ধর্মশাস্ত্র ছাড়াও প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যেও গোমাংস ভক্ষণের কথা জানতে পারি। সাহিত্য সমাজের দর্পণ, ইতিহাসও। বাল্মীকির রামায়ণে উল্লিখিত রামচন্দ্রের খাদ্যতালিকায় ছিল তিন প্রকার মদ (আসব) ছিল– (১) গৌড়ী : এটা গুড় থেকে তৈরি হত। (২) পৌষ্টি : পিঠে পচিয়ে তৈরি হত। (৩) মাধ্বী : মধু থেকে তৈরি হত। এই মদের সঙ্গে থাকত শূলপক্ক গোবৎসের মাংস। ভবভূতির ‘উত্তররামচরিত’ নাটকের চতুর্থ অঙ্কে বাল্মীকির দুই শিষ্যের মধ্যে একটি কথোপকথন এখানে উল্লেখ করা যাক। বশিষ্ঠ ঋষি বাল্মীকির আশ্রমে এসেছেন। ফলে বাল্মীকির এক শিষ্য অন্য এক শিষ্যকে জিজ্ঞাসা করছেন –“এই দাড়িওয়ালা বুড়োটা কে রে, বাঘ নাকি? উনি এসেই মেটে রঙের বেচারা বাছুরটিকে খেয়ে ফেললেন।” অন্য শিষ্য সতীর্থকে শাস্ত্র মনে করিয়ে দিয়ে বললেন –“সমাংস মধুপর্ক দিয়ে অতিথি সৎকার করতে হয়, এটা ধর্মশাস্ত্রে লেখা আছে।” বরাহমিহিরের ‘ভরতসংহিতা’-য় বিভিন্ন পশুর মাংসের পাশাপাশি গোমাংসের কথাও উল্লেখ আছে। মহাভারতের বনপর্বে আছে রাজা রন্তিদেবের হেঁশেলে রোজ ২০০০ গোরু রান্না করা হত। মহাকবি কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের পূর্বমেঘ পর্বে ৪৬ নম্বর শ্লোকে যক্ষ মেঘকে বলছে –“গো-নিধনের রক্তে যিনি নদী বইয়েছিলেন, সেই রন্তিদেবকে তোমার যাত্রাপথে যোগ্য সম্মান দিও।” প্রাচীন তামিল সাহিত্যে প্রায় ২০০০ বছর পুরোনো সঙ্গম সাহিত্য ‘অকানানুরু’ গ্রন্থের ২৪৯ ও ২৬৫ পদদুটিতে একদল দস্যুর মোটাসোটা বাছুরের মাংস খাওয়ার বিবরণ আছে।
ডঃ আম্বেদকর তাঁর ‘why Did The Brahmins Give Up Beef-Eating’ গ্রন্থে বেদ-স্মৃতি-পুরাণ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন– তৎকালে ব্রাহ্মণরা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে গোমাংস ভক্ষণ করত। সেইজন্য ব্রাহ্মণদের বলা হত ‘গোঘ্ন’। গোয় মানে গোহত্যাকারী। কশাইকে গোমাংসের অংশ বঞ্চিত করার জন্য ব্রাহ্মণরা নিজেরাই নিজ হাতে গোরু কাটত। মহভারতের অনুশাসন পর্বের ৮৮ অধ্যায়ে শ্রাদ্ধাদি কাজে অতিথিদের গোমাংস ভক্ষণ করালে পূর্বপুরুষ এক বছর পেতে পারে। এই উপদেশ যুধিষ্ঠিরকে দিচ্ছেন পিতামহ ভীষ্ম। বিরাট রাজার গোশালায় অজস্র গোহত্যা করা হত, তার উল্লেখ আছে। আগেই বলেছি রামায়ণের রাম গোমাংসের সঙ্গে মদ্যপান করতে পছন্দ করতেন। বনবাসকালে রাম তাঁর মায়ের কাছে আক্ষেপ করে বলছেন, সে চোদ্দো বছর গোমাংস ভক্ষণ করতে পারবেন না, সোমরস পান করতে পারবেন না এবং স্বর্ণ পালঙ্কে শয়ন করতে পারবেন না। পৌরাণিক যুগে গোমাংস ভক্ষণের প্রত্যক্ষ এবং বিস্তারিত প্রমাণ রামায়ণের তুলনায় মহাভারতে অনেক বেশি। বলা হয়েছে –(১) “বশিষ্ঠ মুনি মদ্য ও গোমাংস প্রভৃতি দিয়া বিশ্বামিত্রকে তাঁহার সেনাগণের সহিত