বৌদ্ধ-সম্রাট অশোকের নিযেধাজ্ঞাকে ব্রাহ্মণরা মেনে নিয়েছিল, একথা মোটেই মেনে নেওয়া যায় না। দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে এটা আশাই করা যায় না যে বৌদ্ধধর্মের কোনো এক রাজার আদেশ ব্রাহ্মণ শিরোমণিরা মাথা নীচু করে মেনে নেবেন। তবে মনুর কয়েকটা নির্দেশে ব্রাহ্মণরা গোমাংস খাওয়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল কি না, সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে।
পঞ্চম অধ্যায়ের ৪৬ নম্বর শ্লোকে মনু বলছেন– “যিনি প্রাণীদের বন্ধন ও বধের দ্বারা ক্লেশ দিতে চান না, তিনি সকলের হিতকামী, তিনি অনন্ত সুখ ভোগ করেন।” ৪৭ নম্বর শ্লোকে বলছেন–“যিনি কাউকে হত্যা করেন না, তিনি যা কিছু ধ্যান করেন বা যা কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠান করেন এবং যে বিষয়ে মনঃসংযোগ করেন, তাতেই সিদ্ধিলাভ করেন।” ৪৮ নম্বর শ্লোকে বলেছেন –“প্ৰাণীহত্যা না করে মাংস পাওয়া যায় না। প্রাণীহত্যা স্বর্গলাভের কারণ হতে পারে না। সুতরাং মাংসাহার ত্যাগ করো।” ৪৯ নম্বর শ্লোকে বলেছেন –“মাংসের উৎস প্রাণীবধ ও বন্ধন যন্ত্রণার কথা বিবেচনা করলে সকল প্রকার মাংস ভক্ষণ থেকে নিবৃত্ত থাকতে হয়।”
মনুর এইসব কথাগুলো নির্দেশ বলা যায় না, বরং উপদেশ বলা যায়। উপদেশ মানা না-মানা ঐচ্ছিক, বাধ্যতামূলক নয়। কারণ মনুর পরের শ্লোকগুলো অনুধাবন করুন। একই অধ্যায়ের ২৮ নম্বর শ্লোকে বলছেন–“পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে সবই প্রজাপতি জীবের অন্নস্বরূপ সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং স্থাবর-জঙ্গম সবই জীবের খাদ্য।” ২৯ নম্বর শ্লোকে আরও পরিষ্কার করে বলেছেন– “স্থাবর-জঙ্গম সবই জঙ্গমদের খাদ্য। দন্তহীন প্রাণী দন্তবান প্রাণীদের খাদ্য। হস্তহীন প্রাণীরা হস্তবান প্রাণীদের খাদ্য এবং ভীরু প্রাণীরা বলবান প্রাণীদের খাদ্য।” ৩০ নম্বর শ্লোকে বলছেন– “ভক্ষ্য জীবকে প্রত্যহ ভক্ষণ করলে ভোক্তার কোনো পাপ হয় না। কারণ ঈশ্বর কোনো কোনো প্রাণীকে ভোজ্য এবং কোনো কোনো প্রাণীকে ভোক্তা করে সৃষ্টি করেছেন।”
যজ্ঞে পশু উৎসর্গ করে তা ভক্ষণ করার সমর্থন রয়েছে মনুর। পঞ্চম অধ্যায়ের ৩১ নম্বর শ্লোকে বলছেন– “যজ্ঞের প্রসাদস্বরূপ যে মাংস, তা বৈধ। আর
প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে যে মাংস ভক্ষণ করে তাঁকে রাক্ষসাচার বলা যায়।” ৩৯ নম্বর শ্লোকে– “যজ্ঞের নিমিত্ত ব্রহ্মা পশুদের সৃষ্টি করেছেন। সমগ্র বিশ্বের কল্যাণের জন্য যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সুতরাং যজ্ঞে পশুবধকে হত্যা বলা চলে না। বা কাজে কোনো পাপ হয় না।” ৪২ নম্বর শ্লোকে –“বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ কর্তৃক মধুপর্ক বা যজ্ঞ প্রভৃতি কার্যে যেসব প্রাণী বধ করা হয় তাতে নিজের এবং প্রাণীর উভয়েরই কল্যাণ সাধিত হয়।”
এখানেই শেষ নয়, মনু বলেছেন “যজ্ঞ প্রভৃতি পবিত্র অনুষ্ঠানে যে ব্যক্তি মাংস ভক্ষণ করে না, সে পরবর্তী ২১ বার পশুরূপে জন্মগ্রহণ করবে” (৫ : ৩৫)। অতএব মনু তাঁর মনুসংহিতার কোথাও মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছেন, এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে না।
মনুসংহিতার একাদশ অধ্যায়ের ৫৫ নম্বর শ্লোকে যে মহাপাপগুলির কথা উল্লেখ করেছেন, গোহত্যা নেই। তিনি বলছেন–“ব্রাহ্মণ হত্যা, সুরাপান, ব্রাহ্মণের স্বর্ণহরণ, গুরুপত্নী গমন এবং এইসব পাপে পাপীদের সংসর্গ হল মহাপাপ।” ৬০ নম্বর শ্লোকে গোহত্যা নিন্দাজনক বলা হলেও জঘন্য অপরাধ নয়। বলছেন– “গোহত্যা, অযাজ্য যাজন, পরস্ত্রীগমন, আত্মবিক্রয়, গুরু-পিতা-মাত-পুত্র ত্যাগ, বেদ অধ্যায়ন না করা এবং অগ্নিত্যাগ –এগুলি লঘুপাপ।”
