছে –বিদ্যাবতীর কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বনের মধ্যে এক জলাশয়ে কালিদাস যখন প্রাণ বিসর্জন দিতে যান, তখন নীল সরস্বতী আবির্ভূত হয়ে তাঁকে আত্মহত্যা থেকে নিরস্ত্র করেন। এরপর কালিদাসের প্রর্থনায় তুষ্ট হয়ে তিনি কালিদাসের জিহ্বার অগ্রভাগে সদা বিরাজ করতে থাকেন। এর ফলে কালিদাস মূর্খ থেকে মহাপণ্ডিত হয়ে একের পর এক মহাকাব্য লিখে ফেলেন।
আদি পুরাণ বলছে, সরস্বতী ব্রহ্মার মুখজাত। মুখজাত– এর অর্থ জ্ঞান। মুখনিঃসৃত কথাই তো বেদ। ফলে ব্রহ্মার মুখজাত সৃষ্টি সরস্বতী জ্ঞানেরই। আবার শিবপুরাণ তো অন্য কথা বলছে। কী বলছে? বলছে– ব্রহ্মা কাম পরবশ হয়ে সরস্বতীর পিছনে পিছনে গিয়েছিলেন, ছেলেদের বাধায় ব্রহ্মা দেহত্যাগ করেছিলেন। এখানেই আছে ব্রহ্মার এই কুপ্রস্তাবে সরস্বতী ব্রহ্মাকে অভিশাপ দেন, ফলে তার একটি মাথা খসে পড়ে। সেই থেকে ব্রহ্মা চতুরানন। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণেও সরস্বতী বিষ্ণুর মুখজাত, কিন্তু ব্রহ্মার স্ত্রী। বিষ্ণু ব্রহ্মাকে গোলকে পাঠাচ্ছেন। প্রকৃতির অংশরূপী ভারতাঁকে সেখানে মানে গোলকে দেখতে পাবেন এবং তাঁকে দেখার পর তাঁর সঙ্গে যৌনমিলনে ব্যস্ত হবেন। এও আছে ব্রহ্মা ভারতীর সঙ্গে রতিক্রিয়া করেছেন স্থানে স্থানে নির্জনে নির্জনে। যিনি ভারতী, তিনিই সরস্বতী।
‘মৎসপুরাণ’ অনুসারে পরমাত্মার মুখনিঃসৃত শক্তিগুলির মধ্যে সরস্বতী সর্বশ্রেষ্ঠা। তিনি রূপে দেবীর ন্যায় পরমা সুন্দরী। মহাশ্বেতা (সর্বশুক্ল বা যার সর্বাঙ্গ শ্বেতবর্ণের) ও বীণাবাদিনী। কিন্তু জন্ম নেওয়ার পর তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে ‘সৃষ্টিকর্তা’ ব্রহ্মা সরস্বতীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। ব্রহ্মার কুদৃষ্টি থেকে বাঁচতে অগোচরে চলে যেতে থাকে সরে সরে। যেদিকেই তিনি সরছেন সেদিকেই ব্রহ্মার মাথা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সরস্বতাঁকে নজরের বাইরে যেতে দিচ্ছেন না রূপে মুগ্ধ ব্ৰহ্মা। এইভাবেই তৈরি হয়ে যায় পাঁচটি মাথা। এই রূপেই আমরা ব্রহ্মার মূর্তি পাই। অবশেষে সরস্বতী রাজহংসীর রূপ ধরে বনে পালিয়ে যান। ব্ৰহ্মাও রাজহংসীরূপী সরস্বতীর পিছু নেন এবং সেখানে জোর করে সরস্বতাঁকে ভোগ করেন।