ভোজন করাইয়াছিলেন।” হুইলার প্রমুখ সাহেবরা রামায়ণের যুগে যে গোমাংস ভক্ষণের ব্যবস্থা ছিল, সেকথা উল্লেখ করতে দ্বিধা করেননি। (২) “ভরদ্বাজ মুনি ভরতকে গোমাংসাদি দিয়া পরিতুষ্ট সহকারে ভোজন করাইয়াছিলে এবং তৎকালে বিশ্বামিত্রের যজ্ঞে ব্রাহ্মণেরা দশ সহস্র গোভক্ষণ করিয়াছিলেন।” বেদব্যাস বিরচিত মহাভারতের শান্তিপর্বে (১২ : ২৬৬) ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে যে রাজা বিচষ্য গো-মেধ যজ্ঞে একদিকে অসংখ্য গোরুর আর্তনাদ এবং ছিন্ন দেহ, আর অন্যদিকে ব্রাহ্মণদের নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করে অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন।
মহর্ষি পাণিনি কী বললেন, দেখা যাক–“অতিথি আগমন করলে তাঁহার জন্য গো-হত্যা করবে।” কৃষ্ণ যজুর্বেদের মৈত্ৰায়ণীয় শাখার অন্তর্ভুক্ত মানবগৃহ্যসূত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “বাড়িতে অতিথি এলে তাকে আপ্যায়ন করতে গোরুর মাংস দিতে হবে এবং গৃহস্থের কর্তব্য হচ্ছে অতিথির সঙ্গে আরও চারজন ব্রাহ্মণকে গোমাংস ভোজনে আমন্ত্রণ জানানো।” (পৃ: ২৮) মহাত্মা গান্ধী 261694, “I know there are scholars who tell us that cow sacrifice is mentioned in the Vedas. … read a sentence in our Sanskrit text-book to the effect that Brahmins of old (period) used to eat beef.” ( M.K.Gandhi, Hindu Dharma, New Delhi, 1991, p. 120). অর্থাৎ, “আমি জানি (কিছু সংখ্যক পণ্ডিত আমাদের বলেছেন) বেদে গো-উৎসর্গ করার কথা উল্লেখ আছে। আমি আমাদের সংস্কৃত বইয়ে এরূপ বাক্য পড়েছি যে,পূর্বে ব্রাহ্মণরা গো-মাংস ভক্ষণ করতেন।” (হিন্দুধর্ম, এম.কে. গান্ধী, নিউ দিল্লি, ১৯৯১,পৃ. ১২০)।
একবার দেখা যাক ‘বৃহদারণ্যকোপনিষদ’ কী বলছে। বলছে –“কোনো ব্যক্তি যদি এমন পুত্র লাভে ইচ্ছুক হন, যে পুত্র হবে প্রসিদ্ধ পণ্ডিত, সভাসমিতিতে আদৃত, যার বক্তব্য শ্ৰতিসুখকর, যে সর্ববেদে পারদর্শী এবং দীর্ঘায়ু, তবে তিনি যেন বাছুর অথবা বড়ো বৃষের মাংসের সঙ্গে ঘি দিয়ে ভাত রান্না করে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে আহার করেন” (বৃহদারণ্যকোপনিষদ ৬/8/১৮)। বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রে গো-মাংস ভক্ষণের সমর্থন পাওয়া যায়। বশিষ্ঠস্মৃতি’-তে বলা হয়েছে– ব্রাহ্মণ, রাজা, অভ্যাগতদের জন্য বড়ো ষাঁড় কিংবা বড়ো পাঁঠার মাংস রান্না করে আতিথেয়তা করা বিধেয় (বশিষ্ঠস্মৃতি ৪/৮)। মনু অবশ্য কোনো কোনো প্রাণীর মাংস খেতে বারণ করেছেন। বলার বিষয় হল, তার মধ্যে গোরু পড়ে না। কারণ, যেসব প্রাণী এক খুর বিশিষ্ট তাদের মাংস খাওয়া বিশেষ বিধান ছাড়া বারণ (মনুস্মৃতি ৫/১২)। এই শ্রেণিতে গোরু পড়ে না। অন্যদিকে, যেসব প্রাণীর শুধু এক