এত কিছু আলোচনার পর হিন্দুরা গোমাংস ভক্ষণ করত কি না সে প্রশ্ন অবান্তর। হ্যাঁ, ঠিক। একটা ছোট্ট অংশের হিন্দু আজও গোমাংস ভক্ষণ করলেও বড় অংশের হিন্দুরা বহুকাল গোমাংস ভক্ষণ করে না। সে ব্যাপারে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু কোনোকালেই হিন্দুরা গোমাংস ভক্ষণ করত না, একথা বলা মানে ইতিহাসকে অস্বীকার করার সামিল। বিশেষ করে ব্রাহ্মণরা যখন বলেন তাঁরা কখনোই গোমাংস ভক্ষণ করতেন না, সেটাকে মিথ্যাচার অথবা অজ্ঞানতা বলে। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থগুলি কিন্তু গোমাংস ভক্ষণের পক্ষেই সাক্ষ্য দিচ্ছে।
ইসলাম ধর্মে শুয়োয়ের মাংস ভক্ষণে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মতো হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে গোমাংস ভক্ষণের বিরুদ্ধে ফতোয়া না থাকলেও হিন্দুরা কেন গোমাংস ভক্ষণের অভ্যাস ত্যাগ করল? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমাদের জানতে হবে হিন্দুদের বিভিন্ন শ্রেণির খাদ্যাভ্যাস তাঁদের গোষ্ঠী অনুসারে স্থিরীকৃত করা হয়েছিল। হিন্দুদের গোষ্ঠীবিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসও বদলে গেল। একটি গোষ্ঠী হল শিবভক্ত শৈব, অন্যটি হল বিষ্ণুভক্ত বৈষ্ণব। একটি মাংসাহারী আমিষভোজী এবং অন্যটি শাকাহারী নিরামিষভোজী। আর-একটু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করলে মাংসাহারীদের দুটি উপবিভাগে ভাগ করা যায়– (১) যাঁরা মাংস খায় বটে, কিন্তু গোমাংস ভক্ষণ করে না। (২) যাঁরা গোমাংসসহ সব মাংসই ভক্ষণ করে। অনুরূপভাবে হিন্দুসমাজকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন –(১) ব্রাহ্মণ, (২) অ-ব্রাহ্মণ এবং (৩) অস্পৃশ্য।
ব্রাহ্মণদের মধ্যে একটা শ্রেণি আছে যাঁরা নিরামিষভোজী। কারণ ভারতের ব্রাহ্মণরা দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। যেমন– পঞ্চ দ্রাবিড় ও পঞ্চ গৌড়। পঞ্চ দ্রাবিড়েরা নিরামিষভোজী। পঞ্চ গৌড়রা আমিষভোজী। অব্রাহ্মণরা মাংসভোজী হলেও গোমাংস ভক্ষণ করে না। তবে তথাকথিত অস্পৃশ্যরা গোমাংস সহ সব ধরনের মাংস ভক্ষণ করে।
যাঁরা মাংসভোজী তাঁরা কেন গোমাংস ছাড়লেন? সেইসব বিধিনিষেধের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় বৌদ্ধ-সম্রাট অশোকের বিধানে। বোঝাই যায় হিন্দুধর্মের উপর বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। অশোকের বিধান স্তম্ভের গাত্রে ও পর্বতগাত্রে ঘোষিত নির্দেশ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে –“এইসব নির্দেশ মহামান্য রাজার আদেশে লিখিত হয়েছে। রাজধানীর মধ্যে কেউ কোনো প্রাণীকে বলি দিতে পারবে না, বা কোনো পবিত্র ভোজ দিতে পারবে না। কারণ মহামান্য রাজার নিকট ওসব আপত্তিকর।” যদিও কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে মহামান্য রাজা এমন ভোজকে আপত্তিকর বলে মনে করেন না, সেটারও উল্লেখ আছে– “পূর্বে মহামান্য রাজার রসুই ঘরে হাজার হাজার প্রাণী রান্নার জন্য হত্যা করা হত। কিন্তু যখন এই পবিত্র নির্দেশ ঘোষিত হয়েছিল তখন বলা হয়েছিল তখন বলা হয়েছিল সারাদিনে কেবলমাত্র তিনটি প্রাণী খাদ্যের উদ্দেশে হত্যা করা যেতে পারে। যেমন –দুটি ময়ুর ও একটি হরিণ, অবশ্য যদি প্রয়োজন হয়। এখন থেকে এই তিনটি প্রাণীও হত্যা করা যাবে না।” সম্রাট অশোক বিশেষ করে যেসব প্রাণীদের হত্যা ও ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছিলেন, তার একটা তালিকা পাওয়া যায়। যেমন –টিয়া পাখি, হরবোলা পাখি, হাড়গিলা পাখি, পাতিহাঁস, মণ্ডিমুখ, গেলটাস, বাদুড়, বড়ো পিঁপড়ে, মেয়ে কচ্ছপ, অস্থিহীন মাছ, বেদবেয়াক, গঙ্গাপুপুটক, শঙ্কর মাছ, নদী কচ্ছপ, সজারু, কাঠবিড়ালি, বড়ো শিংওয়ালা হরিণ, ষাঁড়, বানর, গণ্ডার, ঘুঘু, পায়রা, সব প্রজাতির চতুষ্পদ প্রাণী, ভেড়ী, গাভী ইত্যাদি।
এছাড়া অশোকের বিধানে আছে– মোরগকে খাসি করা যাবে না। জীবন্ত প্রাণীসহ ভূষি পোড়ানো চলবে না। জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে প্রাণী হত্যা করা যাবে না। কোনো প্রাণীকে দিয়ে কোনো প্রাণীকে হত্যা করা যাবে না। তিষ্যা মাসের পূর্ণিমা, প্রথম পক্ষের চতুর্দশ ও পঞ্চদশ দিবসে, দ্বিতীয় পক্ষের প্রথম দিনে মাছ ধরা বা বিক্রয় করা যাবে না। এইসব দিনে অন্য প্রাণীও হত্যা করা যাবে না। পক্ষের অষ্টম, চতুর্দশ ও পঞ্চদশ দিবসে এবং তিষ্য ও পুনর্বাসা দিবসে এবং উৎসবের দিনে ষাঁড়, পাঁঠা বা শূকরের মুষ্ক ছেদন করা যাবে না। তিষ্যা, পুনর্বাসা, পূর্ণিমার দিনে কোনো ঘোড়া এবং ষাঁড়কে গরম লৌহ বা জ্বলন্ত কাষ্ঠখণ্ড দ্বারা দাগানো যাবে না।
মনু কিন্তু গোমাংস করতে নিষেধ করেননি। বরং ভক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি কোনো কোনো অনুষ্ঠানে গোমাংস ভক্ষণ বাধ্যতামূলক করেছেন। মনুসংহিতার পঞ্চম অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকে বলেছেন —
“শ্বাবিধং শল্যকং গোধাং খঙ্গকূর্মশশাংস্তথা।
ভক্ষ্যান্ পঞ্চনখেহুরনুষ্ঠাংশ্চৈকতোদতঃ।।”
অর্থাৎ সজারু, গোসাপ, কচ্ছপ ও খরগোশ প্রভৃতি পঞ্চ নখবিশিষ্ট প্রাণীগুলি খাওয়া যায়। উষ্ট্র ব্যতীত এক পাটি দন্তবিশিষ্ট গৃহপালিত প্রাণীর মাংস ভোজন করা যেতে পারে। গোরু, মোষ এরা সকলেই এক পাটি দন্তবিশিষ্ট।
বাবাসাহেব বলেন– “এই যে গোমাংস ভক্ষণ বন্ধ হল এবং গো-পুজো শুরু হল, এটা অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট অব্রাহ্মণদের দ্বারা উৎকৃষ্ট ব্রাহ্মণকে অনুকরণ ছাড়া আর কিছু নয়। … অব্রাহ্মণদের জীবনে একটা বিপ্লব ঘটে গেল। গোমাংস ত্যাগ করা একটা বিপ্লব বইকি। যদি অব্রাহ্মণরা একটা বিপ্লব করত, তবে ব্রাহ্মণরা দুটি বিপ্লব করত। একটি বিপ্লব হল গোমাংস ত্যাগ, দ্বিতীয়টি হল মাংস ত্যাগ করে একেবার নিরামিষাশী হয়ে যাওয়া।” এটা কী যে সে বিপ্লব! অথচ এই– “ব্রাহ্মণরা ছিল সবচেয়ে বড়ো গোমাংস ভক্ষণকারী। অব্রাহ্মণরা গোমাংস ভক্ষণ করলেও তাঁরা সব দিন গোমাংস পেত না। গোরু ছিল মূল্যবান সম্পদ এবং হত্যার জন্য গোরু পাওয়া অব্রাহ্মণদের পক্ষে সবসময় সম্ভব হত না। এটি তাঁদের পক্ষে তখনই সম্ভব হত যখন কোনো ধর্মীয় ধর্মীয় বিশেষ অনুষ্ঠানে দেবদেবীর তুষ্টি সাধনার্থে তাঁরা গোরু উৎসর্গ করতে বাধ্য হত। কিন্তু ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে এটা ছিল অন্যরকম। তাঁরা ছিলেন পুরোহিত। সে সময় এত বেশি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হত যে, এমন কোনো দিন থাকত না যেদিন কোনো গোরু উৎসর্গের অনুষ্ঠান হত না। ব্রাহ্মণদের পক্ষে প্রতিদিনই গোমাংস লাভের দিন। তাই ব্রাহ্মণরা ছিল সবচেয়ে অধিক গোমাংসভোজী। ব্রাহ্মণদের যজ্ঞ ছিল নিরীহ প্রাণীহত্যার একটা বাহানা। আসলে যজ্ঞ ব্রাহ্মণদের গোমাংসের ক্ষুধা মেটানোর একটা ধর্মীয় কলাকৌশল মাত্র।” খুব নিষ্ঠুরভাবে হোতর নির্দেশে গোরু হত্যা করতেন যজ্ঞের নামে। সেই নিষ্ঠুর হত্যার বর্ণনা ‘আত্রেয়ী ব্রাহ্মণ’ পাঠ করলেই পেয়ে যাবেন। আত্রেয়ী ব্রাহ্মণের বর্ণনায় ব্রাহ্মণরা কেবল গোমাংস ভক্ষণ করতেন তা নয়, তাঁরা নিজেরাই হত্যা করতেন।
