গোরু, মহিষ, ভেড়া বা ছাগলের চামড়া ছাড়ান যাঁরা, যাঁদের অনেকেই চামড়াশিল্পের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের সংখ্যা কমবেশি ৮ লাখ। এই শ্রেণির মানুষ সাধারণত মুসলমান ও দলিত হিন্দু। বংশপরম্পরায় তাঁরা এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তিন দশক ধরে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের যিনি খুব কাছ থেকে দেখছেন, তিনি দিল্লি সায়েন্স ফোরামের ডি রঘুনন্দন। তাঁর কথায়, এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা সমাজের একেবারে দরিদ্র শ্রেণির। ক্রমবর্ধমান ভয়, হুমকি ও জবরদস্তির ফলে এঁরা যে শুধু রোজগার হারাচ্ছেন তা নয়, গরিব মানুষদের সস্তার প্রোটিন (গোমাংস) থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এই মানুষজনের সংখ্যা কত? একটি সরকারি হিসাবও ওই সংবাদপত্রে দাখিল করা হয়েছে। ভারতের প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ দরিদ্র মানুষ শুধু গোরু-মহিষের মাংস থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংগ্রহ করেন। এঁদের সবাই কিন্তু মুসলমান নন। হিন্দু আছেন, খ্রিস্টান আছেন, উপজাতি আছেন, বৌদ্ধ আছেন, আছেন সব মতাবলম্বীরাই। মিল তাঁদের এক ক্ষেত্রেই, সবাই অতি দরিদ্র। গোরু নিয়ে বিতর্ক এঁদেরই পেটে কষিয়ে লাথি মেরেছে সবচেয়ে বেশি। গোরু-বিতর্কের জের ভারতকে শেষ পর্যন্ত যেখানে দাঁড় করাবে, সেটা যে দেশের পক্ষে মোটেই ভালো নয়।
হিন্দুত্ববাদের শিরোমণি সাভারকার বলেছিলেন– “গোরু হিন্দু জাতির প্রতীক হওয়া উচিত নয়। গোরু কিন্তু হিন্দু জাতির দুগ্ধ প্রতীক। কোনো উপায়েই এটিকে হিন্দুত্বের প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করা উচিত নয়। হিন্দুত্বের প্রতীক গোরু নয়, নৃসিংহ (নৃসিংহের উল্লেখ, ভগবান বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার হিসাবে বিবেচিত)। গোরুকে ঐশী হিসাবে বিবেচনা করে এবং তাঁর উপাসনা করার সময় গোটা হিন্দু জাতি গোরুর মতো সহজবশ্যে পরিণত হয়েছিল। গোটা জাতি যেন ঘাস খাওয়া শুরু করে। আমরা যদি এখন কোনো প্রাণীর আদলে আমাদের জাতিকে খুঁজে পেতে চাই, তবে সেই প্রাণীটিকে সিংহ হতে দিন। আমাদের এখন নরসিংহ পুজো করা দরকার এবং গোরুর খুর হিন্দুত্বের চিহ্ন নয়।” নৃসিংহ অবতারের হিংস্র ভয়াল মৃর্তি সাভারকার প্রতিটি হিন্দুর মনে গেঁথে দিতে চেয়েছিলেন যারা প্রতিপক্ষের পেট চিরে রক্তপান করবে। গৌতম বুদ্ধের অহিংসার শক্তি উপলব্ধির ক্ষমতা সাভারকারের ছিল না। নেহাতই জান্তব ও মাংসল হিংস্র দর্শনের প্রতীক করে তোলেন বিষ্ণুর নৃসিংহ রূপকে। যদিও তাঁর অনুগামীরা নৃসিংহের বদলে গোরুতেই আটকে থাকেন, কেন-না তুলে ধরার পক্ষে সিংহের চাইতে গোরুই আদর্শ।
হায় হিন্দু! গোরু যতদিন দুধ দেয় ততদিনই মা। দুধ দেওয়া বন্ধ করলেই গোরু খেদাও। মাতার মাংস পরিণতির নিমিত্ত মুসলিমদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বলদেরও যতদিন গতর ততদিনই কদর। ষাঁড় না-হলে বংশবৃদ্ধির ক্রিয়া জারি রাখবে কে? তাই ষাঁড় দু-একটা রেখে বাকিটা ধর্মের নামে উৎসর্গ করা হয়। ওরা হাটেবাজারে তোলা তুলে খায় আর বেগরবাই করলে পিটানি খায়। তোমাদের সীমাহীন গোভক্তি দেখে চমকিত হই!