পাটি দাঁত আছে তাদের মাংস খাওয়া যেতে পারে (মনুস্মৃতি ৫/১৮)। এখানেই শেষ নয়, মনুস্মৃতি বলছে– অতিথিদের খেতে দেওয়ার জন্য, পোষ্যদের প্রতিপালনের জন্য, অথবা ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য প্রয়োজনে যে-কোনো মাংস বিধিসম্মত (মনুস্মৃতি ৫/২২)। চাণক্য বা কৌটিল্য কী বলেছেন তাঁর ‘অর্থশাস্ত্র’-এ, সেটি জানবেন না? জানুন– (১) গোপালকেরা মাংসের জন্য ছাপ দেওয়া গোরুর মাংস কাঁচা অথবা শুকিয়ে বিক্রি করতে পারে (অর্থশাস্ত্র ২/২৯/১২৯)। (২) মাংসের জন্য ছাপ মারা গোরু ছাড়া অন্য কোনো শ্রেণীর গোরু হত্যা নিষিদ্ধ (অর্থশাস্ত্র ২/২৬/১২২)। (৩) রাজ্যের গবাদি পশুর তত্ত্বাবধায়কের পদে একজন সরকারি কর্মচারী থাকবেন। তিনি গোরুদের ছাপ দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করবেন। যেমন– দুগ্ধবতী গাভী, হালটানা বা গাড়িটানা বলদ, প্রজননের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত ষাঁড় এবং মাংসের জোগানের জন্য অন্যান্য গোরুসমূহ (অর্থশাস্ত্র ২/২৯/১২৯)। গৃহ্যসূত্রগুলির সুরও প্রায় এক। বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্গত গৃহ্যসূত্রগুলিতে গোরু বলি এবং গোমাংস। ভক্ষণের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। অধিকাংশ গৃহ্যসূত্রে ব্রাহ্মণ, আচার্য, জামাই বা জামাতা, রাজা, স্নাতক, গৃহস্থের প্রিয় অতিথি, অথবা যে-কোনো অতিথির জন্য মধুপর্ক অনুষ্ঠানের বিধান আছে। আর সেইসব অনুষ্ঠানে গোমাংস পরিবেশন করাই ছিল সাধারণ বিধান ও রীতি। বিভিন্ন পুরাণেও গোরুর মাংস ভক্ষণ এবং বিশেষ করে ব্রাহ্মণদের পরিবেশন করার স্পষ্ট নির্দেশ এবং প্রশংসা আছে। বিষ্ণুপুরাণে গোরু, শূকর, গন্ডার, ছাগ, ভেড়া প্রভৃতি বিভিন্ন পশুর মাংস খাইয়ে ব্রাহ্মণদের হবিষ্য করার বিধান দিয়ে সেই সঙ্গে কোনো মাংস ব্রাহ্মণদের ভক্ষণ করালে পিতৃপুরুষেরা কতদিন পরিতৃপ্ত থাকবেন তার একটা পরিসংখ্যানের উল্লেখ আছে। বিষ্ণুপুরাণ বলছে, ব্রাহ্মণদের গোমাংস খাইয়ে হবিষ্য করালে পিতৃগণ ১১ মাস পর্যন্ত তৃপ্ত থাকেন। আর এ স্থায়িত্বকালই সবচেয়ে দীর্ঘ (বিষ্ণুপুরাণ ৩/১৬)। গোরুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ আয়ুর্বেদাচার্য চরক এবং সুশ্রুত। চরক বলছেন– গোমাংস বাত, নাক ফোলা, জ্বর, শুকনো কাশি, অত্যাগ্নি (অতিরিক্ত ক্ষুধা বা গরম), কৃশতা প্রভৃতি অসুখের প্রতিকারে বিশেষ উপকারী (চরকসংহিতা ১/২৭/৭৯)। সুশ্রুতও একই সুরে বলেছেন– গোমাংস পবিত্র এবং ঠান্ডা। হাঁপানি, সর্দিকাশি, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, অতি ক্ষুধা এবং বায়ু বিভ্রাটের নিরাময় করে (সুশ্রুতসংহিতা ১/৪৬/৪৭)। এত গেল অতীতে, অর্থাৎ প্রাচীন ভারতে হিন্দুগণের গোমাংস ভক্ষণ প্রসঙ্গে তথ্যসূত্র সংবলিত আলোচনা।
