ভারতে প্রায় ৫০ কোটি গবাদি পশু আছে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি, মোষের সংখ্যা ২ কোটি– সারা পৃথিবীর অর্ধেক। পৃথিবীর সাড়ে আট কোটি গোরু, বাচ্চা বলদ, ষাঁড়। বলদের মধ্যে ভারতে আছে শতকরা ১৫ ভাগ।
একটি সাক্ষাৎকারে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী ডি ডি লাপাং বলেছেন, “মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ডে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই গোরুর মাংস খেয়ে থাকে, উত্তর-পূর্ব ভারতের মাথাপিছু আয় এমনিতেই কম। এখানকার মানুষের পক্ষে বিকল্প খাদ্য হিসাবে মুরগি কেনা সম্ভব নয়।” প্রসঙ্গত বলি, মণিপুরের অধিবাসীদের বক্তব্য হল, গোরুর মাংস যে শুধু সস্তা তাই নয়, এখানকার ঠান্ডা আবহাওয়ায় বেশ মানানসই।
কেরল রাজ্য দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোমাংস ভোজন করে। ২০০৩ সালের একটা হিসাবে দেখতে পাচ্ছি, সেই বছরে ২ লক্ষ ৪৯ হাজার টন গোমাংস একমাত্র কেরলেই বিক্রি হয়েছে। সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানই নাকি ১৩০ টন গোমাংস বিক্রি করেছে। কেরলে গোমাংসের চাহিদা এত বেশি যে প্রতি বছর প্রতিবেশী রাজ্যগুলি থেকে ৫ লক্ষ গোরু আমদানি হয়। কেরল আবার গোহত্যা বেআইনি এমন রাজ্যগুলিতে গোমাংস রপ্তানি করে। তাই অনেকেই মনে করেন, গোহত্যা বন্ধ হলে কেরলের মানুষ ও পশু দুটোরই স্বাস্থ্য বিপন্ন হবে। কারণ গোমাংস হল সবচেয়ে সস্তা মাংস। কেরলের মাংস বিক্রির শতকরা ৪০ ভাগই হল গোমাংস। হিন্দু, মুসলিম, সন্ত, খ্রিস্টানরা গোমাংস খেয়ে থাকেন। দক্ষিণ ভারতে তপসিল জাতি এবং তপসিল উপজাতির বেশিরভাগ মানুষই গো-মাংস খেয়ে থাকেন।
পশ্চিমবাংলার করিডর দিয়ে সারা ভারত থেকে লক্ষ লক্ষ গোরু বাংলাদেশে প্রতিবছর পাচার হয়। বাংলাদেশের মানুষ সেই গোরুগুলির মাংস তো খানই, উপরন্তু বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বিদেশি মুদ্রা আয় করেন।
মুসলিমরা যখন ভারতবর্ষ আক্রমণ করে দিল্লিতে ঘাঁটি গেড়ে বসল, তখন শুধু শাসনযন্ত্র করায়ত্ত করেই ক্ষান্ত হল না; বিজিত দেশে নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের প্রভাব স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। গ্রামের পর গ্রাম আক্রমণ করে মন্দির ভেঙে মসজিদ বানিয়ে, পুরুষদের হত্যা করে নারীদের বন্দি করে ধর্মান্তর করে জবরদস্তি বিবাহ করে বংশবিস্তারে মনোযোগী হয়েছিল কোনো কোনো শাসক। সেই সময়ে আমাদের ব্রাহ্মণকুল ধর্মীয় ‘পবিত্রতা রক্ষার নামে, নিজেদের জ্ঞান জাহির করার তাগিদে, নিদান হাঁকতে শুরু করলেন, যে বা যারা গোমাংস ভক্ষণ করেছেন (জবরদস্তি করে খাওয়ানো হলেও), বা এমনকি পেঁয়াজ বা রসুনের গন্ধ শুঁকেছেন; তাঁরা সবাই স্বধর্মচ্যুত হয়েছেন! ব্রাহ্মণকুলের অজ্ঞতার কারণে আক্রমণকারী মুসলিম শাসকদের হাত শক্ত হল; নিমেষে গ্রামকে গ্রাম হিন্দুসম্প্রদায় মুসলিমে পরিণত হয়েছিল। আজ ভারতবর্ষ সহ পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে যে বিপুল সংখ্যক মুসলমান আছেন তাঁদের প্রায় অনেকেই শিকড় হিন্দু! নানা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় কারণে রূপান্তরিত।
তবে অতি প্রাচীনকালে অর্থাৎ অতীতে সনাতনধর্মীরা যে গোমাংস ভক্ষণ করত তা নয়, বর্তমানেও হিন্দুদের মধ্যে গোমাংস ভক্ষণের রীতি আছে। বিশ্বের একমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র নেপালে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর গাধীমাই মন্দিরে পশুবলি দেওয়া হয় এবং ভক্ষণ করা হয়। এই উৎসবে লাখো লাখো গোরু, মহিষ, শূকর, ছাগল, মুরগি, পায়রা এবং এমনকি ইঁদুর প্রাণী বলি দেওয়া হয়। মহিষই বেশি পছন্দ। সত্যি কথা বলতে এইরকম নৃশংস বলি পৃথিবীতে আর কোথাও হয় বলে আমার জানা নেই। বলি না বলে হত্যালীলা বলা যায়। দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণীগুলিকে অতর্কিতে গলায় কোপ বসিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়। একপ্রকার কচুকাটা যাকে বলে। ২০০৯ সালে প্রায় ২,৫০,০০০ পশু হত্যা করা হয়। ভারত থেকেও প্রচুর গবাদি পশু চলে যায় নেপালে গাধীমাইয়ের সেবার জন্য। এ ঘটনায় সারা বিশ্ব প্রতিবাদে মুখর হচ্ছে। জনমত গঠন করা হচ্ছে। নেপালে বলি বন্ধ হবে কি না জানি না, তবে ভারত থেকে পশু রপ্তানি বন্ধ হবে আশা করি।