সহায়ক গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকা :
(১) The Sanctity of the Cow in Hinduism– W Normal Brown, The Economic Weekly, Feb 1964, Madras
(২) The Myth of the Holy Cow– D N Jha, Verso, London
(৩) Science and Society in Ancient India– Debiprasad Chattopadhyay
(৪) Concept of Cow in the Rigveda– Doris Meth Srinivasan
(৫) Why did the Brahmins give up beef-eating– BR Ambedkar
(৬) মহাকাব্য ও মৌলবাদ –জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়
(৭) ফ্রন্টলাইন (২০০৩)
(৮) আউটলুক (২০০৩)
(৯) সাহারা টাইমস (২০০৩)
(১০) গোরু ও ত্রিশূল– শ্যামল চক্রবর্তী
সরস্বতী : বাস্তবে এবং অবাস্তবে
ভৌগোলিক দিক থেকে নিশ্চিতভাবেই বলা যাবে কি সরস্বতী নদী শতদ্রু ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ছিল? অনুমান করা যায় যে বৈদিক সরস্বতী (আঞ্চলিক নাম সরসুতী) হরিয়ানার থানেশ্বর অঞ্চলে প্রবাহিত। ঋগ্বেদে (অষ্টম মণ্ডল, ৩৬.৬ সূক্ত) বলা হয়েছে সপ্তথি সরস্বতী নদীগুলির মাতা (সিন্ধুমাতা) একসঙ্গে দুগ্ধ ও স্রোতস্বিনীদের নিয়ে বিপুল গর্জনে তীব্র স্রোতে প্রভূত জলধারায় স্ফীত হয়ে প্রবাহিত।
ঋগ্বেদে দুই ধরনের সরস্বতীর উল্লেখ আছে। একটি ত্রিলোক্য ব্যাপিনী সূর্যাগ্নি, অন্যটি নদী। সরস্ ধাতু তদুত্তরে অস্থর্থে বতু এবং স্ত্রী লিঙ্গে ঈ প্রত্যয় যোগে নিষ্পন্ন হয়েছে সরস্বতী– এ মত স্বামী নির্মলানন্দের। আলোকময়ী বলে সর্বশুক্লা। শংকরনাথ ভট্টাচার্যের মতে, সরস + বতী = সরস্বতী। অর্থ জ্যোতিময়ী। ঋগ্বেদে এবং যর্জুবেদে অনেক জায়গায় ইড়া, ভারতী, সরস্বতাঁকে একসঙ্গে দেখা যায়। বেদের মন্ত্রগুলো পর্যালোচনায় প্রতীতী জন্মে যে, সরস্বতী মূলত সূর্যাগ্নি। দেবীভাগবতে সরস্বতী জ্যোতিরূপা। ভৃগুপনিষদে জ্যোতির্ময়ী সরস্বতী ও জলময়ী সরস্বতীর সমীকরণ করা হয়েছে। এই উপনিষদে জলে জ্যোতি প্রতিষ্ঠিত, জ্যোতিতে জল প্রতিষ্ঠিত। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী সারদামঙ্গল কাব্যে জ্যোতির্ময়ী সরস্বতীর আবির্ভাব বর্ণনা করেছেন। রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকি যখন ক্রৌঞ্চ হননের শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন, সে সময় জ্যোতির্ময়ী সরস্বতী তার ললাটে বিদ্যুৎ রেখার মতো প্রকাশিত হয়েছিলেন।