তাহলে ব্রাহ্মণ তথা হিন্দুদের গোমাংস ভক্ষণ না করার কোনো সমর্থনই ধর্মীয় শাস্ত্রগুলিতে মিলছে না। মনুসংহিতার মতো মহাধর্মশাস্ত্রও নিযেধ করেনি। তাহলে? বাবাসাহেব বলছেন– “দুটি ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। গোরুকে দেবতারূপে গণ্য করার অন্যতম কারণ হল ‘অদ্বৈত দর্শন’। এই দর্শনে বলা হয়েছে যে, সমস্ত বিশ্বই পরমাত্মার প্রকাশ। ফলে সমস্ত প্রাণীর মধ্যেই তাঁর অস্তিত্ব বিদ্যমান। এই মতবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমত, এটার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। যে বেদান্তসূত্র সমস্ত প্রাণীকে এক বলে বর্ণনা করেছে, তা কিন্তু যজ্ঞের বলি হিসাবে প্রাণী হত্যা বন্ধ করতে বলেনি। দ্বিতীয়ত, যদি এই পরিবর্তন অদ্বৈত দর্শনকে উপলব্ধি করে হত, তাহলে কেবলমাত্র গোরুর ক্ষেত্রে নয়, তা সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই কার্যকর হত। অন্য একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, যা প্রথমটির চেয়ে অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। এটা হল আত্মার দেহান্তরের দর্শন। এই দর্শনটা ঘটনার সঙ্গে তেমন মেলে না। বৃহদারণ্যক উপনিষদ আত্মার দেহান্তর গ্রহণের দর্শনের প্রবক্তা। এতে বলা হয়েছে যে, যদি কেউ জ্ঞানীপুত্র লাভ করতে ইচ্ছুক হয়, তবে সে ষাঁড়ের মাংস চাল ও ঘি সহযোগে রান্না করবে। এই মতবাদটা যা উপনিষদে প্রচার করা হয়েছে তা ৪০০ বছর ধরে অর্থাৎ মনুস্মৃতি কার্যকরী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্রাহ্মণ সমাজে কোনোই প্রভাব ফেলতে পারেনি।”
স্বামী বিবেকানন্দ এই গোহত্যা বা গোমাংস ভক্ষণ বন্ধের অর্থনৈতিক কারণের দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। তাঁর মতে, “কালক্রমে দেখা গেল যে আমরা যেহেতু কৃষিজীবী জাতি, অতএব সবচেয়ে ভালো ষাঁড়গুলিকে মেরে ফেলা জাতিকে হত্যা করারই সমার্থক। সুতরাং, এই সব প্রথা বন্ধ করা হল এবং গো-হত্যার বিরুদ্ধে একটি মত গড়ে উঠল”। এই আর্থিক কারণের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভবত কিছ সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কারণও যুক্ত হয়েছিল। কারণ– (১) ভারত ইতিহাসে প্রাচীন যুগের শেষ ভাগ থেকে মধ্যযুগের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ-দেশে বৌদ্ধধর্ম এবং অনেক ক্ষেত্রেই জৈনধর্ম ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। বৌদ্ধধর্মে এবং জৈনধর্মে সবরকম প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ এবং সর্বজীবে অহিংসাকে শ্রেষ্ঠ নীতি বলে গণ্য করা হত। এই বিষয়টি হিন্দুগণের কাছে চ্যালেঞজ হিসাবে উপস্থাপিত হল, উদয় হল সমূহ হিন্দুদের অস্তিত্বের সংকট। অতঃপর এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে গিয়ে হিন্দুসমাজকে অনেক ক্ষেত্রেই অনেক কিছুর সঙ্গেই আপস করতে হয়েছিল। আর্থিক কারণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সাংস্কৃতিক কারণও সম্ভবত গো-হত্যা এবং গো-মাংস ভক্ষণের উপর নিষেধাজ্ঞায় শক্তি সঞ্চারিত হয়েছিল। এভাবেই গো-হত্যা এবং গো-মাংস ভক্ষণ বন্ধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলি ক্রমে ক্রমে দানা বেঁধে মিথ্যা ধর্মীয়তার আধারে ঢাকা পড়ে গেল। কালে কালে গোরু হল গো-মাতা, তেত্রিশ কোটি দেবতার অধিষ্ঠান এবং মলমূত্র হল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পবিত্র উপকরণ। বেড়ে গেল গোরুর গুরুত্ব। মহাভারত রচনার শেষ পর্যায়ে গোরুর একটা অর্থনৈতিক পুনর্মূল্যায়ন আরম্ভ হয়েছিল। আনুমানিক খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে মহাভারতে সংযোজিত অনুশাসন পর্বে সমকালীন অর্থব্যবস্থায় গোরুর। বিশেষ গুরুত্বের নিরিখে খাদ্যদ্রব্য হিসাবে তার মূল্যের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ধন বা ক্যাপিটাল হিসাবে অধিকতর মূল্যের স্বীকৃতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ সময়ে গোরুর বিশেষ অর্থনৈতিক উপযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ধন হিসাবে এর গুরুত্ব ক্রমে ক্রমে স্বীকৃতি লাভ করেছিল। এহেন আর্থিক প্রয়োজনকে স্বীকার করে নিয়ে ধর্মীয় তত্ত্বের আধারে উপস্থাপন করা হল। কারণ স্বর্গ-নরকের লোভ বা ভয় না দেখালে গোরুর মতো সহজলভ্য এবং পুষ্টিকর খাদ্যের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না।