বর্তমান ভারত গোহত্যা, গোমাংস নিয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছে। গোমাংস ঘরে রাখার কারণে মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে। এটা কি গোরুর প্রতি প্রেম? নাকি রাজনীতির উদ্দেশ্যে মুসলিম বিদ্বেষ? আমরা সবাই জানি গোরু ও মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে রাজনীতি করে আরএসএস তথা বিজেপি নামে একটি রাজনৈতিক দল। আমাদের দেশে অহিংস বেচারা একটি প্রাণীকে নিয়ে সহিংস রাজনীতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ২০১৫ সালে গোরক্ষার নামে আখলাক খানকে গণপিটুনি দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। স্বাধীন ভারতের এক জন নাগরিক আখলাক খাসি খাবেন, না গোরু খাবেন তার বিচার সমাজ বা রাজনৈতিক নেতারা করতে পারেন না। যদি সেই অজুহাতে কোনো নাগরিককে হত্যা করা হয়, তা হলে আমাদের সমাজ অসভ্য এবং বর্বর আখ্যা পাবে।
প্রথমটি আর্যাবর্তে, মানে গো-বলয়ে সাম্প্রদায়িক অসম্প্রীতির মাথাচাড়া দেওয়া নিয়ে। আশঙ্কাটা খুবই তাড়াতাড়ি সত্য হয়ে যায়। লোকজন খামাখা খুন হয়। টেনশন বেড়ে যায়। মানুষ মানুষকে সন্দেহ করতে শুরু করে। ঘৃণাও। বহু বছরের চেনা এলাকা থেকে ঠাঁইনাড়া হয় বহু সাধারণ মানুষ। এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার সাপটা সবসময় কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। দ্বিতীয় আশঙ্কাটা ছিল অর্থনীতিকে ঘিরে। বিজেপির ক্ষমতায়নের ফলে রাজ্যে রাজ্যে গোহত্যা যেভাবে নিষিদ্ধ হতে থাকে এবং সেই সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার ঝাঁপটা শুরু হয়, তাতে আশঙ্কা হচ্ছিল, এই অশান্তির ফলে ভারতের গোমাংস রপ্তানি না মার খায়। পৃথিবীতে ভারত থেকে গোমাংস (‘বিফ’ বললেও অধিকাংশই অবশ্য মহিষ বা বলদের মাংস) ও গোপণ্য রপ্তানি হয় বছরে ৩৩ হাজার কোটি টাকার। ভারতের পরেই স্থান ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়ার। দ্বিতীয় আশঙ্কাটাও যদি সত্যি হয়ে ওঠে, তাহলে ব্রাজিল-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পোয়াবারো চিনেরও। এ দুই আশঙ্কা চূড়ান্ত সত্যি হলে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা হয়তো আনন্দে দু-হাত তুলে নাচবে, কিন্তু ভারতের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল একটা দেশের পক্ষে সেটা মোটেই ভালো বিজ্ঞাপন হবে না। বিজেপি দিল্লি ও অন্যান্য রাজ্য দখলের পর থেকে গো-হত্যা বন্ধে ও গো-সংরক্ষণের নামে যা চলেছে, তাতে রপ্তানির এই বিপুল বাণিজ্য ইতিমধ্যে ভয় পেতে শুরু করেছে। দেশে মোট ২৪টি মিট প্রসেসিং কারখানা রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ১৩টি ১০০ শতাংশ রপ্তানি করে থাকে। এগুলোর অধিকাংশই উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও পাঞ্জাবে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের দৌরাত্মে এই কারখানাগুলোতে সরবরাহ কমতে শুরু করেছে। ফলে কমছে মাংস রপ্তানি। মাংস রপ্তানি কমার পাশাপাশি মার খেতে শুরু করেছে। চামড়াশিল্প। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দৈনন্দিন জীবিকার প্রশ্নও। গোরু মারা গেলে যাঁরা তার চামড়া ছাড়ানোর কাজ করেন অথবা গোমাংস বিক্রির সঙ্গে জড়িত, মার খেতে শুরু করেছেন তাঁরাও। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে শুরু করেছেন সাধারণ চাষিও। যে গোরু আর কাজে লাগছে না, সেগুলো রাখতে হচ্ছে, খাওয়াতে হচ্ছে। এদের বিক্রি করে আগে চাষিদের কিছুটা অর্থ সাশ্রয় হত। একটা হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এর ফলে দেশে অকর্মণ্য ও ছেড়ে দেওয়া গোরুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫৫ লাখ।
